kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

সেলাই করা খোলা মুখ

চরণ ছুঁতে দিও

মোফাজ্জল করিম

৬ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



চরণ ছুঁতে দিও

শিক্ষক, এক দিনের জন্য হলেও শিক্ষক শিক্ষকই। আর এঁরা সবাই তো প্রায় দুই বছর (১৯৫৮-৬০) আমার শিক্ষক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রজীবনের শুরু ১৯৫৮ সালে। আমার বিষয় ছিল ইংরেজি (অনার্স)। তখনকার দিনে অনার্সসহ বিএ ছিল তিন বছরের কোর্স। অনার্সের বিষয়ের সঙ্গে আরও দুটি আনুষঙ্গিক (প্রচলিত ইংরেজি নাম ছিল সাবসিডিয়ারি) বিষয়ের দুই বছরের একটি কোর্স করতে হতো। আমার দুটি সাবসিডিয়ারি বিষয়ের একটি ছিল বাংলা, অন্যটি ফিলসফি—দর্শনশাস্ত্র।

সেবার বাংলা সাবসিডিয়ারি ক্লাসে আমরা ছাত্রছাত্রী ছিলাম হাতে গোনা মাত্র ১২-১৪ জন। এদের মধ্যে যাদের নাম এখনো মনে আছে তারা হচ্ছে ইংরেজির (কবি) কাজী মুহাম্মদ মনজুরে মাওলা (সাবেক সিএসপি অফিসার ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে বিইউবিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির প্রফেসর মরহুম আবু তাহের মজুমদার, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইংরেজির মোশতাক আহমদ (রামু, কক্সবাজার), ইসলামের ইতিহাসের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, সরকারি মহিলা কলেজ, পটুয়াখালীর মোহাম্মদ আব্দুল কাদের, অর্থনীতির মরহুম আমিনুল ইসলাম ডলু (বিসিকের পদস্থ কর্মকর্তা), পরেশ (পদবি ও পুরো নাম মনে পড়ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।) ও লাস্ট বাট নেভার দ্য লিস্ট ইংরেজির মমতাজ জাহান বেগম (কবি ও সাবেক অধ্যাপিকা, সিদ্ধেশ্বরী মহিলা কলেজ এবং সিলেট মহিলা কলেজ। বর্তমান নাম মমতাজ জাহান করিম ও বিগত অর্ধশতাব্দীকালেরও বেশি সময় ধরে এই অধমের সহধর্মিণী)। প্রসঙ্গত, বন্ধুবর মাওলার কবিখ্যাতি সেই ছাত্রজীবনেই উভয় বঙ্গে ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ের।

বাংলা বিভাগের যেসব শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকা বিভিন্ন বিষয়ে তখন আমাদের পাঠদান করতেন তাঁরা হচ্ছেন : (জ্যেষ্ঠতানুসারে) শহীদ মুনীর চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম, আমিনুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান ও মনিরুজ্জামান। আরেকজন সনাতনধর্মী শিক্ষক ছিলেন, যাঁর নামটি আমার বা আমার স্ত্রীর এখন আর মনে নেই। এঁরা সবাই খুব ভালো পড়াতেন। এঁদেরই জনাকয়েকের সামান্য স্মৃতিতর্পণ করব এই স্বল্প পরিসরে। পরম পরিতাপের বিষয়, একমাত্র অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ব্যতীত আমার এই প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষিকা সকলেই আজ লোকান্তরিত। সর্বশেষ এই সেদিন চলে গেলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, যিনি ছিলেন জাতির বিবেকস্বরূপ।

২.

মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী সম্বন্ধে এদেশের মানুষ সকলেই মোটামুটি অবগত আছেন। এক শ্রেণির দেশপ্রেমের ঠিকাদার মতলববাজরা স্বাধীনতার পর সুযোগ পেলেই নানাভাবে তাঁকে অবমূল্যায়িত ও, তার চেয়েও দুঃখজনক, বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করার চেষ্টা চালাত। আজকাল এরা বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। একেবারে ময়দান ছেড়ে চলে গেছে মনে করার কারণ নেই। এদের কাজই হচ্ছে মানী লোকের চরিত্রহনন ও ফোকটে এঁর-ওঁর কাছ থেকে সুবিধাগ্রহণ। অথচ স্যারের মত একজন বিরল প্রতিভাধর দেশপ্রেমিক বাঙালিকে পাকিস্তানিরা ঠিকই চিনেছিল। আর চিনেছিল বলেই বিজয় দিবসের পূর্বলগ্নে তাঁকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে তাঁর চোখ-মুখ বাঁধা লাশ অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর লাশের সঙ্গে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে ফেলে রাখে।... জানি না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ‘আরেক অধ্যায়’ কবে লেখা হবে, কবে মুনীর চৌধুরী স্যারের মত আজীবন আপাদমস্তক বাঙালি চিন্তা-চেতনার একজন মানুষের সঠিক মূল্যায়ন হবে ইতিহাসের পাতায়। সেই ইতিহাস আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি তাদের পাঠ না করলেও চলবে, কিন্তু তাদের সংখ্যা তো প্রকৃতির নিয়মে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তারপর অচিরেই এমন একটা সময় আসবে, যখন বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী বাটি চালান দিয়েও পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তখন গেলানো হবে পরিবেশনকারী ‘সাকী’র পছন্দসই পানীয়, তা যত বিবমিষা উদ্রেককারী এবং প্রাণঘাতীই হোক।

মুনীর স্যার আমাদের ক্লাস নিয়েছিলেন মাত্র মাস দুয়েক। আসলে তিনি বাংলা বিভাগের একজন অন্যতম দক্ষ ও সুপণ্ডিত শিক্ষক হিসেবে কেবল অনার্স ও এমএ ক্লাসের ক্লাস নিতেন। আমাদের সাবসিডিয়ারি ক্লাস নিয়েছিলেন বোধ হয় ঠেকার কাজ চালাতে। তবে তাঁর সব ক্লাসেই ছাত্রছাত্রীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর বক্তৃতা শুনত। আমি ও আমার সহপাঠী কবিবন্ধু মনজুরে মাওলা তো সুযোগ পেলেই স্যারের বাংলা অনার্স ক্লাসের পেছনের বেঞ্চের কোনায় বসে চুপচাপ তাঁর বক্তৃতা গলাধঃকরণ করতাম। বিশেষ করে তুলনামূলক সাহিত্যের ওপর তাঁর আলোচনা। স্যার তো আবার শুধু বাংলা নয়, ইংরেজিতেও এমএ পাস করেছিলেন। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন জেলখানা থেকে পরীক্ষা দিয়ে। হ্যাঁ, জেলখানা থেকে। ভাষা আন্দোলনে তিনি ও তাঁর ছোট বোন, ইংরেজি বিভাগে আমাদের শিক্ষিকা, অতিশয় সুদর্শনা নাদেরা বেগম ম্যাডাম রীতিমত নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর ফলে দুই বছর (১৯৫২-৫৪) স্যারকে জেল খাটতে হয়েছিল।... বাঙালি কি সেসব কথা মনে রেখেছে? আমার তো মাঝে মাঝেই ধন্দ লাগে, আমাদের সকল সুকৃতি, সকল ত্যাগের ইতিহাসকে না কোনদিন আমরা স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে বিসর্জন দিই বিস্মরণের কৃষ্ণসাগর জলে। কী কারণে? না, কেবল ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির জন্যে।

৩.

আনিসুজ্জামান স্যার ও মনিরুজ্জামান স্যার দুইজনই ছিলেন বাংলা বিভাগের দুই নবীন শিক্ষক। তাঁদের পাঠদান পদ্ধতি ছিল খুবই আকর্ষণীয়। আনিস স্যারের লেকচারের একটা উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জুতসই ‘উইট’ ও ‘হিউমার’-এর প্রয়োগ। ফলে প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধসংগ্রহ কিংবা নজরুলের কবিতা যা-ই তিনি পড়াতেন তা হতো অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। আর আমাদের ১২-১৪ জন ছাত্রছাত্রীর ক্লাসে তাঁর পাঠদান পদ্ধতি সব সময় ছিল অংশগ্রহণমূলক। তাঁর ক্লাসে আমরা যেকোনো বিষয় নিঃসংকোচে উত্থাপন করতে পারতাম, প্রশ্ন করতে পারতাম যা খুশি।

‘সঞ্চিতা’ শিরোনামের কাব্য সংকলনটি তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল। ওটা ছিল নজরুলের কবিতার সংকলন। ওটাতে বিধৃত ‘মানুষ’ (নাকি ‘সাম্যবাদ’?) কবিতাটির এক জায়গায় দুটি লাইন এ রকম : স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারি খুলিল ভজনালয়/দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয়। তা বইটির যে কপিটি আমার কাছে ছিল তাতে ছাপার ভুলে ‘রাজা-টাজা’র স্থলে ছাপা হয়েছিল ‘রাজা-টাকা’। ওটা যে ‘টাকা’ না হয়ে ‘টাজা’ হবে তা স্কুলের সেভেন-এইটের একজন ছাত্রও বলতে পারবে। তবু স্যারের মন্তব্য শোনার জন্য বিষয়টির প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম আমি। স্যার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ স্মিতহাসি দিয়ে বললেন, ওটা অবশ্যই রাজা-টাজা হবে। তারপর জুড়ে দিলেন : টাকা হয়ে লোকের পকেটে পকেটে কে ঘুরতে চাইবে বলুন। তবে ওভাবে মোফাজ্জল করিম বিশ্বভ্রমণ করতে চাইলে আলাদা কথা।... এভাবে অন্তরঙ্গ পরিবেশ সৃষ্টিতে পারঙ্গম ছিলেন স্যার।

স্যারের সূক্ষ্ম রসবোধের পরিচায়ক আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সেটা ১৯৬৩ বা ’৬৪ সালের ঘটনা। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে কলেজে মাস্টারি করি। আমাদের শ্রদ্ধেয় সিনিয়র ভাই ও ছাত্ররাজনীতির সহযাত্রী এনায়েতুল্লাহ খানের (ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘হলিডে’র সম্পাদক, পরে বার্মা ও চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী ইত্যাদি। বর্তমানে প্রয়াত।) বিয়ে। ইয়ে করে বিয়ে। পাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সমসাময়িক ছাত্রী মাসুদা রহমান লীনা, স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুর রহমানের কন্যা। অধ্যক্ষ সাহেবের নামে জগন্নাথ কলেজের একটি বড় মিলনায়তন ছিল, নাম আব্দুর রহমান হল। এখনো বোধ হয় আছে হলটি। এনায়েত ভাই ও অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান তনয়া লীনার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল ওই হলে। জম্পেশ আয়োজন। সহস্রাধিক আমন্ত্রিতের মধ্যে আমিও ছিলাম। যে টেবিলে আমি বসেছিলাম সেই টেবিলে আমার ঠিক পাশেই বসেছিলেন আমার শিক্ষক আনিসুজ্জামান সাহেব। স্যারের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা। গল্পগুজব করছি এমন সময় কী একটা প্রয়োজনে স্যার আমাকে বললেন একজন বেয়ারাকে ডাকতে। আমি হাতের ইশারায় উর্দিপরা মাথায় পাগড়ি একজন বেয়ারাকে কাছে ডেকে আনলাম। স্যার কী যেন চাইতেই লোকটা চলে গেল সেই বস্তু আনতে। সুরসিক আনিস স্যার ওর দিকে তাকিয়ে আমাকে বললেন, তাও ভালো, আমি তো ভাবলাম মিন্টু (এনায়েত ভাইয়ের ডাক নাম) নিজেই সার্ভ করতে লেগে গেছে!... আসলে বেয়ারার পোশাক ও বর এনায়েত ভাইয়ের পোশাকের ধাঁচ অনেকটা একই রকম ছিল সন্দেহ নেই।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হঠাৎ কখনো-সখনো মুক্তিযোদ্ধা আনিস স্যারের সঙ্গে দেখা হতো এখানে-সেখানে। তখন শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁর অন্যান্য জাতীয় দায়দায়িত্ব বেড়ে গেছে অনেকখানি। এরই মধ্যে একবার ১৯৯৬ সালে কুমিল্লার প্রয়াত অধ্যাপক তিতাশ চৌধুরীর আমন্ত্রণে স্যার ও আমি তিতাশের অলক্ত সাহিত্যগোষ্ঠীর একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলাম। স্যারের সহধর্মিণী আমাদের বেবী ভাবিও সেদিন স্যারের সহগামিনী ছিলেন। কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী টাউন হলের মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। আমাকে সেখানে বক্তৃতার পর একটা স্বরচিত কবিতাও পাঠ করতে হয়েছিল। স্যারের প্রধান অতিথির ভাষণে আমার সেই কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনে বুকটা সেদিন ভরে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, সামান্য হলেও বোধ হয় গুরুদক্ষিণা দিতে পেরেছি।

আরেকবার খানিকটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলাম আমি। অনেক দিন আগের কথা। দিনক্ষণ মনে নেই। স্যারের সঙ্গে হঠাৎ দেখা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের লবিতে। আমার চিরদিনের অভ্যাস ছিল সকল শিক্ষাগুরুকে তা প্রাইমারি স্কুলের হোন, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হোন অনেক দিন অদেখার পর দেখা হলে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা। এমনকি আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ইয়ার অনার্সের সময়ে যে দু-একজন (পরোক্ষ) শিক্ষক আমার ক্যারিয়ারে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে অশনিসম্পাত ঘটিয়েছিলেন, তাঁদেরকেও। এ ব্যাপারে চিরকাল আমার নীতি : যদ্যপি মোর গুরু শুঁড়িবাড়ি যায়/তদ্যপি মোর গুরু নিত্যানন্দ রায়।

স্যারের পায়ে হাত দিতে উদ্যত হওয়া মাত্র ‘আরে করেন কী, করেন কী’ বলতে বলতে স্যার সাপ দেখার মত দ্রুত পেছনে সরে গেলেন। এরপর আর কোনো দিন তাঁকে কদমবুসি করার চেষ্টা করিনি। ঠিক একই কারণে সেই সময়ে ইংরেজি অনার্স ক্লাসে আমাদের জনপ্রিয় তরুণ শিক্ষক (স্যার পড়াতেন জন কিটস) শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহেবও একদিন (সেদিন ছিল ঈদের দিন, আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ঈদের নামাজের পর ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদে) তাঁকে চরণ ছুঁয়ে সালাম জানাতে গেলে আমাকে বিরত করেছিলেন।... প্রার্থনা করি, জাতির এই আরেক বিবেককে আল্লাহপাক আরও দীর্ঘদিন জীবিত রাখুন, সুস্থ রাখুন। দীর্ঘজীবী হোন, সুস্থ থাকুন আমার বাংলার অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম স্যারও।

৪.

অধ্যাপক, কবি, মুক্তিযোদ্ধা ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কথা মনে পড়লেই স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ইত্যাদি ছন্দ রং-বেরংয়ের প্রজাপতির মত ডানা মেলে উড়তে থাকে আমার মননে স্মরণে। আমার ছন্দের রাজ্যে প্রবেশ ঘটেছিল তাঁর হাত ধরেই। এর আগে কবিতা লিখতাম কবিতার গ্রামার না জেনেই, অনেকটা নাপিতের ফোঁড়া কাটার মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাবসিডিয়ারি ক্লাসে আপাতগম্ভীর মনির স্যার সারাক্ষণ আমাদের সঙ্গে ছন্দ, মাত্রা, পর্ব, বদ্ধাক্ষর, মুক্তাক্ষর ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতেন এবং একটু পর পরই স্মৃতি থেকে অনর্গল কবিতার স্তবক উদ্ধৃত করে ওগুলোর ‘ব্যবচ্ছেদ’ করতেন। স্যার নিজেও ওই সময়েই ছিলেন একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ (‘দুর্লভ দিন’?) বোধ হয় তখনই প্রকাশিত হয়। মনে পড়ে, গ্রন্থটির উৎসর্গ পৃষ্ঠায় একটি কবিতার লাইন ছিল : আমাকে পলাশ দিয়ে সে নিজেই হলো পলাশ।... কী দুর্দান্ত পংক্তি। ছন্দের ওপর স্যার একটি বহুলপঠিত বইও লিখেছিলেন।

’৯০-এর দশকে কিছুদিন বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করি আমি। ওই সময় ঢাকায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজনকালে স্যারকে উপদেষ্টা হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য হয় আমাদের। তখন বেশ কয়েক দিন তাঁর সঙ্গসুখ লাভ করি আমি। কিন্তু তাঁকে দেখে আমার কেমন যেন বিমর্ষ মনে হতো। প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্বল্পবাক মানুষটি যেন জীবনের সায়াহ্নবেলায় এসে আজীবনের প্রিয়সঙ্গী ছন্দ হারিয়ে ফেলেছেন, তাঁকে যেন সারাক্ষণ ঘিরে আছে একরাশ বেদনাবিধুর ধূপ।

সেই ছান্দসিক নির্মোহ কবি মানুষটি তাঁর ভরাট গলায় ক্লাসে ফুল ফোটানোর মত অনর্গল যেসব ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করতেন তারই দুটি স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে তাঁর উদ্দেশে নিবেদন করে শেষ করব আজকের স্মৃতিচারণা, শ্রদ্ধানিবেদন পর্ব : যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে/যমুনা যাবে শ্বশুরবাড়ি কদমতলা দিয়ে/কদমফুল কুড়াতে গিয়ে পেয়ে গেলুম মালা/হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম সীতারামের খেলা। স্বরবৃত্ত ছন্দ বোঝাতে গিয়ে এমনি আরও অনেক ছড়া ছড়িয়ে দিতেন ক্লাসে। আর মাত্রাবৃত্তের বেলা স্যারের প্রিয় আবৃত্তি ছিল : পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ এ কী সন্ন্যাসী/বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে/ব্যাকুলতর বেদনা তার বাতাসে ওঠে নিঃশ্বাসি/অশ্রু তার আকাশে পড়ে গড়ায়ে।... ২০০৮ সালে মনির স্যার একরকম অকালেই চলে গেলেন। আর সবাইকে হারাতে হারাতে আমাদের আজ অশ্রু গিয়েছে শুকিয়ে। এখন শুধু প্রার্থনা একটাই : যেখানে থাকুন, ভালো থাকুন আমাদের প্রিয় শিক্ষকেরা। আবার যখন দেখা হবে তখন চরণ ছুঁয়ে শুভাশিসটুকু নিতে দেবেন কিন্তু।

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা