kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা বিশ্বাস

জয়ন্ত ঘোষাল

২৯ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা বিশ্বাস

একটা কথা আজকাল খুব মনে পড়ে। আমাদের মাস্টারমশাই সত্যব্রত চক্রবর্তী বলতেন, পৃথিবীর ইতিহাস যেন ঘড়ির একটা পেন্ডুলামের মতো। কখনো পেন্ডুলামটা বাঁ দিকে যায়, আবার কখনো ডান দিকে। কখনো রাষ্ট্র ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্র্যকে জোর দেয়, তখন সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। দেশের অভ্যন্তরীণ-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখন তার লক্ষ্য হয়। আবার কখনো কখনো পেন্ডুলাম অন্য দিকে যায়। সে হলো সমষ্টিবাদ বা  Collectivism-এর প্রবণতা।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো হয়েছে জাতি-রাষ্ট্রের বিকাশ, যাকে বলে Nation state. আবার কখনো কখনো জাতি-রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজের আধিপত্য কায়েম করে। যেমন—একদা হিটলার জার্মানির সম্প্রসারণ চেয়েছিলেন, যেমন একদা বিসমার্ক ইতালির ঐক্য সাধনে ব্রতী হন। সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন সাম্রাজ্য বিস্তারে সম্ভব হন। হিটলারকে পরাস্ত করে পূর্ব ইউরোপের ছোট দেশগুলোকে (আলবেনিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেকস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়াসহ) সোভিয়েত দেশের ছাতার তলায় আনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার ইয়েলতসিন থেকে গর্বাচেভের সময় কী হলো? তাসের ঘরের মতো লুটিয়ে পড়ল সোভিয়েত ইউনিয়ন। যাকে আমরা বলেছিলাম, বলকালাইজেশন। টুকরো টুকরো হয়ে গেল সোভিয়েত দেশ। আবার আজ এত বছর পর রাশিয়ায় সাবেক কেজিবি প্রধান পুতিন স্বপ্ন দেখছেন, রাশিয়াকে শক্তিশালী রাষ্ট্র কিভাবে করা যায়। মস্কো গিয়ে দেখেছি, সেখানে মানুষ পুতিনকে  Strong leader বলে মনে করে। কেননা পুতিন সে দেশে স্বপ্ন বিক্রি করছেন। সে স্বপ্নটা বৃহৎ রাশিয়া গঠনের স্বপ্ন। আবার রাশিয়া দুনিয়ার নানা ছোট ছোট দেশকে তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে—এমনটা ভাবছে সে দেশের মানুষ। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে পুতিনের সম্প্রসারণবাদ  (Expansionism) নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। বেশ কয়েকটা বইও প্রকাশিত হয়েছে। স্তালিনকে একদা মুছে ফেলার চেষ্টা হয়, যাকে বলা হয় বিস্তালীকরণ। আজ আবার স্তালিনকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু, একে বলা হয়  Restalinsation—স্তালিন মানে জাতীয়তাবাদী শক্তিশালী রাষ্ট্র আর শক্তিশালী নেতা।

এবার দেখা যাক, চীন কী করছে। শি চিনপিংও বেশ কয়েক বছর ধরে সার্বভৌম চীনের ঊর্ধ্বে উঠে গোটা পৃথিবীর মধ্যে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে চায়। যাকে বলা হয় ‘Central province of the world’. চীন তাই নিজেদের  ‘middle land’ বলত। হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১-১৯৭২ সালে এ কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, সাধারণত একটি দেশ তার নাম স্থানীয় জাতি, ভাষা বা ভৌগোলিক পরিচয় থেকে আহরণ করে, চীন তা না করে নিজেদের দেশকে পৃথিবীর   middle land আখ্যা দেয়। যেন চীন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে এক নিউক্লিয়াস। চীনের একটা অন্য রকম বৈশিষ্ট্য হলো স্থলপথে এ দেশের বিভিন্ন দিকে ১৪টি প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত। জলপথে উপকূলরেখা আছে ১৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। চীনের সবচেয়ে বড় রূপান্তর আজ এটাই যে ঘর থেকে বাইরে যেতে সক্রিয়। এটা যে আজ হঠাৎ শুরু করেছে এমন নয়। আফিম যুদ্ধ থেকে সাংস্কৃতিক বিপ্লব—১৪৮০ থেকে ১৯৬৯-এ এক সাংঘাতিক রূপান্তর। অনেকে বলেন, ত্রিমুখী রূপান্তরের ইতিহাস। প্রথমে সমাজতান্ত্রিক চীন থেকে আধা সামন্ততান্ত্রিক, আধা ঔপনিবেশিক, চীনে পরে সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে নয়া চীনে রূপান্তর। তৃতীয় স্তরে সমবায় ও গণকমিশন শিল্পের রাষ্ট্রীয়করণ এবং সর্বোপরি সাংস্কৃতিক। এসব আজ ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের গর্ভে জন্ম নিচ্ছে আরেক চীন। সেদিনের চীন আর আজকের চীনেও আছে আন্ত সম্পর্ক।

ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু হলো বাংলাদেশ। বরং আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে আজ নয়, অতীতের ভোটের সময়ও ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। খালেদা জিয়ার বিএনপি এবং জামায়াতের এক বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার হলো ভারতবিরোধিতা। চীন কিন্তু এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেও বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সম্প্রতি ঢাকা সফরের জন্য ও নানা বেসরকারি ট্র্যাক-ট্যুর মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছেন। এখনো বাংলাদেশ সরকার ইমরানকে কোনো সবুজসংকেত দেয়নি। আর চীন? তারা তো পদ্মা সেতুর জন্য নানা ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থা পাঠিয়ে অর্থ বিনিয়োগ এবং নির্মাণে সক্রিয় হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সখ্য রচনার বার্তা এরই মধ্যে দিয়েছে। পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে অতীতে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও এই সেতুর নির্মাণ নিয়ে ঢাকা সরকারের অনেক মতপার্থক্য হয়। শেষ পর্যন্ত এই সেতুটি নির্মাণ হওয়াটা শেখ হাসিনার জন্য বিশেষ জরুরি ছিল। পদ্মা সেতু না থাকায় মানুষের অসুবিধাটা সে দেশে কতটা তা কিন্তু আমি নিজে ওখানে গিয়ে বুঝে এসেছি। তাই চীনা ইঞ্জিনিয়ারদের কাজে লাগিয়ে পদ্মা সেতুটি দ্রুত নির্মাণ করাটা ছিল আসল। মালয়েশিয়ার মতো অন্য কোনো দেশকে দিয়ে না করে চীনা প্রযুক্তির সাহায্যে সার্বভৌম বাংলাদেশ যে নিজেই এ কাজটা সেরে ফেলতে চাইছে, সে তো খুবই খুশির কথা। শুধু তো বাংলাদেশ নয়, চীন নেপালের সঙ্গে সুসম্পর্ককে কতটা সুদৃঢ় করে তা তো নেপালের সংসদে মানচিত্র সংশোধনের আইন পাস করানো নিয়েই বোঝা গেল। নেপাল আজ আর হিন্দু রাষ্ট্র নয়। সংবিধান অনুসারে নেপাল আজ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এক জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তবে আজও এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হলো হিন্দু। কমিউনিস্ট নেতা প্রচন্ড ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের ওপর সহযোগী হিসেবে চাপ সৃষ্টি করেন। কেন দ্রুত এই মানচিত্রকে গ্রহণ করা হচ্ছে না। নেপালের প্রধানমন্ত্রী এখন অসুস্থ কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যমে গুজব এই প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী আজ চীনের বিশেষ ঘনিষ্ঠ। প্রয়াত রাজা জ্ঞানেন্দ্রও অতীতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করতেন। এমন বহু রিপোর্ট ভারত সরকারের কাছে আসত, ভারত সেদিনও নেপালের রাজা ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। আজও ভারতের রণকৌশল তাই। রাজনাথ সিং কৈলাস মানস সরোবরে যাওয়ার সড়ক নির্মাণ করে নেপালের হাইওয়েতে বিশেষ সড়ক উদ্বোধন অনুষ্ঠান করায়ও নেপালের বহু সংসদ সদস্য তীব্র সমালোচনা করেন। এখন তো বিহার-নেপাল সীমান্তে এক নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে নদীর জল ছাড়া নিয়ে। নেপাল প্রতিবছর করে, এ বছরও তাদের নদীর জল ছাড়ায় বিহারের বেশ কিছু এলাকা ভেসে গেছে। অবিলম্বে বাঁধ নির্মাণ খুব জরুরি। ভারত এ বিষয়টি নিয়ে সংঘাতের পথে যাচ্ছে না। মিয়ানমার সীমান্তে ও চীন পরিকাঠামো নির্মাণেও সে দেশ সরকারকে নানাভাবে সাহায্য করছে। শ্রীলঙ্কা থেকে ভুটান সর্বত্র চীনের ছায়া। ডোকলাম কাণ্ডটাও ভুটানের জমিতে হয়েছিল, এ কথা ভুললে চলবে না।

One Belt One Road বা  OBOR হলো চীনের সাম্প্রতিকতম প্রকল্প। এই সড়ক নির্মাণ হলে চীন এশিয়া তো বটেই; আফ্রিকা, ইউরোপ এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গেও যুক্ত হবে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে এর ফলে চীন এগোবে। প্রকল্পটির বাজেট ৯০০ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন ডলার চীন এরই মধ্যে বিনিয়োগ করে ফেলেছে। ভারত এই উদ্যোগে শামিল হয়নি। চীন আমন্ত্রণ জানালে মন্ত্রী তো দূরের কথা, কোনো আমলাকে পর্যন্ত পাঠায়নি। ২০১৩ সালে চীন এই উদ্যোগ শুরু করে। অনেকে এটাকে ‘নিউ সিল্ক রোড’ বলছে। ২০১৫ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব জয়শংকর (আজ তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বলেছিলেন, এই প্রকল্পটি চীনের জাতীয় প্রকল্প। আন্তর্জাতিক প্রকল্প নয়। যদি আন্তর্জাতিক প্রকল্প হতো, তবে চীন সব রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলে করত। এটা যখন জাতীয় প্রকল্প তখন অন্য রাষ্ট্রের এতে শামিল হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

ভারতে চীনের বিদেশি বিনিয়োগ খুব বেশি, যা ক্রমে কমছে। চীন জানে তাতে তাদের লোকসান। পাকিস্তানে এই বিনিয়োগ ২০১৪-১৫ সাল থেকে অনেক বেড়েছে। ঠিক যে সময়টা থেকে ভারতের ক্ষেত্রে তা কমেছে। বাংলাদেশে এই বিনিয়োগে এখনো কোনো উত্থানও নেই, পতনও নেই। লেখাচিত্রে এটি একটি আনুভূমিক রেখার মতো। শুধু পাকিস্তান নয়, চীন বাংলাদেশকে মিয়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাকে বলেছে যে এই প্রকল্পে রাজি হলে এসব দেশে আর্থিক বিনিয়োগ বাড়বে। ভারত মহাসাগরকে ব্যবহার করে চীন এটা করলে ভারত এটা মনে করছে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য মার খেয়ে যাবে। ভারত উল্টে ট্রান্স হিমালয়ান ইকোনমিক জোন অব কো-অপারেশনের প্রস্তাব দিয়েছে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে। এটা  OBOR-এর সম্প্রসারণ হবে।

এ ছাড়া কলকাতা থেকে চীনের ইউনান প্রদেশের লিংক স্থাপনে রাজি ভারত তাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গেও ব্যবসা হতে পারে। ভারত বলছে, চীনের উদ্যোগে ভারতে সড়ক ঢুকবে পাকিস্তানের সেই অংশ দিয়ে, যা নিয়ে ভারত-পাক বির্তক। চীন অবশ্য বিবৃতি দিয়ে বলেছে,

 OBOR-এর জন্য ভারত-পাক বিবাদের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে চীন ঢুকবে না।

২০১৭ সালে চীনে ১৯তম পার্টি কংগ্রেসে শি চিনপিং এক নতুন চীনের পথ নির্দেশিকা তৈরি করে।

OBOR এবং অন্য দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করে চীনের আর্থিক সম্প্রসারণবাদ আসলে চীনের এই আক্রমণাত্মক বিশ্বনীতি দেখে ভারত প্রমাদ গুনছে। কারণ একটাই, ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা বিশ্বাস। ডোকলামের পর লাদাখ এই ধারাবাহিক  The China Syndrome কিভাবে সম্পর্কের এ অস্বস্তি ঘোচাবে?

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা