kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

করোনা শেষের কৃষিভাবনা

ড. মো. আজিজ জিলানী চৌধুরী

২৮ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনা শেষের কৃষিভাবনা

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ জীবনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষ্টি এবং সংস্কৃতির ধারক ও বাহক আমাদের কৃষি। উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উপনীত। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ দেশের কৃষি জীবিকা নির্বাহের পর্যায় থেকে বাণিজ্যিক পর্যায়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল ক্ষুধামুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তোলা। কৃষি বিপ্লবের রূপকার হিসেবে তিনি তাঁর জাতীয় কর্মকাণ্ডে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সে ধারাকে অব্যাহত রাখতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নির্দেশনা ও মাননীয় কৃষিমন্ত্রীর দক্ষ ও প্রজ্ঞাময় নেতৃত্বে কৃষিসংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ আজ দানাশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ অনুযায়ী জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ এবং মোট জনশক্তির ৪০.৬ শতাংশ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। করোনার এই সংকটকালে অত্যন্ত আশার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার উৎপাদনের ফলে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন তিন কোটি ৬০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে এবং বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

২০২০-২১ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট হলো পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৮.৪৬ শতাংশ বেশি। এ বছরের বাজেটে কৃষিসংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয় মিলে কৃষি খাতে মোট বরাদ্দ হয়েছে ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ৫.৭৪ শতাংশ বেশি। এ বছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৪১ দশমিক ৮৩ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২.৭২ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকিসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৭ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫৪৩ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমির প্রেক্ষাপটে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কৃষির চ্যালেঞ্জ। কভিড-১৯-এর অভিঘাতসহ বিভিন্ন আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা, কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণে কৃষি মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কর্মপরিকল্পনা ২০২০ প্রণয়ন করেছে। করোনা সংকটকালে টেকসই উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, বিদ্যমান কৃষি পরিস্থিতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৃষিকে বিশেষভাবে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে সুপারিশমালা নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

১. কার্যকর ও দক্ষ কৃষি বিপণন ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে টেকসই সরবরাহ চেইন তৈরি, কৃষিপণ্যের বাজার উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে উৎসাহিত ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনায় কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন এবং ভ্যালু চেইনকে গুরুত্ব প্রদান করা প্রয়োজন। উৎপাদিত ফসলের যথাযথ সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে কৃষক সমিতি গড়ে তোলা এবং এর মাধ্যমে উৎপাদন মৌসুমে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করা। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে কৃষিপণ্য পরিবহনে ভর্তুকি এবং টোল ফ্রি পরিবহনব্যবস্থা প্রচলন, ট্রেনে কুল চেম্বার সংযোজন এবং কুল ভ্যান ব্যবহারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় হর্টেক্স ফাউন্ডেশন শক্তিশালীকরণপূর্বক কাজে লাগানো যেতে পারে।

২. কৃষি প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, স্বল্প জীবনকালীন শস্যজাত ও প্রযুক্তি প্রসারের মাধ্যমে শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ। বিশেষত দানাশস্য, শাকসবজি, ফলমূল, মসলা, ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। বায়োফর্টিফাইড ফসলসহ উচ্চ ফলনশীল জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২, ব্রি ধান৬৪, ব্রি ধান৭২, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮৪ ও প্রোটিনসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬৬ জাতগুলোর সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জিত হবে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে শস্য নিবিড়তা ১৭৯ শতাংশ ছিল, যা বর্তমানে ১৯৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

৩. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে লবণাক্ততা, খরা, ঠাণ্ডা ও রোগবালাই সহনশীল, জোয়ার-ভাটা উপযোগী ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং প্রসার ও স্বল্প জীবনকালীন শস্যজাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিস্তারের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় একাধিক ফসলের চাষ করা সম্ভব। জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও হাওর এলাকায় পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে কৃষিজমির আওতা সম্প্রসারণ ও একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি করে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

৪. ফসলের স্বল্প জীবনকালীন জাত আবাদের মাধ্যমে উৎপাদন, আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা সম্ভব। আউশ ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি ও আবাদের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি উচ্চ ফলনশীল নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো, যেমন—ব্রি ধান৮২, ব্রি ধান৮৩, ব্রি ধান৮৫ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৭-কে প্রাধান্য দেওয়া। অতিবৃষ্টি বা আগাম বন্যা মোকাবেলায় সরকারি উদ্যোগে উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে আউশের বীজতলার বাফার স্টক তৈরি করা। পাশাপাশি আসন্ন আমন ও বোরো মৌসুমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

৫. আধুনিক কৃষি গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিস্তারের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি আবশ্যক। লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক মৌলিক গবেষণায় বায়োটেক ও ন্যানোটেক গবেষণা জোরদার করা প্রয়োজন। গবেষণা, টেকসই প্রযুক্তি বিস্তার কৌশল, আর্থ-সামাজিক উপাদানসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ক গবেষণায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৬. ভূমি কর্ষণ, কীটনাশক প্রয়োগ এবং ফসল মাড়াই কার্যক্রমে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও রোপণ ও ফসল কর্তনে যান্ত্রিকীকরণে ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। পরিবেশবান্ধব এবং ছোট কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন ও ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে দেশীয় কারখানা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রামীণ পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।

৭. মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার করেই ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন লাভ করা যায়। মানসম্পন্ন অধিক বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের বীজ খামার এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালীকরণসহ বেসরকারি সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ফসলের হাইব্রিড বীজ উৎপাদন, বিপণন ও উন্নয়নে অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করা দরকার।

৮. ক্রপ জোনভিত্তিক উৎপাদনশীলতা যাচাই ও উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি করা। এ লক্ষ্যে জিআইএস ও রিমোট সেন্সিংয়ের সাহায্যে ভূমি ও মৃত্তিকা, আঞ্চলিক জলবায়ু, ভূ-প্রাকৃতিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা। এ ছাড়া উৎপাদন কার্যক্রমে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক, চাহিদা, সরবরাহ ও অন্য বিষয়গুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে ভূমি ব্যবহারের টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

৯. জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও রপ্তানির লক্ষ্যে কৃষি খাতে উত্তম কৃষিচর্চার যথাযথ প্রচলন ও অনুসরণপূর্বক নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিমিত সার, সেচ ও কীটনাশক ব্যবহার, ফসল ব্যবস্থাপনা, যথাযথ সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।

১০. কৃষিপণ্যের সহজলভ্যতা, সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি ও নিরাপদ রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণাগার, প্যাকেজিং হাউস ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও প্রক্রিয়াজাতকৃত ফলমূল ও শাকসবজি বিদেশে রপ্তানিতে উৎসাহিত করতে হবে।

১১. টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জন এবং কৃষি বাণিজ্যিকীকরণে উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি দ্রুত হস্তান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। অধিকতর দক্ষ ও কার্যকর সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নত যোগাযোগ পদ্ধতি, যেমন—কমিউনিটি রেডিও, স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, মোবাইল অ্যাপস ইত্যাদি ব্যবহারপূর্বক চাহিদামাফিক সম্প্রসারণ সেবা কার্যকরভাবে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।

১২. ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লী ঋণ কার্যক্রম জোরদার করে অব্যাহত কৃষি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। এরই মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের জন্য ৪ শতাংশ সুদে কৃষিঋণের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যা খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

১৩. কৃষিশিক্ষায় অত্যাধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, খাদ্য ও পুষ্টি, পরিবর্তিত জলবায়ু, অভিযোজন কৌশল ইত্যাদি বিষয়কে পাঠ্যতালিকায় প্রাধিকারভুক্তকরণ ও প্রিসিশন কৃষির প্রবর্তন ও উপকরণ ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ।

টেকসই কৃষি ব্যবস্থা তথা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিরবচ্ছিন্ন বিপণনে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তাই উৎসাহব্যঞ্জক কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন সময়ের দাবি। কৃষির আধুনিকায়ন, খামার যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি, প্রতিকূল প্রতিবেশ উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বিপণনব্যবস্থার উন্নয়ন, উপকরণ ও উৎপাদন সহায়তা, দোরগোড়ায় সম্প্রসারণ সেবা, ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি ইত্যাদি খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় সহায়ক হবে।

লেখক : সদস্য পরিচালক (শস্য)

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল

[email protected],

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা