kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

ওরা যদি পারে, আমরাও পারব

ড. মো. সহিদুজ্জামান

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ওরা যদি পারে, আমরাও পারব

শুনেছিলাম, আমার নানা নাকি জাহাজ বানিয়ে আকাশে উড়িয়েছিলেন। খবর পেয়ে সেই সময় (পূর্ব পাকিস্তান) পুলিশ এসে তাঁকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল এবং জাহাজটি ভেঙে ফেলেছিল। অবশ্য যন্ত্রপাতি রেখে গিয়েছিল। নানাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে তাঁর যন্ত্রপাতি ছোটবেলায় দেখে ভেবেছিলাম, মামারা যদি একটু চেষ্টা করে মোটামুটি আকাশে ওড়ার একটি খেলনা হলেও তৈরি করতে পারতেন, কতই না ভালো হতো। তখনকার দিনে এ রকম উদ্ভাবনী কার্যক্রম করায় কেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছি।

করোনার হাত থেকে বাঁচতে মানুষের চেষ্টার শেষ নেই। প্রতিনিয়ত পাওয়া যাচ্ছে নতুন নতুন তথ্য, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা। চলছে কার্যকর চিকিৎসা ও প্রতিষেধক তৈরির সর্বাত্মক চেষ্টাও। সারা বিশ্ব যেখানে চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশও বসে নেই। মাঝেমধ্যে খবরে প্রকাশিত হয়, দেশে করোনায় সাফল্যকথা, চিকিৎসায় সাফল্য, কার্যকর ওষুধের সন্ধান এবং সর্বশেষ ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টার কথা।

কোনটি আবিষ্কার ও উদ্ভাবন আর কোনটি সফলতা—সে প্রশ্নে যেতে চাই না। তবে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে চিন্তা ও চেষ্টা করছে সেটিই মুখ্য বিষয় এবং নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। করোনার এই দুঃসময়ে অনেকে হয়তো হাত-পা গুটিয়ে বসে বসে সুবিধা ভোগ করছেন। অনেকে প্রতারণার চেষ্টাও করছেন। আবার অনেকে সামান্য কিছু হলেও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যাঁরা চেষ্টা করছেন তাঁদের দমানোর জন্য আবার একটি দল প্রস্তুত হয়ে আছে। আবার একদল আছে যারা সব কিছুতেই গন্ধ খোঁজে এবং অগঠনমূলক সমালোচনা করে।

করোনা ভ্যাকসিন তৈরির কাজ নিয়ে গ্লোব বায়োটেক যে প্রেস কনফারেন্স করেছে তা দেখে আমরা অনেকেই মুগ্ধ হয়েছি। করোনায় আশা-জাগানিয়া এই প্রেস কনফারেন্সকে আগের আশা-জাগানিয়া খবরগুলোর সঙ্গে তুলনা করছি না। কারণ তাদের কাজের ধরন সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত বলে মনে হয়েছে। সেদিনের সংবাদ সম্মেলন থেকে আমি যা বুঝেছি, গ্লোব বায়োটেক কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন তৈরির একটা প্রচেষ্টা শুরু করেছে বাংলাদেশে। আশা-জাগানিয়া কিছু প্রাথমিক গবেষণা তারা সুসম্পন্ন করেছে। ভ্যাকসিন তৈরির আন্তর্জাতিক গাইডলাইন হিসেবে প্রথম তিনটি ধাপ হলো—এক্সপ্লোরেটরি বা অনুসন্ধানাত্মক ধাপ (ভ্যাকসিন প্রার্থী বাছাই), প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপ (গবেষণাগারের প্রাণীতে ট্রায়াল) এবং ক্লিনিক্যাল ধাপ (মানুষে ট্রায়াল দেওয়া)। তারা এরই মধ্যে সফলতার সঙ্গে অনুসন্ধানাত্মক ধাপ পেরিয়ে এসেছে। তারা ডাটাবেইস থেকে কভিড-১৯-এর সব জিন সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য তিনটি ভ্যাকসিন প্রার্থী বাছাই করেছে। এই তিনটি প্রার্থীকে দেশীয় করোনাভাইরাসের জিন থেকে আলাদা করে তা সঠিক কি না প্রমাণ করেছে। প্রি-ক্লিনিক্যাল ধাপে তাঁরা খরগোশের দেহে এই ভ্যাকসিন প্রার্থী প্রয়োগে অ্যান্টিবডি উৎপাদনের প্রমাণ পেয়েছে। তাদের পরিকল্পনা মতে, শিগগিরই তারা গাইডলাইন অনুসরণ করে একটি নিয়ন্ত্রিত এনিম্যাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করবে, যা ভ্যাকসিন আবিষ্কার বা তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রেস কনফারেন্সে যিনি (ড. আসিফ মাহমুদ) বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন তাঁর যে এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রয়েছে তা আমি একজন বিজ্ঞানের গবেষক হিসেবে নির্দ্বিধায় বলতে পারি। আমি বিশ্বাস করি, ভ্যাকসিন তৈরির এই দলটিতে যেসব গবেষক রয়েছেন তাঁরা নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে আপ-টু-ডেট জ্ঞান রাখেন এবং কঠোর পরিশ্রম করেছেন। অন্যথায় এই অল্প সময়ে ভ্যাকসিন তৈরির দ্বিতীয় ধাপে আসতে পারতেন না। তাঁদেরকে আমাদের অবশ্যই অভিনন্দন ও অনুপ্রেরণা দেওয়া প্রয়োজন।

গতকাল পর্যন্ত সারা বিশ্বের করোনা ভ্যাকসিন আপডেট লক্ষ করলে দেখা যায়, ১২৫টির বেশি ভ্যাকসিন প্রার্থী প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে রয়েছে। এর পরের ধাপ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তিনটি ফেজের প্রথমটিতে রয়েছে ১৪টি, দ্বিতীয় ফেজে ১১টি, তৃতীয় ফেজে রয়েছে তিনটি। এ পর্যন্ত অনুমোদন পেয়েছে মাত্র একটি ভ্যাকসিন। আমরা যদি গ্লোব বায়োটেকের প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনকে প্রি-ক্লিনিক্যাল স্টাডি পর্যায়েও বিবেচনা করি, তাহলে সেটি ওই ১২৫টির দলে ঢুকবে। এটিই বা কম কিসে।

কভিড-১৯-এর ৭৬টি জিন সিকোয়েন্স বাংলাদেশ থেকে জমা পড়েছে। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই সিকোয়েন্সগুলো করেছে তারাও প্রশংসার দাবিদার। কারণ সিকোয়েন্স তথ্য ছাড়া ভ্যাকসিন ক্যানডিডেট টার্গেট করা সম্ভব নয়। আরটিপিসিআরের মতো একটি সূক্ষ্ম ও জটিল কারিগরি পদ্ধতি অল্প সময়ে আয়ত্ত করে দেশে কভিড-১৯ শনাক্তকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও বা কম কিসে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মিডিয়ায় বিষয়গুলো যখন পরিবর্তিত হয়ে আসে, তখন সেই আঙ্গিকে এমন কিছু সমালোচনা করা হয়, যা উদ্যোক্তা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। গ্লোব বায়োটেক কিন্তু বলেনি যে তারা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে ফেলেছে। তারা করোনা ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করে সফলতার সঙ্গে এগোচ্ছে, এভাবে মিডিয়ায় এলে ভালো হতো। আবার দেখা যায়, যিনি কোনো দিন গবেষণা করেননি বা গবেষণার জন্য পিপেটটিও ধরেননি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই, তিনিও মিডিয়ায় মন্তব্য করে বসেন। কিছু একটা না বলতে পারলে তিনি ভালো বক্তা নন বা জ্ঞানী নন, এটি মনে হয় আমাদের দেশের একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বে নিজেদের জায়গা করতে গেলে জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়েই করতে হবে। অন্য কিছু দিয়ে নয়। তৈরি করতে হবে নিজস্ব ব্র্যান্ড। অনেক মেধাবী দেশে মূল্যায়ন না পেয়ে বিদেশে অন্যের ব্র্যান্ড তৈরি করে যাচ্ছেন, সে খবর হয়তো বা আমরা রাখি না। তাঁরা এ দেশে বঞ্চিত হলেও দেশকে ভালোবাসেন, সুযোগ পেলে দেশের জন্য কাজ করতে চান। আবার যাঁরা নেহাতই দেশে রয়ে গেছেন তাঁরা এভাবে ট্রল খেয়ে হতাশ হতে হতে হয়তো একদিন থেমে যাবেন। আমাদের দরকার উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। দেশে অনেক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষক আছেন, তাঁদের কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের দেশের ব্র্যান্ড তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে, যেমন—ভারত, চীনসহ অনেক দেশেই করছে। অন্যের ব্র্যান্ড আমদানি করার মনোভাব পাল্টাতে হবে। ওরা যদি পারে, আমরাও পারব।

দেশে মেডিক্যাল সায়েন্সে গবেষণা হয় না বললেই চলে। যাঁরা করেন তাঁরা মেডিক্যাল সায়েন্সের গ্র্যাজুয়েট নন। দেশে করোনা চিকিৎসা গবেষণা ও কিট তৈরির চেষ্টা অনেক প্রতিষ্ঠান করছে। কিন্তু এসব গবেষণা ও কিটের অনুমোদন বা স্বীকৃতির জন্য যাঁরা মূল্যায়নকারী তাঁদের সে বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং স্বীকৃত কোনো জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ আছে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

গবেষণা বা বিভিন্ন টেস্টের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করা কিট যে সব সময় সঠিকভাবে কাজ করে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এমনও দেখেছি, কিছু দেশের কিটে যে পরিমাণ কার্যকারিতার কথা বলা হয় সেই পরিমাণ কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। অথচ আমদানি করা হচ্ছে হরহামেশাই। আমদানি করা কিটগুলো অনুমোদনের সময় সঠিকভাবে পরীক্ষা করে অনুমোদন দেওয়া হয় কি না জানি না, তবে দেশীয় কিট যেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয় সেভাবে দেখলে হয়তো অনেক কিটই সঠিক ফলাফল দেবে না।

দেশে অনেক মেধাবী আছেন সব পেশায়। তাঁদের মূল্যায়ন করলে দেশেই অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব। আমরা বিশ্বাস করি, শুধু কিট বা ভ্যাকসিন নয়, আমাদের মেধাবীদের করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য পিসিআর মেশিন তৈরি করতে বললেও তাঁরা পারবেন। কিন্তু সেই উদ্যোগগুলো কি আমরা নিচ্ছি। আমরা আমদানি করতে ভালোবাসি। কারণ এখানে ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ মেটানোর সুযোগ থাকে।

দেশকে বাঁচাতে হলে শিক্ষা ও প্রযুক্তি দিয়েই বাঁচাতে হবে, অন্য কিছুতে নয়। মেধা বাঁচলে জাতি বাঁচবে। মেধার মূল্যায়ন হলে জাতির মূল্যায়ন হবে—এই চিরন্তন সত্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আমরাও গর্বের সঙ্গে বলতে পারব, ‘ওরা পারলে আমরাও পারি’।

 

লেখক : গবেষক ও অধ্যাপক

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা