kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

আন্দোলনের পথ ধরে মেধাবী ইস্যু

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আন্দোলনের পথ ধরে মেধাবী ইস্যু

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলিম লীগ নেতাদের ভারত বিভাগের ক্ষেত্রে ভূমিকা থাকলেও পাকিস্তান অর্জনের জন্য রাজপথের আন্দোলনে বাঙালির নেতৃত্বই ছিল প্রধান। ১৯৪৬ সালেই পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে কলকাতার রাজপথ মুখরিত করে বাঙালি ছাত্ররা। আর এর নেতৃত্বে ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের লড়াকু ছাত্রনেতা শেখ মুজিব। সুতরাং পাকিস্তান অর্জনের জন্য বাঙালি নেতৃত্বের সরাসরি অংশগ্রহণ ও পূর্ব বাংলার বাঙালির সমর্থন ইতিহাসেরই সত্য। তাই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান অর্জিত হলে বাঙালিরই সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা। হয়তো অল্প কিছু সময় বাঙালি এই আনন্দ অনুভবও করেছিল। এর পরই স্বাধীনতার কটুস্বাদ বাঙালিকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে।

বছর না ঘুরতেই বাঙালির ভুল ভাঙে। ভাই বলে বুকে জড়াতে চেয়েছিল যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের, তাদের প্রতারক চেহারা উন্মোচিত হয় ভাষা প্রশ্নে ওদের উদগ্র মনোভাব দেখে। পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষের মুখের ভাষা বাংলার অধিকারকে অস্বীকার করে পাকিস্তানের কোনো অংশের মৌলিক ভাষা নয় এমন এক বিজাতীয় উর্দু ভাষা রাষ্ট্রভাষারূপে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাঙালিকে অধিকারসচেতন করে তোলে।

পাকিস্তানি শাসনের প্রায় ২৪ বছরের কালপরিসর বাঙালি কাটিয়েছে অধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে বাঙালি কখনো অযৌক্তিক ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করেনি। বরং যুক্তিতে, অধিকারে প্রাপ্য হলেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বরাবরই সুযোগ দিয়েছে যৌক্তিক সমাধানের পথে যাওয়ার জন্য। লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাঙালির প্রতিটি আন্দোলনই ছিল যুক্তিপূর্ণ।

রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার দাবি অর্জন করে বাঙালি। তার পরও ১৯৫২ সালের পর দাপ্তরিকভাবে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অন্তর্ভুক্তিতে সময় লেগেছিল। তাই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করতে হয় বাঙালিকে। আর এই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের শুরুতে রাষ্ট্রভাষা ইস্যুটিকেই গুরুত্ব দিতে হয়।

নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাঙালির মন্ত্রিসভা গঠিত হলেও পাকিস্তানি নেতৃত্বের ষড়যন্ত্রে তা স্থায়ী হতে পারেনি। ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা পেলেও থেমে থাকেনি পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান তাঁর সামরিক শাসন শুরু করলে বাঙালির মধ্যে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। পাকিস্তানি শাসকরা সর্বক্ষেত্রে বাঙালির ওপর বৈষম্য চাপিয়ে দেয়। এই বৈষম্যের কথা উন্মোচিত হলে বাঙালির ক্ষোভ আন্দোলনে পরিণত হয়। এ সময়েই বাঙালির আন্দোলনে প্রধান নেতৃত্বে চলে আসেন শেখ মুজিবুর রহমান। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন চলতে থাকে। এরই মধ্যে বাঙালির স্বার্থবিরোধী শিক্ষানীতি চাপানোর অপচেষ্টা চালায় শাসকচক্র। ফলে ১৯৬২ সালে সংঘটিত হয় শিক্ষা আন্দোলন।

সংকট ঘনীভূত হয়। তীব্র হতে থাকে বাঙালির আন্দোলন। কিন্তু সুষ্ঠু সমাধানের পথে হাঁটতে চায়নি পাকিস্তানি শাসকচক্র। ফলে বাধ্য হয়েই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলতে হয়। এ দেশের ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ—সবাই অনুভব করেন সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন লাভ না করা পর্যন্ত নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে উত্থাপিত একটি নতুন কর্মসূচি অনুমোদন করে। বাঙালির অধিকার রক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিই ছয় দফা কর্মসূচি নামে পরিচিত। শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে বিরোধী দলের এক সম্মেলনে প্রথম ছয় দফা উত্থাপন করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির দাবিসংবলিত এই ছয় দফা প্রস্তাব ১৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান পেশ করেন। ছয় দফা ছিল প্রকারান্তরে স্বায়ত্তশাসন অর্জনেরই নামান্তর। অচিরেই ছয় দফা বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়।

ছয় দফা দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য মুক্তির সনদ। তাই এই দাবির প্রতি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল। দাবি আদায়ের জন্য তাই এ দেশের ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করেন। ছয় দফা দাবির জনপ্রিয়তায় সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং একে রাষ্ট্রদ্রোহী আন্দোলন বলে অপপ্রচার করতে থাকে। ক্রমে সরকার ছয় দফা আন্দোলন থামিয়ে দেওয়ার জন্য দমননীতি শুরু করে। ১৯৬৬ সালের ৮ মে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তারের সংবাদ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির মনে জাতীয়তাবাদী ধারণার জন্ম দিয়েছিল। ছয় দফা এসেছিল অগ্রবর্তী আন্দোলনগুলোর ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই। এর মধ্যে ছিল ভবিষ্যৎ স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। এসব কারণে ছয় দফার দাবি বাংলার ইতিহাসে পটপরিবর্তনকারী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য