kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

বৈশ্বিক সংকট উদ্ধার পরিকল্পনা কোথায়?

অনলাইন থেকে

২৮ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯-এর ছোবল থেকে রেহাই পায়নি কোনো দেশই। তবে এর তীব্র প্রভাব বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোতেই বেশি। এসব দেশে চরম দারিদ্র্য বাড়ছে এবং ভাইরাসটি মোকাবেলায় তাদের স্বল্প তহবিলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একেবারেই অপ্রস্তুত। এর মধ্যেই আফ্রিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সহস্রাব্দের শুরুতে উন্নতি শুরু হয়েছিল, তার উল্টো যাত্রা শুরু হয়েছে।

এ অবস্থায় কী করতে হবে সে সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যথেষ্ট সচেতন। শতাধিক দেশ এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা চেয়েছে। আইএমএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক বলছে, চলতি বছর উদীয়মান বাজার বা বিকাশমান অর্থনীতি ২.৫ শতাংশ সংকুচিত হবে। সামষ্টিকভাবে অর্থনীতির এই গুটিয়ে যাওয়ার ঘটনা গত ৬০ বছরে প্রথম। উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খেলোয়াড় জি২০ স্বীকার করে নিয়েছে যে কঠোর শর্তের উচ্চ হারের ঋণ স্বল্প আয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নকে অসম্ভব করে তুলবে।

বিস্তৃত এই মানবিক ট্র্যাজেডি মোকাবেলায় খুব সামান্যই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সহায়তার চাহিদা পূরণের জন্য আইএমএফ যে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার সহায়তার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, তা তেমন কিছু না। গত এপ্রিলে ঋণ অব্যাহতির বিষয়ে একটি চুক্তিতে সংশ্লিষ্টদের একমত দেখা গেছে; কিন্তু এর বাইরে থেকে গেল চীন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। জি২০-এর তো আগামী নভেম্বরের আগে কোনো বৈঠকে বসারই পরিকল্পনা নেই। গর্ডন ব্রাউন একসময় জি২০-কে ‘বিনা ছুটিতে অনুপস্থিত’ বলে খোঁচা দিয়েছিলেন, এখন যেন সেটিই বাস্তব হয়ে উঠেছে।

একজন অংশীজন হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্রাউন যে সমালোচনা করেছিলেন, বাস্তবতা ছিল আরো তীব্র। এর ফলে ২০০৮ সালে যৌথভাবে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংককে অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

আজকের দিনের অবস্থা আরো অনেক শোচনীয়। বৈশ্বিক মহামারি নতুন কিছু নয়, বৈশ্বিক মহামন্দাও নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমান সংকটের আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং যা খুবই ভয়াবহ, তা হলো আধুনিক যুগে মহামারি ও মহামন্দা কখনোই একযোগে ঘটেনি। ২০০৮ সালে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর ঋণের স্তর ছিল অপেক্ষাকৃত কম এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। পরবর্তীকালে চীনের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সব পণ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি করে। সর্বোপরি তখন সহযোগিতারও সদিচ্ছা ছিল।

২০০৯ সালের জি২০-এর লন্ডন সম্মেলনকে এখন ১৯৪০ সালে সৃষ্ট বহুমুখী ব্যবস্থার একটি শেষনিঃশ্বাস হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এটি আর উদ্দেশ্য পূরণের উপযুক্তও নয়। যদিও কঠিন এবং শেষ কথা বলার সময় হয়নি, তবে এ মুহূর্তে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

কভিড-১৯ মোকাবেলায় কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়গুলোর স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে রেকর্ড ঘাটতি পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা ছাপানো উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ভালো বিকল্প নয়। এটি উন্নত দেশগুলোর স্বীকার করে নেওয়া উচিত। ধনী দেশগুলো সর্বনিম্ন সুদহারে প্রচুর ঋণ নিতে পারে; কিন্তু দরিদ্র দেশগুলো তা পারবে না।

এ পরিস্থিতিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংককে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকায় নামতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। এ ভূমিকা পরিপূরণে তাদের যথাযথভাবে অর্থসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আইএমএফের অর্থ সংগ্রহের নিজস্ব পথ আছে, যা বিশেষ ড্রয়িং রাইট (নিজস্ব রিজার্ভের অধিকার) হিসেবে পরিচিত এবং তা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ‘হার্ড কারেন্সি’তে রূপান্তরিত হতে পারে, যদিও এসডিআরের নতুন বরাদ্দের ঘটনা কখনো খুব কমই ঘটে। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বিশ্বের ৭৬টি দরিদ্রতম দেশের জন্য বিশ্বব্যাংকেরও নিয়মিত ঋণ ও সহজ শর্তে ঋণ (সফট লোন) প্রদান এবং মঞ্জুরি উভয় কার্যক্রমকেই তিন গুণ বৃদ্ধি করতে হবে। আর প্রধান অংশীজনদের ঋণের নিশ্চয়তা দিয়ে এটি শুরু হতে পারে।

আগামী মাসে পালিত হচ্ছে গ্লেনেগল সম্মেলনের ১৫তম বার্ষিকী, যেখানে জি৮ দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ঋণ অব্যাহতি প্যাকেজ ও সহায়তা ঘোষণা করেছিল। তখন যুক্তি ছিল যে এটি ধনী দেশগুলো সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরি করে যে দরিদ্র দেশগুলোতে দেওয়া তাদের অর্থ সামাজিক বিনিয়োগে রূপান্তর করতে তারা বাধ্য থাকবে। আর ধনী দেশগুলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে যে ঋণ দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি তারা ঋণের সুদ প্রদানের জন্য অর্থ দিয়েছিল। ওই যুক্তিটিই আবার ফিরে এসেছে ২০২০ সালে, যা ২০০৫ সালের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যত দিন আছেন, এ সব কিছু ঘটা সহজ হবে না। তবে ওই সব উন্নত দেশ এখনো এমন একটি বহুমুখী পদ্ধতি তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে তারা এসডিআর বিষয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। আর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক, ঋণ অব্যাহতির বিষয়েও ধনী দেশগুলো অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০০৯ সালে গর্ডন ব্রাউনের কাছ থেকে যে নেতৃত্ব পাওয়া গিয়েছিল, সে রকম কিছু পাওয়া গেলে এখন তা সাদরে গৃহীত হবে।

 

মূল : দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা