kalerkantho

শনিবার । ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৫ আগস্ট ২০২০ । ২৪ জিলহজ ১৪৪১

সাদাকালো

এসব জনপ্রতিনিধি লইয়া কী করিব?

আহমদ রফিক

৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এসব জনপ্রতিনিধি লইয়া কী করিব?

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয় তার শিরোনামের গুণগত তাৎপর্য বিধানে এবং সে অনুযায়ী রচিত গণতন্ত্রী সংবিধানের নির্ধারিত ধারায়। মোটা দাগে এর চরিত্র দ্বিমাত্রিক। একদিকে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত বিধি-বিধানের তৎপরতায় এবং তা সর্বোচ্চ স্তর জাতীয় সংসদ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রসারিত ইউনিয়ন পরিষদ নামক জনপ্রতিনিধিদের কর্মনিষ্ঠায়।

এঁরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত—আপদে-বিপদে, দুর্যোগে-দুর্ভোগে জনগণের প্রতি সহায়তাদানে, তাদের নিরাপত্তা রক্ষায় এবং জীবনযাপনের নিশ্চয়তার রক্ষক হিসেবে। জনগণের যুক্তিসংগত ইচ্ছাপূরণেও তাঁদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। সেই সঙ্গে সর্বপ্রকার নাগরিক অধিকার রক্ষারও। তা ছাড়া স্বাধীন বিচার বিভাগ, যা পীড়িতের শেষ আশ্রয়, ভরসাস্থল।

অন্যদিকে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত কর্মকর্তারা তাঁদের সর্বকর্মে সহায়ক শক্তি। এখানে সর্বোচ্চ প্রয়োজন এ দুই ধারার সমন্বিত কর্মধারা, যা সুশাসনের পূর্বশর্ত। একে অন্যের তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক পরিপূরক শক্তি—শেষোক্তদের অবাঞ্ছিত ভাষ্যেই আমলাতন্ত্র নামে অভিহিত করা হয়। যদি প্রশ্ন ওঠে, এ দুইয়ের মধ্যে কে অধিক শক্তিমান—এ অপ্রিয় প্রশ্নের জবাবে বলা যেতে পারে মৌলিক বিচারে প্রথমোক্ত জনপ্রতিনিধিরা; কিন্তু কর্মের ও লক্ষ্যের অর্জনে আমলাতন্ত্রের শক্তিতেই প্রথমোক্তের শক্তি। ব্যর্থতার দায় উভয়েরই।

বিশ্বের সর্বত্র অর্থাৎ সব দেশেই সমাজে-রাষ্ট্রে দুর্নীতি উন্নতি ও উন্নয়নের, নীতি ও নৈতিকতার সবচেয়ে বড় শক্তিমান শত্রু। কথাটা কর্মক্ষেত্রে পূর্বোক্ত দুই ধারার ক্ষেত্রেই সমপরিমাণে সত্যি। এর গ্রাসে সামাজিক-রাষ্ট্রিক উন্নয়নের বিনাশ। কথাটা বহুল প্রচলিত। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই বিনাশ ঘটায় না; সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার মূল্যবোধেরও বিনাশ ঘটায়।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ও প্রতিকারে ওপরে উল্লিখিত দুই ধারাই নীতিগত শপথে অঙ্গীকৃত, কিন্তু বাস্তবে তার কতটা রক্ষিত বা রূপায়িত হয় তা বলা কঠিন। কয়েক শতাব্দীর নীতিগত শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত উন্নত দেশগুলো এদিক থেকে খুব বেশি প্রশ্নবিদ্ধ না হলেও উপনিবেশ থেকে মুক্ত তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর এদিক থেকে দুর্বলতা প্রবাদপ্রতিম এবং তা সর্ববিস্তারী। এর সামাজিক ও রাষ্ট্রিক চরিত্র সমভাবে দূষিত, কম আর বেশি। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশ।

দুই

ছোট্ট সিঙ্গল কলামের এবং ছোট হরফের, যদিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি খবর (বড় হরফে ডাবল কলামে ছাপাই সঠিক হতো) পড়ে পূর্বোক্ত দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা, আলোচনার প্রেক্ষাপট হিসেবে। কেউ হয়তো মন্তব্য করতে পারেন, এতটা আয়োজনের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ দুর্নীতির নানামাত্রিক খবর তো দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হয়ে থাকে। এ আর নতুন কী?

এই তো একটি মোটা হরফের তিন কলামের খবর—যা রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টিকারী, আবার কারো মতে এ আর এমন কী ঘটনা। শিরোনাম : ‘কুয়েতি ঘটনার নায়ক এক এমপি সম্পর্কে : ‘মাফিয়া বসের মতো দৌরাত্ম্য পাপুলের’। এটা আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় নয়, তবে আনুষঙ্গিক ঘটনা তো বটেই। কারণ ঘটনাটি মানবপাচারের মতো ভয়ংকর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় পূর্বোক্ত প্রেক্ষাপটে কথিত রক্ষক নামক ভক্ষকের, করোনা নামক ভয়ংকর ভাইরাস সংক্রমণের জাতীয় দুর্যোগ-দুর্ভোগের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল ও বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতি জনপ্রতিনিধিদের। এবং তা প্রধানমন্ত্রীর বারবার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক যে এসবের মূলে তৃণমূল স্তরের জনপ্রতিনিধিরা।

বাংলাদেশে বৃহৎ ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেটের এবং অনুরূপ নানা স্তরের দুর্নীতির কথা আমরা জানি, যা বহুল আলোচিত, সংবাদপত্রে বহুল প্রকাশিত। নানা খাতের এসব শক্তিমান সিন্ডিকেটের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেক সময় সরকারের পক্ষেও সহজ হয়ে ওঠে না। ইতিপূর্বেকার একাধিক ঘটনা তার প্রমাণ। যেমন—চাল দুর্নীতি, বিশেষভাবে চাঞ্চল্যকর পেঁয়াজ দুর্নীতি, যা গোটা দেশে দীর্ঘ সময় ধরে আলোড়ন সৃষ্টি করে একসময় স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ব্যবসায়ীকুলের চিরাচরিত দুর্নীতি আর জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির মধ্যে গুণগত বিচারে অনেক তফাত, এর প্রেক্ষাপট ইতিপূর্বে আলোচিত। পাঠক ভাববেন না যে আমি ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি প্রকারান্তরে সমর্থন করছি; তা নয়। দুয়ের তফাতটাই তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য। রক্ষক যখন ভক্ষক হয়, তার পরিণাম সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়, তা ছোট-বড় যে স্তরেরই হোক। সে জন্যই দুশ্চিন্তা।

তিন

করোনা-দুর্যোগে আক্রান্ত নিম্নবর্গীয়দের কর্মহীনতার কারণে সৃষ্ট অনাহার থেকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের বিতরণলগ্ন থেকে আমরা লক্ষ করে আসছি দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত খবর : জনপ্রতিনিধির ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম, বিশেষভাবে দুর্নীতি ও বরখাস্ত, কখনো জেল-জরিমানা। আগেই বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তা ত্রাণ বিতরণে যেন দুর্নীতির তথা আত্মসাতের কালো ছায়া না পড়ে। কে শোনে কার কথা। এতদসত্ত্বেও জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি বন্ধ হয়নি।

প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি সময় ধরে করোনার দাপট চলছে। কর্মহীন নিম্নবর্গীয় মানুষ—বিভিন্ন স্তরের দিন শ্রমিক, খণ্ডকালীন গৃহকর্মী, পোশাককর্মী (যে জন্য কিছু পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে) এবং অনুরূপ শ্রেণির অনাহারী মানুষের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা। আর সেই ত্রাণ—চাল, ডাল, নুন, পেঁয়াজ ইত্যাদি যদি আত্মসাতের শিকার হয়, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক খবর আর কী হতে পারে?

কিন্তু তা করছে কারা? বিভিন্ন স্তরের, বিশেষভাবে তৃণমূল স্তরের জনপ্রতিনিধিরা। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর থেকে একাধিক স্তরের অনুরূপ জনপ্রতিনিধিরা। এ পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে উল্লিখিত খবরটির শিরোনামে আসা গেল : ‘করোনাকালে ত্রাণ আত্মসাৎ’/‘বরখাস্ত ১০০ জনপ্রতিনিধি’/‘গতকাল ১১ জন’। অর্থাৎ খবরের তাৎপর্য বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে : করোনা দুর্যোগেও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্নীতি চলছে, চলবে।

করোনাভাইরাস যেন জনগণের সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য দুর্নীতির বিরাট সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বরখাস্ত জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাটি দেখে একই সঙ্গে বিস্ময় ও বেদনা দুই-ই অনুভব করেছি। যাঁরা জনগণের সেবার জন্য জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতাসীন, সেই ক্ষমতার অপব্যবহারে তাঁরাই যদি জনসেবার বদলে জনগণের জন্য সরকারি বরাদ্দ ত্রাণসামগ্রী, বিশেষ করে জীবন রক্ষাকারী চাল আত্মসাৎ করে, তাহলে তাঁদের কী নামে অভিহিত করব?

জনপ্রতিনিধি, নাকি জনস্বার্থবিরোধী দুর্নীতিবাজ মুখোশ পরা মানুষ। এর আগেও খবরে পড়েছি, জনপ্রতিনিধিদের শত শত বস্তা চাল আত্মসাতের কথা—শাস্তি ওই পদ থেকে বরখাস্ত। বরখাস্ত তো তাঁর বা তাঁদের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ। এর পরও প্রশ্ন থেকে যায় এ কারণে যে এ শাস্তিতে তাঁরা দুষ্কর্ম-দুর্নীতি থেকে বিরত হচ্ছেন না।

বরখাস্ত হওয়ার পর দেশের সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে তাঁদের কৃতকর্মের জন্য দেশের আইন অনুযায়ী বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত নয় কি? এবং ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধিত্বের প্রার্থী হিসেবে প্রতিযোগিতা তথা নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারানো উচিত নয় কি? আমার তো মনে হয়, এজাতীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে তৃণমূল পর্যায়ে কথিত জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতি বন্ধ হবে না।

ওই সিঙ্গল কলাম ছোট খবরটিতে বলা হয়েছে : ‘প্রধানমন্ত্রীর অর্থ সহায়তাসহ চাল আত্মসাৎ ও বিতরণে অনিয়ম, সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগে... চেয়ারম্যানসহ ১০ ইউপি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে’। (কালের কণ্ঠ, ১৮ জুন ২০২০)। এর আগে এজাতীয় বেশ কিছু খবর দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।

আপাতদৃষ্টে করোনা পরিস্থিতি খুব তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হচ্ছে না, স্বভাবতই সরকার তরফে ত্রাণ বিতরণও সচল থাকবে এবং ওই সুযোগে দুর্নীতিপরায়ণ জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাও হয়তো বাড়তে থাকবে, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে। দুর্যোগে-দুর্ভোগেও যাঁদের এমন দুর্নীতি, স্বাভাবিক অবস্থায় তাঁদের মতিগতি কেমন ধারায় চলবে তা বলাই বাহুল্য। এঁরা সরকারের জনবান্ধব পরিকল্পনা ব্যর্থ করার জন্য একাই এক শ।

আমাদের ক্ষুব্ধ, ব্যথিত প্রশ্ন : এসব জনপ্রতিনিধি নিয়ে আমরা কী করব? কী জনসেবা সাধিত হবে এঁদের দিয়ে? আমি খবরটিতে গুরুত্ব দিচ্ছি এ কারণে যে জনপ্রতিনিধিবলয়ে দুর্নীতি গ্রামাঞ্চল তথা প্রান্তিক বাংলাদেশকেও দূষিত করছে, যা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর দুঃসংবাদ, বিশেষত রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট করার ক্ষেত্রে এবং সামাজিক নীতিবোধ নষ্ট করার ক্ষেত্রে।

অবস্থাদৃষ্টে সর্বোচ্চ প্রশাসনের প্রতি আমাদের আহ্বান—বর্তমান দুর্যোগে জনপ্রতিনিধিদের সর্বস্তরে শুদ্ধি অভিযান চালানো হোক, যাতে তাঁরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুর্নীতিমুক্ত ও কিছুটা মাত্রায় মানবিক হয়ে ওঠেন।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা