kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

সেলাই করা খোলা মুখ

আমাদের ‘কামধেনু’ ফিরে আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে

মোফাজ্জল করিম

৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



আমাদের ‘কামধেনু’ ফিরে আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে

চারদিকে এত দুঃসংবাদ : করোনাভাইরাসে প্রতিদিন অকালে ঝরে যাচ্ছে কত প্রাণ, অকস্মাৎ হারিয়ে যাচ্ছে কত প্রিয়মুখ, দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যার পদধ্বনি, পথে-ঘাটে, পাড়ায়-মহল্লায় কর্মহীন ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল। এর ভেতর ২৯ জুন সোমবার সকালে শোনা গেল এক জলরাক্ষসের করাল থাবা ঢাকার সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে কেড়ে নিয়েছে তেত্রিশটি অসহায় মানুষের প্রাণ। এসব খবরের পাশাপাশি আমাদের নিত্যসঙ্গী খুন-ধর্ষণ-সড়ক দুর্ঘটনা যে থেমে আছে তা না। একটা দুঃসংবাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আসছে আরেকটা দুঃসংবাদ। সংবাদ মানেই যেন এখন দুঃসংবাদ। করোনাভাইরাসের বিষাদাক্রান্ত লকডাউন জীবনের লক কবে যে খুলবে, আদৌ খুলবে কি না কেউ বলতে পারে না। এক অমোঘ নিয়তির হাতে নিজেদের সমর্পণ করে অসম্ভব আর অলীক আশার মেঘদূতের পথ চেয়ে বসে থাকা ছাড়া যেন আর কিছুই করার নেই আমাদের।

তবু জীবন কিন্তু থেমে থাকে না। তার নটে গাছটি না মুড়ানো পর্যন্ত ধুঁকতে ধুঁকতে হলেও চলতে থাকে। চলছে বাংলাদেশেও। করোনা এবং আরও হাজারটা জীবনজগত্জনিত সমস্যায় আক্রান্ত সেই জীবন এখন হয়ত ছুটে চলছে না দুর্বার গতিতে, চলছে মন্দাক্রান্তা লয়ে। জীবনকে কখনো বাসিন্দা হতে হয় রেড জোনের, কখনো করোনা টেস্টের জন্য ধর্না দিতে দিতে জানটা তেজপাতা হওয়ার পর তাকে ঢোকানো হয় আইসিইউতে, রাখা হয় ভেন্টিলেটরে।

আইসিইউর বাইরের বাংলাদেশ তখন শুনতে পায় আগামী এক বছর দেশের মানুষকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে, উন্নয়নের মহাসড়কে জোর কদমে এগিয়ে নিতে, জাতীয় সংসদে ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাশ হয়েছে। আমি নিশ্চিত, দেশের শতকরা অন্তত ৮০ জন মানুষের কোনো ধারণাই নেই এত লক্ষ এত হাজার কোটি টাকা মানে কত টাকা, তারা কল্পনাও করতে পারে না এত টাকা কোত্থেকে আসবে। তারা যদি শুনে যে তাদের মায়ে খেদানো বাপে তাড়ানো এক কালের ‘নিষ্কর্মার ধাড়ি, আপদটা মরলেই বাঁচি’, ডাকাবুকা ছেলেটার মত লক্ষ লক্ষ ছেলে এবং দুশ্চিন্তায় মা-বাপের ঘুম হারাম করা লক্ষ লক্ষ অরক্ষণীয়া মেয়েই এই টাকা জোগান দেয় তা হলে মাথা ঘুরে পড়ে তাদের দাঁত কপাটি লেগে যাবে। অথচ আসলে ব্যাপারটা তো তাই। প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রবাসী বাঙালিরা দেশে যে হাজার হাজার কোটি টাকা পাঠিয়ে থাকেন, আর সকাল-সন্ধ্যা একটা সেলাই মেশিনে উবু হয়ে থেকে ‘জীবন-যৌবন-ধনমান’ সঁপে দিয়ে গার্মেন্টের মা লক্ষ্মীরা যে তিন হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করেন এসবই তো দেশের মানুষের ভাত-কাপড় জোগায়, দেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ বানায়। এসব কথা কিন্তু বাত কি বাত নয়। ক’দিন আগে যে অর্থবছর শেষ হলো সে বছরে (২০১৯-২০) প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন এক লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার এক শ কোটি টাকারও বেশি (১৮.৩২ বিলিয়ন ডলার)। আর রেডিমেড গার্মেন্ট, ডাকনাম আর এম জি থেকে রপ্তানি আয় তিন লক্ষ হাজার কোটি টাকার মত (৩৪.১৩ বিলিয়ন ডলার)।

২.

তাইতো আমি গার্মেন্ট কন্যাদের বলি গোল্ডেন গার্ল, জি জি, যদিও জি জি-তে সাধারণতঃ বোঝানো হয় গার্মেন্ট গার্ল। তা গোল্ডেন গার্লই বলি আর গার্মেন্ট গার্লই বলি আসলে এরা মা লক্ষ্মী। সেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে যখন প্রাক্তন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি)-এর আমাদের এক সময়ের অত্যন্ত চৌকশ, ধীশক্তিসম্পন্ন সহকর্মী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জনাব নূরুল কাদের খান চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর হাতে গোনা আরও কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তিসহ দেশে তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে তুলতে ব্রতী হলেন তখন তাঁদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় স্বল্পসংখ্যক তরুণী প্রশিক্ষণ নিয়ে যোগ দিলেন তৈরি পোশাক শিল্পে। সেই থেকে শুরু। এরপর যা সে তো ইতিহাস। দেশে সেই প্রথম যাত্রা শুরু তৈরি পোশাক শিল্পের ও তার পাশাপাশি হাজারে হাজারে ও ক্রমে লক্ষে লক্ষে প্রশিক্ষিত মহিলা শ্রমিকদের পদচারণে মুখরিত হলো সেই শিল্পাঙ্গন। এই মেয়েরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে এই শতকরা এক শ ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পকে যা দিচ্ছেন সেই তুলনায় তাঁদের পারিশ্রমিক খুবই নগণ্য। তাঁদের বঞ্চনা-বিড়ম্বনা নিয়ে মাঝে মাঝে কেউ কেউ আহা-উঁহু করেন, তবে তা ওষ্ঠসেবা (লিপ সার্ভিস)-এর বেশি কিছু নয়। আর প্রকৃতিগতভাবে এই মহিলা শ্রমিকরা এমনই শৃঙ্খলাপরায়ণ যে শত অভাব-অভিযোগ-বঞ্চনা সত্ত্বেও এঁরা মাটি কামড়ে (নাকি মেশিন কামড়ে?) পড়ে আছেন যুগ যুগ ধরে। একমুহূর্তের জন্যও তাঁদের মেশিনের চাকা থামেনি। বোধ হয় থামবেও না কোনো দিন। কারণ এঁরা যে ভালোবাসেন তাঁদের কাজকে, তাঁদের মেশিনকে, নিজের সন্তানের মত। এঁদের রক্তে-ঘামে গড়ে ওঠা রেডিমেড গার্মেন্ট শিল্প আজ বাংলাদেশকে এক সুউচ্চ অবস্থানেই শুধু নিয়ে যায়নি, বিশ্বসভায় দেশকে এনে দিয়েছে দুর্লভ সম্মান।...বেঁচে থাকো মা লক্ষ্মীরা।

৩.

হ্যাঁ, গার্মেন্টকন্যারা নিশ্চয়ই বেঁচে থাকবে, বেঁচে থাকবে বাংলাদেশের ব্রেড অ্যান্ড বাটার রেডিমেড গার্মেন্ট শিল্প। এর প্রধান কারণ এটা এই দেশের শিল্প। এর প্রতি সরকার, বেসরকার ও আপামর জনসাধারণের একটা অন্তরের টান আছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্য যে বড় উৎস সেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ—আজকাল যেটার নাম হয়েছে রেমিটেন্স—তা নিয়ে কিন্তু ঈশানকোণে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ধীরে ধীরে যে শ্রমবাজারে বাংলাদেশ প্রদৃপ্ত পদচারণে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে, করোনা-রাক্ষসীর কোপানলে পড়ে সে বাজারেও এখন আগুন লাগে লাগে অবস্থা।

করোনার কারণে দুনিয়ার অন্য সব দেশের মত মধ্যপ্রাচ্যের তৈলসমৃদ্ধ দেশগুলোও অর্থনৈতিকভাবে সাম্প্রতিককালে বেশ বড় রকম ঝাঁকুনি খেয়েছে। তাদের একমাত্র রপ্তানি পণ্য জ্বালানি তৈলের বিশ্ববাজারে এখন রীতিমত মন্দা চলছে। ফলে তৈল রপ্তানি গেছে কমে। এর ‘স্নোবল ইফেক্ট’ পড়েছে ওইসব দেশের স্থানীয় শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। আর তার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সৌদি আরবের মত ধনী দেশও শুরু করেছে শ্রমিক ছাঁটাই ও মজুরি হ্রাস। ইতিমধ্যে তারা শ্রমিক সরবরাহকারী দেশগুলোকে নিজ নিজ দেশের শ্রমিকদের ফেরত নিতে বলতে শুরু করেছে। নিবন্ধের শুরুতে যেসব দুঃসংবাদের কথা বলেছিলাম তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এই আরেক দুঃসংবাদ।

হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছেন। বিদেশে এঁরা সবাই একা থাকেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে যাওয়া যায় না ওসব দেশে। ফলে এ ধরনের শ্রমিকের খাই-খরচ খুব একটা বেশি না। যা উপার্জন করেন তার সিংহভাগ তাঁরা নিয়মিত পাঠিয়ে থাকেন দেশে। কিন্তু এখন তাঁদের কাজও নেই, আয়ও নেই, তাঁরা বেকার। এখন তাঁরা দেশে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, নিজেদের খরচ চালাতেও পারছেন না। ইতিমধ্যে প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক ফেরত এসে গেছেন বাংলাদেশে। এখন পর্যন্ত নিয়মিত বিমান সার্ভিস চালু হয়নি। ওটা শুরু হলেই ধারণা করা হচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে শ্রমিককে পাঠিয়ে দেওয়া হবে নিজ নিজ দেশে। তখন? তখন কী হবে? একমাত্র সৌদি আরবেই আছেন প্রায় ২৫ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিক। চাকরিবাকরি, সহায়সম্বল হারিয়ে এঁদের অর্ধেকও যদি দেশে ফেরেন তা হলে আমাদের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হবে তা কি আমরা সামলাতে পারব? ভাবতেই ভয় লাগে। দেশে এঁদের পরিবার তো আবার এঁদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এখন আয় নেই, তাই নির্ভরতার জায়গাও নেই।

অথচ সারাজীবন এই প্রবাসী শ্রমিকরা পরিবারের জন্য, আত্মীয়-স্বজনের জন্য, দেশের জন্য কী না করেছেন? বিদেশ যাওয়ার আগে সকলের চক্ষুশূল যে অপদার্থ বেকার ছেলেটি খালি সকলের গালমন্দই খেয়েছে, দু’বেলা সব সময় দু’মুঠো খেতেও পায়নি, বিদেশ গিয়ে সেই ছেলেই পরিবারের চেহারা পাল্টে দিয়েছে। এখন তার বদৌলতে ছনের ঘরগুলোর জায়গায় হয়েছে কয়েকটি দালান, বাড়িতে এসেছে ফ্রিজ, টিভি, স্মার্টফোন আরও কত কী। গরিব আত্মীয়-স্বজনকে পায়পর্বে সাহায্য-সহায়তা করে, কন্যাদায়গ্রস্ত কোনো পিতাকে উদ্ধার করে সেই মিডল ইস্টে বসে।

এদের কাঁধে চড়েই তো বাংলাদেশ এখন এক্কা-দোক্কা খেলার মত উন্নয়নের ঘরগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে। এদের শেকড় প্রোথিত এদেশের পরিশ্রমী কৃষককুলে, যেখানে জন্মের পর থেকে শেখানো হয় কীভাবে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে শীতগ্রীষ্ম বারোমাস হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দেশবাসীর অন্ন জোগাতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উষ্ণতায় পীচগলা রাস্তায় গাঁইতি চালানো কিংবা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে শীতের রাতে সড়ক প্রহরীর ডিউটি তাই তাকে কাবু করতে পারে না। সে সব সহ্য করে শুধু দেশে তার পরিবারকে একটু সুখের মুখ দেখানোর জন্য, তার দুঃখিনী মায়ের মত দেশের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।

৪.

সে বিদেশ থেকে দেশকে শুধু দিয়েই গিয়েছে, কিছুই নেয়নি দেশ থেকে। দেশ তার কাছ থেকে চেয়েছে আর সে হিন্দু ধর্মের পুরাণোক্ত সর্ব-অভীষ্টদায়িনী কামধেনুর মত সারাজীবন শুধু দিয়েই গিয়েছে, বিনিময়ে মা-বাবা, ভাই-বোন, পরিবার-পরিজনের দু’আ ছাড়া আর কিছুই চায়নি, পায়ওনি। আজ সে এক আলোকোজ্জ্বল ভুবন থেকে অকস্মাৎ একরাশ অন্ধকারে নিপাতিত হয়েছে।

আজ কি তার জন্য কিছু করার নেই এই দেশের, এই জাতির? মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তো আমাদের খুবই ভালো সম্পর্ক, তাদের আমরা বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে জোর দিয়ে বলি না কেন : ভাইজানেরা, এই করোনাকালে তোমরা একটু রহমদিল হও। আল্লাহ তোমাদের অনেক দিয়েছেন। তোমরা ইচ্ছা করলেই তোমরা যাদের ‘মিসকিন’ বলো সেই দুস্থ মানুষগুলোকে এই দুঃসময়ে তাড়িয়ে না দিয়ে তাদের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে পারো। আমাদের কর্তৃপক্ষ তো বিষয়টিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আইএলও)-এর হস্তক্ষেপও কামনা করতে পারেন, সঙ্গে নিতে পারেন ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মত দেশকেও। আর সরকার তো দেশের সব শ্রেণি-পেশার দুস্থ মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছে এই করোনাকালে। তা হলে বিপন্ন ‘কামধেনুরা’ দেশে যদি ফিরেই আসে বিতাড়িত হয়ে তা হলে তাদের সাময়িকভাবে আর্থিক সাহায্য দেওয়া ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা কি সরকারের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? কথাটি মনে করি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার দাবি রাখে।

সব শেষে একটা কথা বলতে চাই। মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বের অন্যান্য দেশে কর্মরত এসব শ্রমিক তো আপনার-আমারই সন্তান। শুধু সন্তান নয়, পরিবারের আশা-ভরসার একমাত্র আশ্রয়স্থল। আজ যদি সে অসুস্থ হয়ে বা বিপদে পড়ে বাবা-মার কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হয় তা হলে তার জনক-জননী হয়ে কি আমরা মুখ ফিরিয়ে নেবো? নিশ্চয়ই না। আসুন, আমরা তার পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল জনক-জননীর সকৃতজ্ঞ ভূমিকা পালন করি।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

মন্তব্য