kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

‘গরিবের ঘোড়ারোগ’ এবং ফুড ফর থট

আবদুল বায়েস

২৮ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘গরিবের ঘোড়ারোগ’ এবং ফুড ফর থট

গরিবের শখ এবং সাধ-আহ্লাদকে কেউ দেখে ‘গরিবের ঘোড়ারোগ’ হিসেবে। গরিবের আসল অভাব নাকি অন্নের; প্রান্তিক বস্ত্রেরও। খাবার জোগাড় করতে যারা হিমশিম খায়, নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায়, তাদের জন্য খাদ্য ছাড়া অন্য চিন্তা স্রেফ বিলাসিতা বৈ কিছু নয়। এবং এই বিলাসিতা একসময় তাদের বিলাপের কারণ হতে পারে। সুতরাং অর্থনীতিবিদ তথা সমাজবিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের মত হলো, গরিবের হাতে অর্থ হস্তান্তর মানে শুধু খাদ্য কেনায় খরচ হওয়া।

ইদানীং এই প্রতিপাদ্যের বিপরীতে অবস্থান জোরালো হচ্ছে এবং সাবুদ করতে গিয়ে কিছু কেস স্টাডি উপস্থাপন করা যেতে পারে।

ধরা যাক আসমা নামে মেয়েটির কথা। বাবা রিকশাচালক। অল্প বয়সে বিয়ে হয় তার, অল্প সময়ের মধ্যে কোলে বাচ্চা আসে এবং খুব তাড়াতাড়ি স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি। কতটুকু দরিদ্র হলে পরে একজন মানুষ নিজের দুই বছরের শিশুকে গ্রামে মায়ের কাছে ফেলে শহরে আসে অন্যের দুই বছরের শিশুকে দেখভাল করতে? আসমা প্রতিনিয়ত দেখে তার তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুটি ‘দামি’ বিস্কুট খায়; দামিদামি অন্যান্য জিনিসের কথা না-ই বা বলা হলো। একদিন আসমা বলেই ফেলে, “লকডাউনের পর বাড়ি গেলে আমার ছেলের জন্য ‘দামি’ বিস্কুট কিনা নিমু।”

মিসেস সেহরিনা আক্তারের কাজের বুয়ার স্বামী রিকশাচালক; তিনি উঁচু সুদে ধার করে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনেছেন। তাঁদের দুই সন্তান গ্রামে দাদি-নানির কাছে থাকে। সম্প্রতি কিস্তিতে ১৬ হাজার টাকায় একখান রঙিন টিভি কিনেছেন ‘অবসর সময়’ কাটানোর জন্য।

হুমায়ূন আহমেদের ‘বহুব্রীহি’ নাটকে দর্শক দেখতে পায় বাড়ির কাজের ছেলে শখের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে একটা পাওয়ারলেস চশমা কিনেছে। শুধু সেখানে শেষ নয়, তার চশমা ঘিরে চাপা হাসি বা টিপ্পনী থামাতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘গরিব বইলা কি আমাগো সাধ-আহ্লাদ বইলা কিছু নাই?’ আবার ‘চোর’ নাটকে চোরের মেয়ে তার ঘর ভরায় প্রিয় নায়কের পোস্টার দিয়ে; সে স্বপ্ন দেখে, কল্পনা করে নায়কের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। সিনেমা হলগুলোতে ফ্রন্ট স্টলে বসে যারা শিস বা সিটি দেয় কিংবা চিল্লায় তারা গরিব ঘর থেকে আসা—হয়তো কারো ঘরে তিন বেলা ভাতও জোটে না।

আর ওই গল্পটি তো বোধ করি সবার জানা। মাথায় ডিমের ঝুড়ি নিয়ে গরিব ঘরের মেয়েটি বাজারে যাচ্ছে আর ভাবছে ডিম বিক্রি করে মুরগি কিনবে, ছাগল কিনবে, তারপর গরু কিনবে, জমি কিনবে এবং আরো অনেক কষ্ট করে একদিন সে ধনী হবে। তখন চৌধুরীবাড়ির ছেলের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব এলে সে সজোরে ‘না’ করবে। ‘না’-এর সঙ্গে মাথা নাড়াতে গিয়ে অবশ্য ডিমের ঝুড়িটা মাটিতে পড়ে তার স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু তার যে স্বপ্ন তথা ঘোড়ারোগ একটা ছিল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

নোবেলজয়ী অভিজিৎ ভি. ব্যানার্জি ও এসথার ডাফলোর অভিজ্ঞতার কথা এবার শোনা যাক। মরক্কোর গহিন গ্রামের গরিব পরিবারটা বলছিল, তাদের যথেষ্ট খাবার নেই; কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখা গেল একটা উঁচু মানসম্পন্ন টেলিভিশন ঘরে শোভা পাচ্ছে; ডিভিডি প্লেয়ারও আছে।

অর্থনীতিবিদদ্বয় প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো পরিবারটা হুজুগে টিভি কিনে পরে আক্ষেপ করেছে। কিন্তু তাদের ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে জানান দেওয়া হলো, ‘টেলিভিশন খাদ্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্ববাহী।’

কী করে সম্ভব?

আসলে ওই গ্রামে দৈনন্দিন জীবনে একঘেয়েমি কাটানোর কিছুই নেই; এমনকি একটা চায়ের স্টল পর্যন্ত। এখন যেহেতু টিভি আছে, অতিরিক্ত অর্থসাহায্য পেলে পরিবারটা অবশ্যই পুরোটা খাদ্য ক্রয়ে খরচ করবে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, সরকার থেকে অতিরিক্ত অর্থ পেলে গরিব বেশির ভাগ খাদ্যে খরচ করে, তবে তা টিভির মতো শৌখিন দ্রব্য কেনার আগে বা পরেও হতে পারে।

মোট কথা, গরিব বলে আমোদ-প্রমোদের আকাঙ্ক্ষা থাকবে না, তা হয় না। ধনীর মতো জীবনকে কম একঘেয়েমি করাও গরিবের প্রায়োরিটির মধ্যে পড়ে—হতে পারে একটা টিভি অথবা দুধ-চিনিসহ এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটা সিগারেট বা বিড়ি। ভারতের উদয়পুরে চরম দরিদ্র গোষ্ঠী বাজেটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যয় করে উৎসবে। ইদানীং গরিব শ্রেণি খাদ্য খাতে কম ব্যয় করছে, মানে একমাত্র এই নয় যে তারা দরিদ্র হয়ে পড়েছে।

অভিজিৎ ও এসথার বলছেন, দারিদ্র্য দূরীকরণে কোনো ম্যাজিক বুলেট নেই; নেই এক ঘায়ে কুপোকাত করার নিয়ম। তবে কিভাবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যায় সে সম্পর্কিত আমরা নিশ্চিত কিছু জিনিস জানি।

এক. অনেক সময় তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে না এবং সত্য নয় এমন বিষয়ে তারা বিশ্বাস করে। যেমন—জানে না তাদের রাজনীতিবিদরা অফিসে বসে কী করছেন, জমিতে কতটুকু সার দিতে হবে, সংক্রমিত হওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ কোনটা। শিশুর টিকার উপকারিতা নিয়ে তারা নিশ্চিত নয়, তারা ভাবে প্রথম কয়েক বছর স্কুলে যা শেখানো হয় তার দাম কম। আবার যখন দেখে এত দিন শক্তভাবে ধরে রাখা বিশ্বাসগুলো ঠিক নয়, তখন যে সিদ্ধান্ত নেয় সেটা যে শুধুই ভুল তা নয়, ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনে, যথা—বয়স্ক একজন লোকের সঙ্গে এক বালিকার অরক্ষিত যৌনসংগম কিংবা দরকারের চেয়ে দ্বিগুণ সার ব্যবহার করা। আবার দরিদ্র যখন জানে, সে জানে না, সামনে পড়া অনিশ্চয়তা তখন খুব ক্ষতিকারক হয়ে ধরা দেয়।

সুতরাং অনেক সময় একটা ছোট তথ্যের প্রাপ্তি বড় ব্যবধান সৃষ্টি করতে পারে।

দুই. জীবনের বহু কিছুর দায়িত্ব নেয় দরিদ্র। সচ্ছলদের জন্য ‘সঠিক’ সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করে বলে শহরের সরকার পানিতে ক্লোরিন মেশায়, একই পানি দরিদ্রকে নিজে শোধন করতে হয়। তারা তৈরি করা পুষ্টিকর নাশতা কিনতে পারে না বলে নানা কসরত করতে হয়।

তিন. যথাযথ কারণে তাদের জন্য কিছু ‘বাজার’ হারিয়ে যায় অথবা ওই সব বাজারে দরিদ্র যে দাম পায় তা তাদের বিপক্ষে থাকে। যেমন—যদি আদৌ ব্যাংকে টাকা রাখে, নেগেটিভ সুদের হারের মুখোমুখি হয় অথচ ভাগ্যের লিখনে যখন ধার করতে হয়, তা ঘটে চড়া সুদে। স্বাস্থ্য ও বীমার বাজার তাদের জন্য বহু দূর-অস্ত্।

চার. দরিদ্র বলে অথবা ভাগ্যবিবর্জিত ইতিহাস আছে বলে দরিদ্র দেশ সফলতা পাবে না, এটা বলা যাবে না। বরং বলা উচিত যে দরিদ্রকে সাহায্য করার নিমিত্ত হাতগুলো যথাযথ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দারিদ্র্যের দুয়ার খুলে দেয়।

এমনি অনেক সমস্যার জালে আটক দরিদ্র। শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আরাম কেদারায় বসে নয়, দরিদ্রের কাছ থেকে জানতে হবে সে কী ভাবছে তা?

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা