kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

ক্রান্তিকালে অপরাধ প্রবণতা

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

২৯ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্রান্তিকালে অপরাধ প্রবণতা

বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ সংক্রমণের ভয়াবহ বিস্তার এবং নির্দয় প্রাণসংহারের করুণ দৃশ্যপট মানবসভ্যতাকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় দুর্যোগ কোনো জাতি-রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হয়নি। একদিকে সংক্রমণ প্রতিরোধে গৃহবন্দি হওয়া বা অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবন নির্বাহের কঠোরতা, অন্যদিকে জীবিকার অন্বেষণে কর্মস্থলে যোগদান বা দৈনন্দিন অর্থ উপার্জনে জীবনঝুঁকির নির্মম বাস্তবতা। জীবন-জীবিকার ক্ষুভিত বিরোধ এবং যৌক্তিক সমন্বয় প্রতিপালনে প্রত্যেক মানুষ অতিশয় ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত।

মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের নবতর উন্মেষ সৌহার্দ-সম্প্রীতি-মমতা-শ্রদ্ধা-ভালোবাসার নান্দনিক মনস্তাত্ত্বিক সম্মোহনবলয় তৈরির  যে আশার সঞ্চারণ করেছিল, সামগ্রিক অবস্থার পর্যবেক্ষণে এর প্রায়োগিক সুফল অর্জন সুদূরপরাহত বলেই মনে হচ্ছে। সংক্রমণ পরীক্ষা এবং জীবননিধন প্রতিবন্ধকতায় টিকা-প্রতিষেধকসহ অন্যান্য উপকরণ আবিষ্কারে গৃহীত গবেষণা প্রকল্পের ফলাফলের পূর্ণাহুতির পূর্বাভাস জনগণ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম-কিশোর-শিশুদের জীবন রক্ষায় কতটুকু প্রযোজ্য হবে; তা শুধু ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কর্মকৌশলের পরিসর বিস্তৃত হলেও দীর্ঘ সময় লকডাউন-ঘরবন্দি-কর্মচ্যুতি-শিক্ষাশূন্যতা বা ক্যারিয়ার গঠনে দুর্বিষহ স্বপ্ন ব্যতীত আলোকিত কোনো সুড়ঙ্গের সন্ধান এখনো নির্দিষ্ট করা যাচ্ছে না।

এভাবেই সৃষ্ট শারীরিক ভীতির সঙ্গে অত্যধিক ভয়ংকর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে তেমন কোনো চিন্তাভাবনা বা প্রতিকার পন্থা উদ্ভাবনে গুরুত্ব-বিবেচনা প্রতীয়মান নয়। দীর্ঘ সময় পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কহীনতা, বিনোদন দূরত্ব, ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্বসহ কর্মসংস্থানের সংকুচিত ক্ষেত্র, প্রবাসীদের দেশে ফেরা বা বৈদেশিক স্থানান্তর সংকট, বৈধ বা অবৈধ বসবাস ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ চরম এক ধূসর পাণ্ডুলিপি বিরচিত করে চলেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী করোনাকালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯০০। প্রাপ্ত বয়স্ক অপরাধীর যোগসূত্র থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তরুণ ও কিশোর অপরাধীদের সমাজবিরাধী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার পরিসংখ্যানই বেশি। সাধারণত অপরাধ দমন বা সংশোধনে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, প্রতিবেশ-ভৌগোলিক পরিবেশ, বংশগত আচরণের প্রকৃতি ও প্রভাব, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-বিনোদন সংশ্লিষ্ট কার্যকারণের প্রতিফলন দৃশ্যমান। করোনাকালে সংগত কারণে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার,  টেন্ডার-নিয়োগ-মাদক-দখল বাণিজ্য ইত্যাদির প্রভাব অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীরা ঘর-জেলবন্দি অবস্থায় এমনকি বিদেশ থেকেও শিষ্যদের দিয়ে অপরাধজগেক করে রেখেছে সক্রিয়।

ফ্রয়েড মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন প্রক্রিয়ায়—ইদম, অহম ও অধিসত্তার শক্তিমানতা সবচেয়ে বেশি কার্যকর প্রপঞ্চ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ব্যক্তিত্বের তিনটি মৌলিক প্রবৃত্তির বিপরীতে যথারীতি কার্যকারিতা নিরূপণ নীতিও প্রণিধানযোগ্য। সুখনীতি-বাস্তবতানীতি-আদর্শনীতির ভিত্তিতেই মানুষের বেড়ে উঠার সামগ্রিক পরিক্রমায় প্রচলিত কৃষ্টি-ঐতিহ্য, মূল্যবোধ-সততা-নৈতিকতার অনুশীলন ব্যাহত হলে মানুষ অপরাধ বা  যেকোনো সমাজ আইনবিরোধী কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিককালে তথ্য-প্রযুক্তির নিষিক্ত উৎকর্ষ এর যথার্থ ব্যবহারে যেমন সামাজিক উন্নয়নকে উঁচুমাত্রিকতায় পৌঁছানোর সুযোগ করে দিয়েছে, এর অপব্যবহারও ততোধিক মনন-সৃজনশীল সব অর্জনকে ভূলুণ্ঠিত বা বিনষ্ট করার বিশাল শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে।

অত্যধিক সহজে প্রাপ্ত সামাজিক যোগাযোগ, ফেসবুক, বিকৃত বিনোদন বা কামতাড়িত অপকর্মে জড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রকে করেছে অবারিত। উন্নত বিশ্বে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য প্রত্যাশা-প্রাপ্তির মেলবন্ধন নানা বিনোদন-বন্ধুত্ব অন্য উপায়ে প্রচার বা অপপ্রচারের মাধ্যমে এসব নিবৃত করার সহজলভ্য গ্রহণযোগ্য উপাদান সর্বত্রই স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের মতো অনুন্নত দেশে অশিক্ষা-কুশিক্ষা-অর্ধশিক্ষা-ধর্মান্ধতা-অপসংস্কৃতির কুৎসিত বাতাবরণে লিঙ্গভেদে তরুণ-কিশোর অসামাজিক কার্যক্রম-মাদকসেবন বা অপ্রকৃতিস্থ অপরাধ প্রবণতায় অত্যন্ত সহজেই সম্পৃক্ত হচ্ছে। কিছু কিছু সম্প্রচারমাধ্যমে প্রদর্শিত ছবি, বিনোদন চিত্র বা উত্তেজক দৃশ্য এই কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের কৌতূহল বা আকর্ষণ বৃদ্ধিকল্পে প্রচণ্ড নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে।

করোনাভাইরাসের বিদঘুটে চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত প্রায় সব ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এত বেশি প্রচার করা হচ্ছে, তা অপপ্রচারে পরিণত হয়ে এসব তরুণ-কিশোরের মাঝে ট্রমা-ভীতি-হতাশা-ঘৃণা-ক্ষোভ সৃষ্টি করে এদের অন্য পথে ধাবিত করার বিষয়ে নৈর্ব্যত্তিক বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা-পর্যবেক্ষণ-নমুনা অধ্যয়ন-পরীক্ষণ-নিরীক্ষণ অতীব অনিবার্য হয়ে পড়েছে। জরুরিভিত্তিতে মনো-সমাজবিজ্ঞানী, চিকিৎসক বা এসব পেশায় নিয়োজিত বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ-যোগ্য  ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন এবং মনস্তাত্ত্বিক  প্রেষণা-মনোবল বৃদ্ধি-হতাশা ও যন্ত্রণামুক্ত হওয়ার কর্মকৌশল ও সৃজনশীল পরিপত্র প্রস্তুতকরণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে এসব অপরাধের মাত্রা ও পরিধি দ্রুত প্রসারমাণ করোনাকালে কী ভয়ংকররূপ নিতে পারে, তা সহজে অনুমেয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে অদূরভবিষ্যতে সমাজের স্বাভাবিক পরিবেশ-পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা