kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

যুক্তরাষ্ট্র এখন খাদের কিনারায়

পল ক্রুগম্যান

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সর্বশেষ ঘটনাটা মিনিয়াপোলিস পুলিশ ইউনিয়নের প্রধান বব ক্রলের। ট্রাম্পের সমাবেশে হাজির হয়ে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন তিনি। কারণ ট্রাম্প নাকি পুলিশের ওপর বারাক ওবামার নিপীড়নের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন এবং পুলিশের হাতের পরিবর্তে অপরাধীদের হাতে হাতকড়া পরানোর সুযোগ করে দিয়েছেন।

মিনিয়াপোলিসে পুলিশ হেফাজতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু গত এক সপ্তাহে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এবং এ সময় পুলিশের নির্যাতনও আরো বেড়েছে। সেই নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি সংবাদকর্মীরাও। এসবের মধ্য দিয়ে বব ক্রলের সেই সব কথার অর্থ পরিষ্কার হয়ে গেছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প জনগণকে শান্ত করার পরিবর্তে আগুনে ঘি ঢেলে চলেছেন। মনে হচ্ছে, তিনি গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়ার চরম চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আমেরিকা যে খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছে, সে কথা বললে অত্যুক্তি হবে না বলেই আমার মনে হয়। আমরা কী করে এমন অবস্থায় পৌঁছলাম? মার্কিন রাজনীতির গত চার দশকের ইতিহাসের সার অংশটুকু হলো, ধনী অভিজাত শ্রেণি রাজনৈতিক ক্ষমতা হাসিল করার জন্য শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের অস্ত্রে শাণ দিয়েছে এবং শ্রমিক শ্রেণির ঘাড়ের ওপর দিয়ে ধনীদের আরো ধনী করার নীতি বাস্তবায়নে সেই অস্ত্র কাজে লাগিয়েছে।

এই বাস্তবতা পুরোপুরি অস্বীকার করার মতো পরিস্থিতি ট্রাম্পের উত্থানের আগ পর্যন্ত চিন্তা করা যেত না। কিন্তু এখন যেন বাস্তবতা দেখেও চোখ বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে।

এখনো আমি মাঝেমধ্যে দেখছি, বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ট্রাম্পকে লোকরঞ্জনবাদী অ্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অথচ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি লোকরঞ্জনবাদের একেবারে বিপরীত। তাঁর সেই নীতি সব সময় ধনিক শ্রেণির জন্য এবং করপোরেট ও ধনীদের জন্য কর হ্রাসের বিপুল চেষ্টা সফল করার দিকে ধাবিত। সেই চেষ্টা বহুলাংশে সফলও হয়েছে। দরিদ্র ও শ্রমিক শ্রেণির স্বাস্থ্য সুবিধা সংক্রান্ত ইনস্যুরেন্স বাতিলের যে চেষ্টা করা হয়েছে, সেটা অবশ্য ব্যর্থ হয়েছে।

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধও কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনি, উন্নয়ন হয়নি কর্মসংস্থান পরিস্থিতির। কয়লাখনি কিংবা উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বাড়েনি। আর যে কৃষকরা ট্রাম্পকে ২০১৬ সালের নির্বাচনে জিতিয়েছিল, তারাও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে দুর্ভোগের শিকার হয়েছে।

তাহলে ট্রাম্প এমন কী করেছেন, যেটার কারণে শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে তাঁর ভিত গড়ে উঠেছে? ট্রাম্প আসলে বর্ণবিদ্বেষে সায় দিয়েছেন। পুলিশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

অর্থনৈতিক স্বার্থই যদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মুখ্য চালিকাশক্তি হতো, তাহলে পুলিশ কর্মকর্তারা ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই যেত। ডেমোক্র্যাটরা জনসেবা খাতের কর্মীদের সংগঠিত করছে, অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ইউনিয়ন ও সরকার—উভয়ের বিরুদ্ধে। সর্ববৃহৎ শ্রমিক ইউনিয়ন ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে থাকলেও বাকি শ্রমিকরা ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকেই ভোট দিয়েছে। অথচ ট্রাম্পের করনীতিতে তাদের কোনো লাভ হবে না।

তার পরও বহু পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের ইউনিয়ন ট্রাম্পের গোঁড়া সমর্থক রয়ে গেছে। কারণ তাদের ধারণা, তাদের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে তাদের বর্ণবাদী আচরণ সত্ত্বেও ট্রাম্প তাদের সমর্থন দেবেন।

এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে বলা দরকার, বহু পুলিশ কর্মকর্তা এবং সম্ভবত বেশির ভাগ পুলিশের গত সপ্তাহের আচরণ ভালোই ছিল। বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ শহরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।

দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের পেছনে কোনো যুক্তিসংগত কারণ থাকতে পারে কিংবা এমন সংকটের মুহূর্তে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তাঁর ভূমিকা রাখা উচিত, সেসব স্বীকারই করতে চান না ট্রাম্প।

ট্রাম্প একদিকে তাঁর সমর্থকদের মাধ্যমে কার্যকরভাবে সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন, অন্যদিকে সামাজিক প্রতিবাদ প্রতিহত করতে সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগানোর খুব কাছাকাছি চলে গেছেন। এমন একটা মুহূর্তে বাকি রিপাবলিকানদের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো বাধা আসবে, সেটা কেউ আশাই করছে না।

সামরিক শক্তি প্রয়োগের নানা অজুহাত ট্রাম্প দাঁড় করাচ্ছেন বটে, তার পরও তিনি অদূর ভবিষ্যতে বর্ণবাদী লড়াই শুরু করতে সফল হবেন—তেমনটা অবশ্য আমি মনে করি না। তবে সামনের কয়েকটা মাস পরিস্থিতি খুব কদর্য হওয়ার আশঙ্কা আছে।

সর্বতোভাবে শান্তিপূর্ণ এই প্রতিবাদ দমনে ট্রাম্প যদি সামরিক বাহিনী কাজে লাগানোর কথা বলতে থাকেন এবং সহিংসতায় উসকানি দিতে থাকেন, আর তার পরও যদি দেখা যায় আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি পরাজয়ের দিকে এগোচ্ছেন, তখন তিনি ও তাঁর সমর্থকরা কী করবেন?

 

লেখক : নোবেল স্মৃতি পুরস্কার বিজয়ী, অধ্যাপক, গবেষক, কলাম লেখক

সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস

ভাষান্তর : শামসুন নাহার

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা