kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

ভবিষ্যৎ মহামারির সঙ্গে লড়াই

বিল গেটস

৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভবিষ্যৎ মহামারির সঙ্গে লড়াই

আমি বিশ্বাস করি, মানবতার কাছে এই মহামারি পরাজিত হবে। তবে তার আগে বেশির ভাগ মানুষের জন্য টিকা নিশ্চিত করতে হবে। এর আগ পর্যন্ত জীবন স্বাভাবিক হবে না। সরকার যদি তাদের আরোপিত কঠোরতা শিথিল করে এবং সব ব্যবসা-বাণিজ্য খুলে দেওয়া হয়, তা-ও আগের পরিস্থিতিতে আমরা খুব সহজেই ফিরতে পারব না। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাও খুব সহজে কাটবে না। কারণ মানুষের চাহিদা কমছে। খরচের হাত গুটিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা খুব সহজে যাবে না।

মহামারির কারণে উন্নত দেশগুলোর কার্যক্রম ধীর হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি ভয়াবহ। এই দেশগুলো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছে। গরিব দেশগুলোতে অল্প কিছু কাজের সুযোগ হয়তো অবশিষ্ট থাকবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়মও এই দেশগুলোতে খুব একটা কার্যকর হবে না। ভাইরাস দ্রুত ছড়াবে। এসব দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও শক্তিশালী নয়। ফলে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে।

ধনী দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। যেমন—জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো শুধু সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে যাবে না, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবাই পাবে; অন্তত ভাইরাস সংকটের একটি সুনির্দিষ্ট সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত। আর ভাইরাস সংকটের সমাধান হচ্ছে টিকা।

আগামী বছর চিকিৎসা গবেষকরাই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের অন্যতম হয়ে উঠবেন। আমাদের সৌভাগ্য যে এই মহামারির আগেও তাঁরা টিকা তৈরিতে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রচলিত টিকাগুলো আমাদের শরীরকে রোগ সৃষ্টিকারী (প্যাথজেন) চিনতে সাহায্য করে। সাধারণত শরীরে মৃত বা দুর্বল হয়ে যাওয়া ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়ে এই কাজ করা হয়। তবে নতুন এক ধরনের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা পাওয়া গেছে। ফলে গবেষকদের এখন প্রচুর প্যাথজেন তৈরি করার পেছনে সময় দিতে হবে না। নতুন ধরনের এই টিকায় জেনেটিক কোড ব্যবহার করা হয়েছে। এই কোড কোষকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কী করে বাড়াতে হয় সেই নির্দেশনা দেবে। প্রচলিত টিকার তুলনায় সম্ভবত এগুলো দ্রুত উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

আমি আশা করছি, ২০২১ সালের দ্বিতীয় ভাগে পুরো বিশ্বের জন্য একটি টিকা তৈরি করা সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে এটি হবে ইতিহাস সৃষ্টিকারী অর্জন। কারণ রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধী ব্যবস্থা সৃষ্টিকারী টিকা সবচেয়ে দ্রুততর সময়ের মধ্যে পাওয়া সম্ভব হবে।

টিকার ক্ষেত্রে এই অগ্রগতি ছাড়াও এই মহামারির কল্যাণে চিকিৎসাক্ষেত্রে দুটি অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। প্রথমত রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রে। এরপর যখন একটি নতুন ভাইরাস পাওয়া যাবে, মানুষ সম্ভবত তখন এই ভাইরাসকে বাড়িতেই পরীক্ষা করে শনাক্ত করতে পারবে; অনেকটা প্রেগন্যান্সি পরীক্ষার মতোই।

আরেকটি অর্জন হচ্ছে ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ। বিজ্ঞানের এই শাখায় খুব একটা বিনিয়োগ করা হয়নি। ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী যত ওষুধ আমাদের আছে, ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধের ক্ষেত্রে আমরা ঠিক ততটাই দুর্বল। তবে এবার পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসবে। গবেষকরা এখন ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধের দিকে মনোযোগী হবেন। নানা বৈচিত্র্যের বিপুল ওষুধ তৈরি হবে, যাতে নতুন ভাইরাস দেখা দিলে তার চিকিৎসায় দ্রুত ওষুধ পাওয়া সম্ভব হয়।

এসব প্রযুক্তিই আমাদের পরবর্তী মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রস্তুত করবে। সে ক্ষেত্রে সংক্রমণের মাত্রা কম থাকতেই ব্যবস্থা নেওয়া সহজ ও সম্ভব হবে। তবে একই সঙ্গে বর্তমান সংক্রামক রোগগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতেও গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে।

আমাদের অগ্রগতি শুধু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিজ্ঞান থেকে অর্জিত সুবিধাগুলো কী করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় সে সম্পর্কেও আমাদের উদ্যোগী হতে হবে। আমি মনে করি, ২০২১ সালে আমরা আবার ১৯৪৫ সাল থেকে শিক্ষা নেব। ওই বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। বিশ্বনেতারা আরো সংঘাত প্রতিরোধের লক্ষ্যে জাতিসংঘের মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করেন। কভিড-১৯-এর পর বিশ্বনেতারা নিশ্চয়ই আরেকটি মহামারি থেকে মানুষকে বাঁচাতে এমনই আরেকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করবেন।

এই সংস্থা হবে বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল আর প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত। আমি আশা করি, সেনাবাহিনীকে যেমন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হয়, তেমন করেই এই সংস্থাকেও গঠন করা হবে। যুদ্ধের যেমন মহড়া দেওয়া হয়, তেমনি ‘জীবাণুর মহড়া’ দেবে এই সংস্থা।

আমি আশা করি, ধনী দেশগুলো এবং একই সঙ্গে দরিদ্র দেশগুলো এই প্রস্তুতিতে অংশ নেবে। দরিদ্র দেশগুলো তাদের বৈদেশিক সহায়তার বেশির ভাগ অংশ ব্যবহার করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

 

লেখক : মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য