kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

করোনাভাইরাস সংক্রমিত বিশ্বের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ দিবসের ভাবনা

ড. কানন পুরকায়স্থ

৫ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাভাইরাস সংক্রমিত বিশ্বের প্রেক্ষাপটে পরিবেশ দিবসের ভাবনা

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতিবছর পরিবেশ দিবসের জন্য একটি বিষয় নির্ধারণ করে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়  ‘Time for Nature’। এর ভাবার্থ হতে পারে ‘এখন প্রকৃতির সময়’। অর্থাত্ যে খাদ্য গ্রহণ করে আমরা জীবন ধারণ করি, আমাদের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে যে বাতাস গ্রহণ করি, যে পানি পান করি এবং যে জলবায়ু এই পৃথিবীকে আমাদের বাসযোগ্য করে রেখেছে, তার সবটুকুই প্রকৃতির দান। তা ছাড়া প্রকৃতি কার্বন শোষণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতাকে কমিয়ে আনতে পারে। সুতরাং প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে তা গভীরভাবে অনুধাবন করা এখন প্রয়োজন।

মানুষের অস্তিত্ব নানা প্রাণীর বয়নের (Web of life) ওপর নির্ভরশীল। এই বয়নের মাধ্যমে তৈরি হয় একটা সিস্টেমের অন্তর্জাল। বার্নার্ড পেটেন তাঁর প্রবন্ধ ‘নেটওয়ার্ক ইকোলজি’তে লিখেছেন, ‘Ecology is network...to understand ecosystems ultimately will be to understand networks.’ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ফ্রিজফ কাপরার মতে এটি হচ্ছে একটি ‘নিয়মবদ্ধ চিন্তা’, কাপরা তাঁর  ‘The Web of Life’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘nature at large turns out to be more like human nature unpredictable, sensitive to the surrounding world and influenced by small fluctuations.|’ কাপরা প্রস্তাব করেন যে প্রকৃতির কাছে যেতে হলে তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে নয়; বরং তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, সহযোগিতা স্থাপন এবং এক ধরনের সংলাপের মাধ্যমে তা সম্ভব।

 ভৌত রসায়নবিদ ইলিয়া প্রিগোজিনের গ্রন্থ  ‘Order out of Choas : Mam's New Dialogue with Nature’ গ্রন্থে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের কলাকৌশল সম্পর্কে জানি। প্রিগোজিন একটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেন যার নাম  ‘A theory of dissipative structure of nature।’ এই তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরিবেশের সামান্য পরিবর্তন হলে পরিবেশ কিভাবে প্রতিক্রিয়া করে সেই সংবেদনশীলতাকে বোঝা। প্রতিটি নিয়মবদ্ধ প্রাণে এক ধরনের ক্ষয়িষ্ণু গঠন বা  dissipative structure রয়েছে। প্রিগোজিন উল্লেখ করেন, ‘Today the world we see outside and the world we see within are converging।’ এই প্রেক্ষাপটে আমাদের সঙ্গে জীবমণ্ডলের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে হবে।

এবার দেখা যাক মানবসভ্যতার উন্নয়ন প্রকৃতিতে কী প্রভাব ফেলেছে। গত ১০০ বছরের হিসাবে দেখা যায়, ১৯০০ সালে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ছিল প্রতিবছর দুই বিলিয়ন টন, এখন সেখানে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ প্রতিবছর ৩৭ বিলিয়ন টন দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ১৫ সেন্টিমিটার। ৬০ শতাংশ প্রাণীর প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে এই শতাব্দীর শেষে তাপমাত্রা বাড়বে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্রায় ১৫.৮ মিলিয়ন হেক্টর ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট ধ্বংস হয়েছে। মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় তার অর্ধেক শোষিত হয় বনাঞ্চল, গাছপালা, সাগর ও মাটির মাধ্যমে। মানুষের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করাকে নিসর্গবিদরা নাম দিয়েছেন ইপ্পো বা HIPPO। এখানে  H হচ্ছে Habitat destruction, ও হচ্ছে Invasive species, P হচ্ছে  Pollution, P হচ্ছে population growth এবং  O হচ্ছে over hunting। বস্তুত পৃথিবীর বিগত ৩.৮ বিলিয়ন বছরের ইতিহাসে প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতি আবার নতুন প্রজাতি হিসেবে বেড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিককালে এই প্রজাতি বিলুপ্তির হার অনেক বেশি। তার কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই প্রজাতির অভিযোজন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইউএনইপি অতি সম্প্রতি জানিয়েছে, বর্তমানে যে কভিট-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তার সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কযুক্ত। ইউএনইপির মতে, জীববৈচিত্র্যের কারণে আমাদের পরিবেশে কোনো নির্দিষ্ট জীবাণু একে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না; কিন্তু জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে জীবাণু প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যেও জ্যোতির্বিদ মার্টিন রিজ তাঁর, ‘On the Future : prospects for Humanity’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, রেইনফরেস্টে যে গাছগাছালি রয়েছে তা থেকে অনেক ওষুধ তৈরি হতে পারে। তবে মানুষের জন্য এই গাছপালার আধ্যাত্মিক মূল্য অনেক বেশি। বস্তুত আমাদের অস্তিত্ব পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল এবং এ কারণেই বিশিষ্ট নিসর্গবিদ অ্যাডওয়ার্ড উইলসন তাঁর ‘The Creation’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে ‘আমাদের দেহ ও মন যেভাবে বেড়ে উঠেছে তা এই পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্য কোনো পরিবেশে নয়।’ উইলসন তাঁর ‘Half Earth : Our Planet's Fight for Life’-এ উল্লেখ করেন জীববৈচিত্র্যের জন্য পৃথিবীর অর্ধেক অংশ ছেড়ে দিতে হবে। এই অর্ধেক পৃথিবী বলতে উইলসন পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করে এক ভাগ জীববৈচিত্র্যের জন্য ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেননি বরং পৃথিবীতে বিদ্যমান জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা এবং বৃহত্ বনাঞ্চল সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জায়গাগুলোকেও উইলসন চিহ্নিত করেছেন, যেমন—ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড বনাঞ্চল, কঙ্গো অববাহিকা, উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের সমতল ভূমি, বোর্নিও, আমাজন নদী অববাহিকা ইত্যাদি।

 প্রশ্ন হচ্ছে পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কি শুধু সরকারি নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে সম্ভব? প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদের ব্যবহার—এই দুইয়ের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। একে যুক্তি দিয়ে বোঝানো যাবে না। পরিবেশের সঙ্গে মনস্তত্ত্বের গভীর সম্পর্কের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিসর্গবিদ জুয়ানা মেসি বলেছেন, ‘greening the self,’ দার্শনিক ওয়ারউইক ফক্স বলেছেন, ‘Transpersonal ecology’ এবং ঐতিহাসিক থিওডোর রোজাক বলেন, ‘eco-psychology।’

জার্মান নিসর্গবিদ ও দার্শনিক আলেকজান্ডার ভোন হামবোল্ট বলেছেন, বিশ্ব সম্পর্কে বিপজ্জনক মতামত তারাই প্রদান করতে পারে, যারা বিশ্বকে ভালোভাবে দেখেনি। আমরা এই পৃথিবীর সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্যকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি।

এটি এখন সর্বজনস্বীকৃত যে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মকভাবে প্রভাব পড়েছে। আমরা এরই মধ্যে লক্ষ করেছি যে উষ্ণতা এবং অন্যান্য কারণে সাগরে প্রবাল প্রাচীর বিলুপ্তপ্রায়। সুমেরু অঞ্চলের বেশির ভাগ বরফ গলে গেছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণে জীবাণু প্রাণীর দেহ থেকে মানুষে সংক্রমিত হচ্ছে। সুতরাং বর্তমানে এই করোনাভাইরাস সংক্রমিত পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য রাখতে হলে এই জীবমণ্ডল এবং প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে হবে।

 

লেখক : যুক্তরাজ্যে কর্মরত পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা

অধ্যাপক ও গবেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা