kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে টিকে থাকার কৌশল

ড. মো. নাছিম আখতর

৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে টিকে থাকার কৌশল

বিশ্ব অর্থনীতি থমকে গেছে। মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তির নিঃশ্বাস এখন অনেকটাই রূপকথার গল্পের মতো। করোনাভাইরাসের কবল থেকে পৃথিবী কবে পরিত্রাণ পাবে, তা একমাত্র বিধাতাই জানেন। করোনা দেশ তথা বিশ্ব অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের সূত্র মতে, ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আরব বিশ্বের ৫০ লাখ, ইউরোপে এক কোটি ২০ লাখ এবং এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১২৫ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিকের কাজের কর্মঘণ্টা করোনার কারণে নষ্ট হবে। চীনে প্রায় পাঁচ লাখ প্রতিষ্ঠান স্থায়ীরূপে বন্ধ। একটি পরিসংখ্যান মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে, যা ১৯৩০ সালের মহামন্দার চেয়েও বেশি। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ কোটি মানুষ বেকারত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে হ্রাস পেয়েছে দেশের তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের রপ্তানি বাণিজ্য। তথ্য মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত এপ্রিল মাসে রপ্তানি শতকরা ৮৭ ভাগ এবং আমদানি শতকরা ২২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মতো। করোনার প্রভাবে ২০১৯ সালের মার্চ মাসের তুলনায় প্রবাসীরা ২০২০ সালের মার্চ মাসে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩.৩৪ শতাংশের কম। লকডাউনের ফলে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষ আজ কর্মহীন ও গৃহবন্দি। দেশের ধনী ও সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া সবাই ভীষণ উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার আপৎকালীন সাহায্য হিসেবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রায় ৭৩ হাজার মেট্রিক টন চাল গরিব ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করেছে। মোট প্রণোদনার পাঁচ হাজার কোটি টাকা সরকার কৃষি খাতে বরাদ্দ করেছে। কিন্তু সমাজে নিঃশব্দে ওত পেতে থাকা অসাধু স্বার্থান্বেষী মানুষের জন্যই আমাদের যত ভয়। ছেলেবেলায় রূপকথার গল্পে পড়তাম, রাক্ষস বধ অভিযানে আসা রাজকুমারের গায়ের গন্ধ পেয়ে রাক্ষসরা ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ মানুষের গন্ধ পাঁউ’ বলে ছুটে আসত। এখন আর রাক্ষস নেই, আছে চতুর, অনৈতিক ও ভয়ংকর স্বভাবের কিছু মানুষ, যারা সরকারি টাকার গন্ধ পেলেই বলে উঠে ‘হাঁউ মাঁউ খাঁউ টাকার গন্ধ পাঁউ’। অর্থনীতি সচল রাখতে প্রণোদনার টাকার স্বচ্ছ ও সঠিক স্থানে বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রুগ্ণ শিল্প বাঁচবে না। শিল্প না বাঁচলে কর্মহীন মানুষ বাড়বে। প্রান্তিক কৃষকরা নিরীহ ও সরল। দাপ্তরিক নিয়ম-কানুন বা জটিলতা অতিক্রম করে দালালচক্র ছাড়া কৃষি প্রণোদনাটি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গরু মোটাতাজাকরণের অনেক ঋণ এমন ব্যক্তি পেয়েছে, যারা কখনো গরু মোটাতাজাকরণের সঙ্গে জড়িত ছিল না।

সম্প্রতি একটি দৈনিকের খবরের শিরোনাম ‘করোনায় লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের দেশে ফেরার শঙ্কায় সরকার।’ এ অবস্থায় সরকারকে বিকল্প শ্রমবাজারের খোঁজ এখনই শুরু করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আফ্রিকা মহাদেশের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। সাধারণত আমাদের দেশের মানুষের কাছে আফ্রিকা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বহুজাতিক কম্পানিগুলো আফ্রিকায়ই তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খনিজসম্পদ কুক্ষিগত করতে ও কাঠের ব্যবসা ধরে রাখার জন্য ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো আইভরিকোস্ট ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রেখেছে। এই ডামাডোলের মধ্যে পশ্চিমারা যথেচ্ছ প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করছে সেখান থেকে। মানবস্বল্পতার কারণে আফ্রিকার দেশগুলোতে এখনো প্রাকৃতিক সম্পদ অফুরন্ত। সেখানকার অনেক দেশের অর্থনীতি আমাদের চেয়ে ঢের বেশি সমৃদ্ধ। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এই দুর্যোগকালে আফ্রিকায় শ্রমবাজার খোঁজা দরকার। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী আফ্রিকার ইকুয়েটরিয়াল গিনি, সিশেলস, মরিশাস, গ্যাবন, বতসোয়ানা, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় যথাক্রমে ৩৪ হাজার ৮৬৫, ২৮ হাজার ৭১২, ২১ হাজার ৬২৮, ১৯ হাজার ২৬৬, ১৮ হাজার ১৪৬, ১৫ হাজার ১৫০ আমেরিকান ডলার। এমন দেশগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের মাধ্যমে দেশের জন্য নতুন শ্রমবাজার ও ব্যবসাক্ষেত্র তৈরি করা যায়। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিবেচনায় ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। আফ্রিকার অনেক দেশই বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ওপরে অবস্থান করছে। সুতরাং সেই দেশগুলোতে নির্বিঘ্নে ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। ভারতীয়রা অনেক আগেই আফ্রিকার অর্থনৈতিক সুযোগগুলো ব্যবহার করেছে। একটি পরিসংখ্যান মতে, প্রায় ৩০ লাখ ভারতীয় আফ্রিকায় বসবাস করে, যাদের বেশির ভাগই ধনী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। পরিসংখ্যান মতে, ২০১৯ সালে ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

বিধ্বস্ত অর্থনীতিতে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে মেগাপ্রকল্প গ্রহণ না করে দক্ষ প্রগ্রামার তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। দেশে যে আইসিটি গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে তার বেশির ভাগই প্রগ্রামিংয়ে পারদর্শী নয়। যে দু-চারটি বহুজাতিক কম্পানি আমাদের দেশে আছে তাদের ৫০০ থেকে এক হাজার প্রগ্রামার জোগান দিতেই আমরা গলদঘর্ম। কিন্তু আমরা বছরে তৈরি করছি প্রায় ১৫ থেকে ৩০ হাজার কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট। তাহলে বেশির ভাগ গ্র্যাজুয়েট কেন ভালো প্রগ্রামার হিসেবে গড়ে উঠছে না? এর কারণ উদ্ঘাটন করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে আমাদের এই দুর্বল গ্র্যাজুয়েটদের ছয় মাসের মধ্যে বিশ্বমানের প্রগ্রামারে পরিণত করা সম্ভব। দুর্যোগের এই সময়ে দেশের চাহিদা পূরণে দেশি কম্পানিগুলো সফটওয়্যার ডেভেলপ করতে পারে। এতে দুই দিক রক্ষা পাবে। প্রথমত, সফটওয়্যার তৈরিতে দেশি জনবল ও প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি সফটওয়্যার কেনার নামে অর্থ নয়ছয়ের সিন্ডিকেট ব্যাহত হবে।

অর্থনীতি বাঁচাতে প্রণোদনা ও প্রকল্পের টাকার নীরব অপচয় বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে আইনের ফাঁকফোকর, যাতে সরকারি ও ব্যাংকের টাকা তছরুপকারীদের বিরুদ্ধে তত্ক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা যায়। বৈদেশিক বাণিজ্য ও শ্রমবাজার অন্বেষণে অন্যান্য দেশ ও জাতির অভিজ্ঞতা অনুসরণ করতে হবে এবং প্রয়োজনবোধে সরকারি উদ্যোগে শ্রম ও ব্যবসাক্ষেত্র খুঁজতে নিয়োগ করতে হবে বিশেষ থিংক ট্যাংক।

 

লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা