kalerkantho

বুধবার । ৩১ আষাঢ় ১৪২৭। ১৫ জুলাই ২০২০। ২৩ জিলকদ ১৪৪১

বাজেট ২০২০-২১ : ভাবনার কেন্দ্রে কৃষি খাত

অমিত রঞ্জন দে

৪ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাজেট ২০২০-২১ : ভাবনার কেন্দ্রে কৃষি খাত

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রকোপে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এই গভীর সংকটময় সময়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রণীত হতে যাচ্ছে। জাতীয় বাজেট যেমন একটি রাষ্ট্রের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব, তেমনিভাবে এর মধ্য দিয়ে তার উন্নয়ন নীতি-দর্শনের প্রায়োগিক প্রতিফলনও ঘটে থাকে। এবারের বাজেট কোনোভাবেই বিগত দিনের ধরন, প্যাটার্ন বা নীতি-দর্শন ঠিক রেখে প্রণয়ন করলে হবে না। কারণ বৈশ্বিক মহামারি করোনা গোটা বিশ্বের জীবনব্যবস্থা পাল্টে দিয়েছে, পাল্টে দিয়েছে জীবন বোধ, পাল্টে গেছে খাদ্যশৃঙ্খল। সুতরাং তার সঙ্গে সংগতি রেখেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই রপ্তানিমুখী চিন্তাকে পরিহার করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

প্রায় প্রতিবছরই কৃষক কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন তা সাধারণত আমাদের জানা, কোথায় কী ধরনের বিনিয়োগ দরকার এবং কিভাবে তা কার্যকর করা যাবে সেটাও আমরা জানি। লকডাউনে বাধাগ্রস্ত হয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছেন। হাঁস-মুরগি ও ডিম উৎপাদকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুধ উৎপাদনকারীদের অবস্থা আরো খারাপ। উৎপাদক, বিশেষ করে ফুল, টমেটো এবং তরমুজ জাতীয় পচনশীল পণ্য উৎপাদনকারী পরিবহন সমস্যার কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। প্রায় প্রতিটি দুর্যোগের সময় কৃষক এ রকম কম-বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়ে থাকেন। তাই কৃষি খাতের সামগ্রিক বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এ ধরনের বা এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্যান্য বিষয় মাথায় রেখে ভর্তুকি, ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা বা প্রশিক্ষণ খাতের বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে। বাজেট বরাদ্দ করতে হবে কৃষক ও খামারির উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে কৃষিজাত ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের কথা মাথায় রেখে। নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কৃষি অর্থনীতি বা গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েই চিন্তা করতে হবে। দেখতে হবে তা থেকে কৃষি এবং কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষক-ক্ষেতমজুরদের স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে কি না।

করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য আরো গভীর হয়েছে এবং নতুন করে আরো ব্যাপকসংখ্যক মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, করোনাভাইরাসের প্রভাব আরো দুই বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে পারে। যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব দেখা দিতে পারে। আসন্ন ভয়াবহ মন্দায় আমাদের রপ্তানি খাত ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স খাতে ধস নামবে, দেশের অর্থনীতিতে নেমে আসবে দীনতা। অর্থনীতির এই দীনতা থেকে উদ্ধার পেতে কৃষি খাতকে রক্ষা ও তার পুনরুজ্জীবনের বিকল্প নেই। যদি তাই হয় তাহলে কৃষির বৈচিত্র্য রক্ষা ও বাড়ানো এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে খাদ্য নিরাপত্তায় যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান সেই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে কি না।

সরকার প্রতি মৌসুমে কৃষকের দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য উপযুক্ত মূল্যে ধান-চাল ক্রয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এবারও বোরো মৌসুমের উৎপাদিত ধান থেকে ৮ মেট্রিক টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার এবং ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল ও ১.৫ মেট্রিক টন আতপ চাল ক্রয় করবে (সূত্র : খাদ্য মন্ত্রণালয়)। এটাই এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা। এখন সরকার যে ধান-চাল ক্রয় করে তা থেকে বাজারে কি প্রভাব পড়ে এবং কৃষক কতটুকু উপকৃত হয়। সরকার যে পরিমাণ ধান ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা উৎপাদিত ধানের মাত্র ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

প্রশ্ন হলো, এই ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ ধান ক্রয় করে বাজারে কী প্রভাব পড়বে এবং তা দিয়ে প্রকৃত কৃষক কতটুকু লাভবান হবে? যেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিনবে উৎপাদিত ধানের ২২ শতাংশ। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাপনা নিয়ে। প্রশ্ন মূল্য নির্ধারণ, সংগ্রহের উৎস, সংগ্রহ কেন্দ্র, সংগ্রহ পদ্ধতি নিয়ে। কারণ আমরা প্রতিবছর লক্ষ্য করে থাকি যে পদ্ধতিতে ধান-চাল সংগ্রহ করা হয় তাতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কর্মী, চালকল মালিকসহ ব্যবসায়ীরা লাভবান হন। প্রকৃত কৃষক তা থেকে খুব সামান্যই লাভবান হচ্ছে। সুতরাং বাজেট বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গে একটি চৌকস ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঠিক করতে না পারলে ভষ্মে ঘি ঢালা হবে।

বিজ্ঞানিদের ধারণা, বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস এর আগে কোনো না কোনো প্রাণীর দেহে বাস করত। কিন্তু প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সেসব প্রাণীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ায় তা আজ মানুষের দেহে সংক্রামণ ঘটাচ্ছে। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের নামে জমিতে যথেচ্ছভাবে সার-কীটনাশকের ব্যবহার করছি। যা মাটি থেকে উপকারী পোকাও ধ্বংস করে ফেলছে। সেই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য। বিষয়টি এরই মধ্যে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে জৈব কৃষিনীতি-২০১৭ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন এবং মাটির ভগ্নদশা থেকে উত্তরণে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও কর্মসূচির ঘাটতি রয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই কৃষি বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। এই বছর কভিড-১৯-এর কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়া এবং আর্থিক ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় কৃষককে অতিরিক্ত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠার বিষয়টি মাথায় নিয়েই বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে। বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন ভালো এবং সে ধান নানা উপায়ে কৃষকের ঘরে উঠে গেছে। কৃষক এখন ঋণের টাকা পরিশোধ বা তার অন্য প্রয়োজন মেটাতে ধান বিক্রি করে দেবে। সরকারকে প্রথমেই এই ধান উপযুক্ত মূল্যে ক্রয় বা কৃষকের ঘরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে সে আরো ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়।

করোনা মহামারির প্রভাবে যে কঠিন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে কৃষক শস্য উৎপাদন, প্রাণিসম্পদ, হাঁস-মুরগি এবং মাছ উৎপাদনের জন্য যে ভর্তুকি, ঋণসহ উৎপাদনের উপকরণ এবং সেবাগুলো পেয়ে থাকে তা অব্যাহত রাখলেই শুধু চলবে না, তা আরো বৃদ্ধি করা এবং ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বরাদ্দকৃত বাজেট অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে দুর্নীতিশূন্যভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তার জন্য প্রকৃত কৃষক ও খামারিদের তালিকা হালনাগাদ করা দরকার। সে অনুযায়ী প্রণোদনা, বিনা সুদে ও হয়রানি ব্যতিরেকে ঋণ এবং সরকারি সহায়তা প্রদানে ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

আজ আমরা যখন বিপন্ন জীবনের সীমান্তে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্য-অর্থনীতি, পরিবেশ-প্রকৃতি ও প্রাণ-বৈচিত্র্যকে মাথায় রেখে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষিকে পুনর্গঠনের কথা ভাবছি তখন নিশ্চয়ই জৈব কৃষি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় সক্ষম কৃষিব্যবস্থা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। ২০২০-২১ এর বাজেট পরিকল্পনায় তারই শুভ উদ্বোধন ঘটুক।

লেখক : উন্নয়ন সংগঠক ও সহসাধারণ সম্পাদক, উদীচী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা