kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

কভিড-১৯ মানিয়ে নেওয়াই রক্ষার উপায়

অনলাইন থেকে

৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এইচআইভি ভাইরাসের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখলাম? ভাইরাসটি থেকে মুক্ত থাকার জন্য কয়েক দশক ধরে নিরাপদ যৌনাচার ও বিশুদ্ধ সিরিঞ্জ ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। অথচ ২০১৮ সালে এসেও এইডসে আক্রান্ত হলো ১৭ লাখ মানুষ। আসলে সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আনাটা মুশকিল। এইচআইভি ভাইরাসের বিস্তার সে কথাই বলছে।  এখন চলছে করোনাভাইরাসের দুর্দান্ত প্রতাপ। এইডসকে দুনিয়া থেকে বিদায় করা যায়নি। করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড-১৯-ও সহজে বিদায় নিচ্ছে না। এবারও সামাজিক আচরণে পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই কভিড-১৯ প্রতিরোধে জোর দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত একমাত্র উপায়ও এটি। কভিড-১৯ নিয়ে অনেকেরই আগ্রহ কিংবা ভয় কমে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে?

গত কয়েক মাসে সব ধরনের প্রচেষ্টাকে থামিয়ে দিয়ে বিস্ময়করভাবে কভিড-১৯ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে। দি ইকোনমিস্ট গত ১ ফেব্রুয়ারি যখন প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস নিয়ে কাভার স্টোরি করে, তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে কভিডে দৈনিক আক্রান্ত ছিল দুই হাজার ১১৫ জন। আর জুন মাস শেষে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যাই প্রায় দুই লাখে পৌঁছে গেল।

কভিড-১৯ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় বিশ্বকে আর সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ দেখতে হচ্ছে না। এরই মধ্যে এক কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই সংক্রমণসংখ্যা নথিভুক্ত হচ্ছে। অনেকটা অ্যান্টার্কটিকার মতোই ব্যক্তিক্রম শুধু তুর্কিমেনিস্তান ও উত্তর কোরিয়া। আর চীন, তাইওয়ান, ভিয়েতনামের কিছু দেশ মনে হচ্ছে ভাইরাসটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। কিন্তু লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় তা বেড়ে চলেছে। নিয়ন্ত্রণ হারানোয় যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ পড়ে গেছে ঝুঁকিতে। বড় ধরনের ঝুঁকি অপেক্ষা করছে আফ্রিকার দেশগুলোর জন্যও, যেখানে মহামারি প্রাথমিক পর্বেই রয়ে গেছে। এসবের মাঝামাঝি পড়ে আছে ইউরোপ।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কিন্তু এখনো বাকি। ৮৪টি দেশের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার ভিত্তিতে ম্যাসাচুসেট ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একদল গবেষক বলছেন, প্রতিটি নথিভুক্ত সংক্রমণ ঘটনার বিপরীতে নথিবহির্ভূত থেকে যাচ্ছে ১২টি ঘটনা। একইভাবে প্রতি দুটি মৃত্যুর বিপরীতে তৃতীয় আরেকটি মৃত্যুর ঘটনা অন্যান্য রোগের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তাদের হিসাবে ২০২১ সালের বসন্ত নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০ কোটি থেকে ৬০ কোটিতে উঠে যাবে। এমনটা হলে মানুষ মারা যাবে ১৪ লাখ থেকে ৩৭ লাখের মধ্যে। আর বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ থেকে যাবে সংক্রমণের ঝুঁকিতে।

শেষ পর্যন্ত কী হবে তা নির্ভর করছে মানবসমাজ কিভাবে রোগটির মোকাবেলা করে তার ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসকে তিনটি উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—আচরণে পরিবর্তন আনা; টেস্টি ট্রেসিং ও আইসোলেশন এবং এ দুটি ব্যর্থ হলে লকডাউন। আর যেসব সরকারের পরীক্ষা করার সক্ষমতা কম, তাদের অন্য দুটি উপায়ের ওপরই জোর দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, সুস্থ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থেরও প্রয়োজন নেই।

কভিড-১৯-এর চিকিৎসায় উন্নতি হচ্ছে। টিকা ভবিষ্যতের ব্যাপার। কিন্তু আমাদের হাতে যা আছে তা হলো আমরা এখন আগের চেয়ে বেশি জানি, ভাইরাসটি কিভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিও করোনার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। কর্মীরা অনলাইনে লেগে আছে। ঘরে বসেই বিপুল পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করেছে। চীনে দোকানগুলোতে স্পর্শহীন অর্ডার চালু হয়েছে, কফি শপে কাস্টমারদের বসার সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারখানাগুলোয় শ্রম-পালার (ওয়ার্কিং শিফট) ধরনে পরিবর্তন এসেছে, শ্রমিকরা প্লাস্টিক শিল্ড ব্যবহার করছে, ব্যক্তিগত স্পর্শ এড়ানোর জন্য কাজের পদ্ধতিও পরিবর্তন করা হয়েছে। সরকারগুলো লকডাউন এবং প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সংবেদনশীল ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।

সমস্যাটা হচ্ছে চিকিৎসা বা টিকা না আসায় রোগটির নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে মানুষ তার আচরণ পরিবর্তনের ব্যাপারে কতটুকু শিখছে তার ওপর। কভিড-১৯-এর প্রাথমিক আতঙ্কের পর বহু মানুষের বিভ্রান্তি কেটেছে এবং নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে। যেমন—মাস্ক রোগটিকে আটকাতে পারে। অথচ ইউরোপ বা আমেরিকার কিছু লোক মাস্ক পরা পৌরুষত্বে-অহমে লাগে বলে এটা পরতে অস্বীকার করেছে। অনেকে হাত ধুতে চায়নি।

আসলে আচরণে পরিবর্তন আনার জন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিশ্বস্ত ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে পরিষ্কার বার্তার প্রয়োজন। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বেশির ভাগ মানুষই তাদের রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ব্রিটেন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশে যেখানে সর্বোচ্চ মাত্রায় সংক্রমণ ঘটছে, সেখানে তাদের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা করোনাঝুঁকিকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তাঁরা বরং নিজেদের দেশের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি আগ্রহী।

এখন কিছুদিনের জন্য হলেও কভিড-১৯ থাকছে। মানুষ বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। ৯০ শতাংশ অর্থনীতিই ধারাবাহিকভাবে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে। এই পরিস্থিতিতে বহু মানুষ অসুস্থ হবে, অনেকে মারাও যাবে। এখন আপনি মহামারি নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু আপনার প্রতি রোগটির আগ্রহ হারাবে না।

দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা