kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

জর্জ ফ্লয়েড হত্যা কি বাঁক বদলে দেবে?

অনলাইন থেকে

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘আমি ওকে আর ১০ জনের মতো করে দেখতে চাই না।’ গত সপ্তাহে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপের সময় ভাই ফিলোনেস জর্জ ফ্লয়েড সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন। এ কথার অর্থ প্রতিটি আফ্রিকান আমেরিকানের কাছে স্পষ্ট। ট্রাইভন মার্টিন, এরিক গর্নার, মাইকেল ব্রাউন, ওয়াল্টার স্কট আর এবার ফ্লয়েড—এদের প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো না কোনো সদস্যের হাতে। আরো স্পষ্ট করে বললে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আইনের ভুল প্রয়োগের কারণে। এই তালিকা ক্রমেই লম্বা হচ্ছে।

গর্নার ও স্কটের ঘটনাগুলোর ভিডিওচিত্রে দেখা যায় কী সহজে, অবলীলায় ও নৃশংসভাবে তাদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ট্রাইভন মার্টিন খুন হন ১৭ বছর বয়সে। ফ্লোরিডার যে কমিউনিটি নজরদারি কর্মকর্তা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তাঁকে আদালত বেকসুর খালাস দেন। এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই জন্ম হয় ‘ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার’ আন্দোলনের। কিন্তু গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে আবার একই ঘটনা ঘটেছে। দিনের আলোতে এক পুলিশ কর্মকর্তা নিরস্ত্র ফ্লয়েডের শ্বাসনালির ওপর প্রায় ৯ মিনিট হাঁটু চেপে ধরে রাখেন। প্রাণবায়ু বের হয়ে যায় ফ্লয়েডের।

বিক্ষোভে ফেটে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। কারফিউ ভেঙে, নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশ অমান্য করে টানা ছয় দিন ধরে দেশের প্রায় ৪০টি শহরে বিক্ষোভ চলে। চলছে এখনো। অনেকেই মনে করছে, এই হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। বলা হচ্ছে, এটি হতে পারে বাঁক বদলের মতো ঘটনা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিক্ষোভকারীদের দেখছেন ‘দাঙ্গাকারী’ বা ‘নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী’ হিসেবে। তবে তাঁর এই ইচ্ছাকৃত ভুল উপস্থাপনের কারণে গণমানুষের মনোভাব বা ক্ষোভ পাল্টে যাবে না।   

ভুলে গেলে চলবে না যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে কভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। ফ্লয়েডের হত্যার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-১৯ তার থাবা বিস্তার করতে শুরু করে। আর ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড জানান দিল মার্কিন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্ণবিদ্বেষ কী তীব্রভাবে ঢুকে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই সময়ে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজনৈতিকভাবে বিভাজনের নীতিতে বিশ্বাসী একজন প্রেসিডেন্ট। গত সপ্তাহে করা এক টুইটে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘লুটতরাজ শুরু হলেই গুলি চালাবে পুলিশ।’ ১৯৬৭ সালে মিয়ামিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলার সময় সে রাজ্যের পুলিশ প্রধানও এমন মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু কোনো রাজনীতিবিদ সরকারি দপ্তরে বসে এমন মন্তব্য করতে পারেন না। প্রেসিডেন্টের তো প্রশ্নই আসে না। ট্রাম্পকে অবশ্য এর আগেও এ ধরনের ভূমিকায় দেখা গেছে। শার্লটসভিলের চরম দক্ষিণপন্থী  শ্বেতাঙ্গদের সমর্থন করেন তিনি। সে দফায় কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবল দলের কয়েকজন খেলোয়াড় জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতনের শিকার হন। এই নির্যাতনের সমর্থনে সমাবেশ করে শ্বেতাঙ্গরা। সে সময়ই এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, ট্রাম্প বর্ণবাদী বিভাজন তৈরির মাধ্যমে তাঁর শ্বেতাঙ্গ ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে চান। এখন থেকে নভেম্বরের মধ্যে ট্রাম্পের কর্তৃত্বপরায়ণতা আরো বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ট্রাম্প অবশ্য ২০১৭ সালে তাঁর অভিষেক ভাষণেই এ ধরনের আভাস দিয়েছিলেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ট্রাম্পকে তেমন কিছুর দিকে উসকে দেবে না বলে আশা করা যেতে পারে। আটলান্টার র‌্যাপার কিলার মাইক যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলা বিক্ষোভে অংশগ্রহণদের প্রতি আইনজীবী, মেয়রের দপ্তর, পুলিশ প্রধান ও উপপ্রধানদের দপ্তর ঘেরাও করার আহ্বান জানিয়েছেন। চ্যালেঞ্জ করতে বলেছেন স্থানীয় বিচারিক ও সরকারি শক্তির বিরুদ্ধে। কারণ এসব স্থানেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে বর্ণবাদ রয়ে গেছে। পরিস্থিতি পরিবর্তনে রাজনীতি প্রবেশকারী নতুন প্রজন্মের ব্যাপকতর ভূমিকার প্রয়োজন। যার শুধু আবহমানকাল ধরে চলা সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নয়; বরং ব্ল্যাক লাইফ মেটারের মতো চলমান অন্য আন্দোলনগুলোর মাধ্যমেও প্রভাবিত। তারা হয়তো নিউ জার্সির পুলিশ কর্মকর্তাদের মতো মানুষের সমর্থন পাবেন। যেখানে পুলিশ সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রতিবাদ করে। অথবা তারা দেখা পেতে পারেন আটলান্টার পুলিশ প্রধানের মতো মানুষের। যে পুলিশ প্রধান নিজ বিভাগের অন্য সদস্যদের বিক্ষোভকারীদের ওপর টিজার (এক ধরনের অস্ত্র। যার প্রয়োগে মানুষ জ্ঞান হারায়) ব্যবহারের নিন্দা জানান। রাস্তায় নেমে যান বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য শুনতে। তবে তার আগে এসব নতুন রাজনীতিককে ক্ষমতার আসনগুলোতে বসতে হবে। তবে দুর্ভাগ্য হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন রাজনীতিকের সহসাই দেখা মিলবে না।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা