kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

কর্মসংস্থানে জোর দিতে হবে

এম হাফিজউদ্দিন খান

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কর্মসংস্থানে জোর দিতে হবে

খবরে দেখলাম, সামাজিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে পুলিশ। এই আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। এমনটা ঘটতেই পারে। কারণ অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামাজিক অবস্থার একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতি ভালো না থাকলে সমাজ ভালো থাকে কী করে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা তার আচার-আচরণ, সামাজিকতা, অপরাধপ্রবণতা ইত্যাদির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

আগে থেকেই দেশে অনেক মানুষ বেকার ছিল। এর মধ্যে করোনা এসে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বেকার করে দিচ্ছে। হঠাৎ বেকারত্ব মানুষের মধ্যে বড় ধরনের হতাশা সৃষ্টি করে। অসহায় অবস্থায় পড়ে যায় মানুষ। এতে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে—এটাই আশঙ্কার কারণ। অনেক মানুষের বহুদিন ধরে কোনো কাজকর্ম নেই। ব্যবসায় কেনাবেচা হচ্ছে না। অনেক মানুষ পেশা পরিবর্তন করছে বলে খবর বের হচ্ছে। অনেক মানুষ আগে যে কাজ করেনি, সে কাজও করার চেষ্টা করছে। এর কিন্তু একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। কাজ না থাকায় বা রোজগার কমে যাওয়ায় নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ। এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যদি আরো বাড়তে থাকে, তার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতেই পড়বে না; সামাজিক নানা সূচকে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আমাদের দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতটা অনেক বড়। এর তুলনায় সরকারি চাকরি বা মিল-কারখানায় কাজ করা মানুষের সংখ্যা অনেক কম। বেশির ভাগই তো কৃষক, দোকানদার বা হকার। অস্থায়ী বা ভাসমান চটপটির দোকান, ফুচকার দোকান—এসব তো বন্ধ হয়ে গেছে। চিনাবাদাম, ঝালমুড়ি ফেরি করে এমন মানুষগুলো বেকার হয়ে বসে আছে। তাদের জীবন, সংসার কিভাবে চলছে ভাবা যায় না। ধোপা, নাপিতের অবস্থাও করুণ। এ রকম দুরবস্থা চারদিকে চলছে। এ দুরবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে না পারলে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। যদি পরিস্থিতির অবনতি হয়, তাহলে কেবল প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলা করাই যথেষ্ট হবে না। প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি মানুষকে কিভাবে আয়-রোজগারের মধ্যে দ্রুত আনা যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। সংকুচিত হয়ে আসা কর্মসংস্থান যতটা সম্ভব দ্রুত আগের অবস্থায় ফেরানের উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষকে কাজের মধ্যে রাখতে হবে।

বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলোর শিক্ষকরা মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়েছেন। এমপিওর বাইরে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়ে পড়া লোকদের বড় একটা অংশ তারা। মানুষের কষ্টের তো কোনো সীমা নেই। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এগুলো সঠিকভাবে নিরূপণ করা এবং পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারের সমন্বিত ও সুচিন্তিত কোনো কর্মসূচি তো দেখতে পাচ্ছি না। প্রতিটি খাতের মানুষ, যারা করোনার কারণে বেকার হয়ে গেছে এবং হচ্ছে, তাদের কিভাবে সাহায্য করা যায়, সে ব্যাপারে একটা সুস্পষ্ট কর্মপন্থা গ্রহণ করা দরকার। কী পরিমাণ মানুষকে রান্না করে খাওয়ানো গেল, তা দিয়ে এত বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এটার জন্য একটা সুনির্দিষ্ট ও বৃহৎ কর্মসূচি দরকার। এর মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের লোকদের সাহায্য-সহায়তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবহন খাতের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু পুরোপুরি সচল হতে অনেক বাকি আছে। পরিবহনের চাকা আর কতটা ভালোভাবে ঘোরানো যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

দোকানপাটে ক্রেতা যাচ্ছে না। আমি নিজেও যাচ্ছি না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো জিনিসপত্র ক্রয় করছি না। যেমন ধরুন, কাপড়ের দোকান। আমাকে যেহেতু বাইরে যেতে হচ্ছে না, তাই কাপড় কেনার প্রয়োজন বোধ করছি না। আমার যা আছে, তা দিয়েই চলে যাচ্ছে। প্রায় মানুষের মধ্যেই এ রকম অবস্থা বিরাজ করছে। নারীদের সাজগোজের জিনিস ক্রয়, পার্লারে যাওয়া—এগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সামাজিকতা কমে গেছে বলে চাহিদাও কমে গেছে। চাহিদা কিন্তু অনেকটা দেখাদেখিও সৃষ্টি হয়। সেটা এখন ঘটছে না। আবার পণ্য সামনে দেখলেও চাহিদা তৈরি হয়। দোকানে দেখলাম বা আরেকজন ক্রয় করল, এটা দেখে অনেক সময় চাহিদা তৈরি হয়। এই স্বাভাবিক অবস্থাটা এখন নেই। মানুষ প্রায় দোকানে যাচ্ছেই না, নেহাত দায়ে না পড়লে। একমাত্র খাওয়ার জিনিস, ওষুধ ছাড়া কোথাও মানুষ কেনাকাটা করতে যাচ্ছে না। শখ করে কোনো জিনিস মানুষ কিনতে যায় না। সম্প্রতি সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হচ্ছে এখনই বলা যাবে না।

আসলে এক করোনা অসংখ্য সমস্যা তৈরি করেছে। সমস্যার যেন শেষ নেই। বাজেট নিয়েও নানা সমালোচনা হলো। পরিস্থিতি উত্তরণে বাজেটেও কোনো দিকনির্দেশনা নেই। অথচ সরকার বলছে, তারা সবই করতে পারবে। কিন্তু কিভাবে করবে এটা অর্থনীতিবিদদের কাছে স্পষ্ট নয়। প্রণোদনা প্যাকেজ যেটা দেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদরা সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। প্রণোদনা প্যাকেজটা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

করোনার আরেক ধাক্কা, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। এটাই স্বাভাবিক। যেখানে বড় ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে তাঁদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। তাঁদের পক্ষে ক্ষতি টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। অথচ তাঁদের ব্যবসার সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাঁদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া উচিত। তাতে বেকার হয়ে পড়ার হার অনেকাংশে কমে আসবে। অর্থনীতিও অনেকটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

এর মধ্যে রেমিট্যান্স বাড়ার সুখবর পাওয়া গেছে। তবে এটি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার অর্থনৈতিক কারণটা স্পষ্ট নয়। এটা একটা রহস্য, একটা প্যারাডক্সও বটে। তবে প্রতিবারই ঈদের আগে কিছুটা বাড়ে। সামনে কোরবানির ঈদ। হয়তো সে কারণেও বাড়তে পারে। এর সঙ্গে সরকারের রিজার্ভও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নগদ ২ শতাংশ প্রণোদনাসহ নানা পদক্ষেপের কারণে রেমিট্যান্স বাড়ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ যাতে অব্যাহত থাকে, সে জন্য সরকারের তৎপরতা বজায় রাখতে হবে। আর বিদেশি সাহায্য অনেক পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে রিজার্ভ বেড়ে থাকতে পারে। বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠান তো সহায়তা দিচ্ছে।

তবে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বাড়লেও আমাদের রপ্তানি কিন্তু বাড়ছে না। সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে প্রণোদনা দিচ্ছে রপ্তানিকারকদের। রপ্তানি বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। সদ্য পাস হওয়া বাজেট নিয়ে আমাদের অর্থনীতিবিদরা কিন্তু ভালো কথা বলেননি। বাজেট নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সমালোচনা করেছে। কিন্তু এসব ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা দেখা যাচ্ছে না। তবে সরকার একই কথা বারবার বলে আসছে, তারা বাজেটের সব কিছু বাস্তবায়ন করতে পারবে।

এসব পরিস্থিতিতে আমাদের অর্থনীতির সামনের দিনগুলো অস্পষ্ট। সামনে কী হবে বোঝা যাচ্ছে না। করোনা কোন দিকে যাবে, বাড়বে নাকি কমবে—বোঝা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং বেড়েই চলেছে। সে অনুসারে সরকারের তৎপরতা বাড়ছে না। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। এটা গরিব মানুষের জন্য সমস্যা হবে। একাধিক চিকিৎসক মারা যাচ্ছেন। চিকিৎসক হারানো বড় ধরনের জাতীয় ক্ষতি। এগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা দরকার। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে করোনার ওপরই নির্ভর করছে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি। তাই সরকারকেও সেভাবে তৎপরতা বাড়ানো দরকার। কিন্তু করোনার গতিকে হারিয়ে দিতে পারে এখন পর্যন্ত সে রকম তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। উদ্বেগের বিষয় এটাই।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা