kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

অপরাধ বাড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক!

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অপরাধ বাড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক!

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে তথাকথিত ‘অনার কিলিং’ নামে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ জুলাই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানতে পারলাম, গ্রেপ্তারের পর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নাসিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল গ্রামের লম্বাহাটির লাইজুকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে তাঁর বাবা সানু মিয়া, মামা মাজু মিয়া ও ভাই আদম আলী। বাংলাদেশে এমন ঘটনার খবর একেবারে নেই, এমন নয়। বিভিন্ন সময়ে এমন খবর আমরা পেয়ে থাকি। তবে হত্যা-সন্ত্রাসের খবর করোনার কারণে কিছুদিন কমে গেলেও আবার তা মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে হত্যা, সন্ত্রাস, মাদক কারবারির প্রবণতা দৃশ্যত অনেকটা কমে এলেও এখন তা বাড়ার প্রবণতা যথেষ্ট লক্ষণীয়।

বলা যায়, অনেক দিন বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ডের খবর ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি খবর আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। মনে হচ্ছে, সামাজিক অবক্ষয়জনিত কারণে ক্রমেই ধ্বংস এগিয়ে আসছে। হত্যা, সন্ত্রাস, মাদক কারবারের ঘটনা গণমাধ্যমে যথেষ্ট লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকলেও এই প্রবণতা পুরোপুরি রোধ করা যাচ্ছে না। দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি ক্রমাগত অব্যাহত রয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যথাযথ তৎপরতা থাকলেও সামাজিক অবক্ষয়প্রবণতা বেড়েছে। আর এই নেতিবাচক প্রবণতা দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগেই সরকারের পক্ষ থেকে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করার সময় এসেছে। আমরা অনুধাবন করছি, করোনার প্রভাবে অভাব-অনটন বাড়ায় সমাজে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে যথেষ্ট। তা ছাড়া মাদকের ভয়ংকর নেশা দেশের তরুণসমাজের একটি বড় অংশকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে পারে। ফলে বেড়ে যেতে পারে হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধ। সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এমনটি অনুমান করা যায় সহজেই।

সাম্প্রতিক সময়ে টাকা লুটে নিতে রাজধানীর দক্ষিণখানে এক যুবককে হত্যার পর লাশ তিন টুকরা করে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হয়। অন্যদিকে ভোলায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন এক স্বর্ণকার। এমন অনেক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। সব ঘটনা একত্র করলে এই সংখ্যা অনেক বড়।

করোনা মহামারি মোকাবেলায় সাধারণ ছুটির সময় এমন অপরাধ কিছুটা কমলেও জনজীবনে গতি ফেরা শুরু করলে বাড়তে থাকে অপরাধ। গত ২৩ জুন কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভয়াবহ পরিসংখ্যান লক্ষ করেছি। ওই পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করা যায়, দেশে অপরাধপ্রবণতা আরো কতটা ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কালের কণ্ঠ’র ওই প্রতিবেদনে পুলিশ সদর দপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গত মার্চ ও এপ্রিলে অপরাধ অনেক কমলেও মে মাস থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করে। জুন মাসে এসে তা আরো বেড়েছে। করোনাকালের শুরুতে অনেক অপরাধ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও কমেনি মাদক কারবার। পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত মার্চে ডাকাতি হয়েছে ২৫টি, খুনের ঘটনা ঘটেছে ২৭৫টি, ধর্ষণের ঘটনা ৪৯০টি, নারী নির্যাতন ১০০৫টি, শিশু নির্যাতন ২১০টি, অপহরণ ৩৮টি, চুরির ঘটনা ৫৫৮টি। এপ্রিলে ডাকাতি ১০টি, খুন ২৭৫টি, ধর্ষণের ঘটনা ৩৩৫টি, নারী নির্যাতন ৪৬৫টি, শিশু নির্যাতন ১২৫টি, অপহরণ ৮টি, চুরি ২৯০টি। এপ্রিলে প্রায় সব অপরাধ কমে এলেও মে মাসে ফের বাড়তে শুরু করে। মে মাসে ডাকাতি হয়েছে ১২টি, খুনের ঘটনা ঘটেছে ৩৬০টি, ধর্ষণ ৩৫৫টি, নারী নির্যাতন ৬৭০টি, শিশু নির্যাতন ১৪০টি, চুরি ৩৯০টি। করোনাকালে গত তিন মাসে দেশে মাদকের মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৭৭০টি। ডিএনসির তথ্য মতে, গত মে মাসে ৪৮০টি মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫১৯ জনকে। এভাবে একের পর এক অপরাধপ্রবণতা আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। আমাদের ধারণা হয়েছিল, করোনার প্রভাবে দেশে অপরাধপ্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা দেখে তা মনে হচ্ছে না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে মনে হচ্ছে, এই প্রবণতা অনেকটা বাড়তে পারে।

অনেক দিন থেকেই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে সহজে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। অবিশ্বাসের প্রবণতা দিন দিন অতিমাত্রায় বেড়েছে। বিভিন্ন অন্যায়-অপকর্মের ফলে সর্বস্তরের মানুষ এক ধরনের শঙ্কা অনুভব করে।

আমাদের দেশে নানা ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে, কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়প্রবণতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমছে না। এ প্রসঙ্গে এর আগেও লিখেছি। প্রসঙ্গক্রমে আবারও লিখছি।

একটি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নই একমাত্র উন্নয়ন নয়। সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতিবোধ সৃষ্টি এবং তার উন্নয়ন ঘটানোর পরিপ্রেক্ষিতে সব স্তরের এবং সব ধরনের অপকর্মের প্রতিরোধ ঘটানো সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের মূল্যবোধ চর্চার উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্থায়ী প্রক্রিয়ায় সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করা যেতে পারে। শুধু গণমাধ্যম ব্যবহার করে সামাজিকভাবে সচেতন করে তোলাই নয়, এ বিষয়ে আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করার সময় এসেছে। আমি মনে করি, এই মুহূর্তে সরকারের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাত্রাকে টেকসই করে তুলতে এবং তরুণদের রক্ষা করতে সামাজিক অবক্ষয় থেকে দেশকে রক্ষা করার কাজে মনোযোগী হতে হবে। এটি রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্বও বটে। শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি নয়, মাঠ পর্যায়ে এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক ভূমিকা পালনের কোনো সহজ বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায় না।

একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কারণে অপরাধ সাময়িক কিছুটা কমেছিল, এতে স্বস্তিতে থাকার সুযোগ নেই। মাদক হচ্ছে সব অপরাধের মূল। করোনার সময়ও মাদক কমেনি। বোঝাই যায়, এ সময়েও সরবরাহ চেইন ঠিক আছে। পুলিশ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। এখন আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে পুলিশকে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। আগামী দিনের বেশ কিছু প্রস্তুতিসহ কমিউনিটিকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। তা না হলে, তথাকথিত ‘অনার কিলিং’সহ সব ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা একেবারে অমূলক হবে না।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা