kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

পরীক্ষায় ভালো ফলই চূড়ান্ত প্রাপ্তি নয়

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পরীক্ষায় ভালো ফলই চূড়ান্ত প্রাপ্তি নয়

ভালো ফলাফলের খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছেয়ে গেছে। আমাদের সন্তানদের ভালো ফলাফলের খবর পেয়ে মনটায় বেশ ভালো লাগছে। কারণ অনেক দিন কোনো ভালো খবর পাই না। তাই ভালো ফলের খবরটা বেশ মিষ্টি। আলাদাভাবে করোনার সময়ে মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি কিনতে যাওয়ার বোধ খুব বেশি হচ্ছে না। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ফল দেখছি সেগুলোর বেশির ভাগই জিপিএ ৫। আমরা অভিভাবকরা গর্ব করে সেগুলো প্রচার করছি। সেটি খুব স্বাভাবিক বিষয়। এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু আমার এমন কোনো ফলের খবর চোখে পড়েনি, যেখানে কেউ গর্ব করে লিখেছেন, আমার সন্তান জিপিএ ৪ পেয়েছে কিংবা তার চেয়ে কম। তাহলে কি ধরে নেব, যারা অপেক্ষাকৃত কম জিপিএ পেয়ে পরীক্ষায় পাস করেছে, তারা আমাদের দেশের জন্য কোনো কাজে আসবে না। আমার মনে হয় এমনটি মোটেও নয়। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়, তখন খেয়াল করে দেখেছি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে জিপিএ ৫ পায়নি এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। আবার এসব শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল করে দেশ ও জাতির কাজে আসছেন। তাঁরাই একদিন দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হচ্ছেন।

আমার মনে আছে, সম্ভবত ২০০১ সালে প্রথম মাধ্যমিক পর্যায়ে গ্রেডিং সিস্টেম চালু হয়েছিল, সে বছর জিপিএ ৫ পেয়েছিল হাতে গোনা কয়েকজন। আবার যারা জিপিএ ৫ তো দূরে থাক, কোনো রকমে জিপিএ ৩ পেয়েছিল সেই শিক্ষার্থীও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেশের সেরা একজন হতে পেরেছিলেন। তাহলে আমরা কেন গর্ব করে ফেসবুকে লিখি না আমার সন্তানটিও জিপিএ ৪ কিংবা ৩ পেয়ে পাস করেছে। আমার মনে আছে, গত বছর ভারতে দশম শ্রেণির ফলাফল পেয়ে এক ‘মা’ ফেসবুকে গর্ব ভরে পোস্ট করেছিলেন যে ‘আমার ছেলে দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। এবং এর জন্য আমি চরম আনন্দিত।’ ওই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ যেমন তা শেয়ার করেছিলেন, তেমনই ১২ হাজারের বেশি মানুষ সেই পোস্টে এসে বিভিন্ন ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন।

আমাদের দেশে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৮২.৮৭ শতাংশ। পাস করেছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৫২৩ জন। এর মধ্যে মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৮ জন পরীক্ষার্থী। গতবারের চেয়ে এবার ৩০ হাজার ২৮৪ জন বেশি পরীক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। সংখ্যার বিচারে নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। মানের বিচারে বিস্ময়কর কি না সেটি প্রশ্নতুল্য।

আমরা অনেকেই মনে করি, পরীক্ষায় কেউ ভালো ফল করলেই সে মেধাবী। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আমরা যাঁরা অভিভাবক তারা যেমন ক্রিকেট খেলা দেখতে গেলে সাকিব কিংবা মুশফিকের কাছে সর্বোচ্চটা আশা করি। তেমনি আমরা আমাদের সন্তানদের পরীক্ষা দিতে পাঠাই প্রত্যাশার পারদ মাথায় চাপিয়ে দিয়ে। আমরাও তাদের কানের কাছে ক্রমাগত বলে যেতে থাকি, তোমাকে প্রথম হতে হবে। যেন পরীক্ষায় সেরা না হতে পারলে জীবনই বৃথা।

আমরা যদি একটু অন্য রকম ভাবতাম! সন্তানদের ক্রমাগত না বোঝাতাম পিইসি, জেএসসি, এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলই জীবনের চূড়ান্ত প্রাপ্তি নয়। তাহলে হয়তো এই প্রজন্ম, যারা পরীক্ষা দিচ্ছে তারা একটু সহজ ছন্দে জীবনে চলতে পারত। এত মানসিক অবসাদ, এত হতাশার মুখোমুখি এই প্রজন্মকে হতে হতো না।

আসলে এই জীবনের সব কিছুতে, চাকরিতে, প্রেমে আমরা পরীক্ষার মার্কশিটকেই একমাত্র পাসপোর্ট হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছি বা নিজেরাও শিখেছি, তাতেই বোধ হয় বেশি গোলমাল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমরা তো সিনেমায় হিরোকে সব সময়ই সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিনি। তবু কেন আমরা নিজেরা সিনেমা দেখতে গিয়ে নিজেকে হিরো ভেবে নিই। সেই সিনেমায় হিরো হয়তো একজন নেহাতই ছাপোষা ছাত্র, কিন্তু সে-ও বেচারা প্রেমে পড়ে। ধনী লোকের সুন্দরী মেয়েটাও তার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

আমরা যে সন্তানকে সব সময় কানের কাছে গিয়ে বলতাম, তোমাকে প্রথম হতে হবে। তোমাকে জিপিএ ৫ পেতে হবে। সেই সন্তানটি যদি জিপিএ ৫ না পায়, তাহলে তার জীবন কি বৃথা হয়ে যাবে? হয়তো যাবে না। কিন্তু তাকে যে শঙ্কা এবং হীনম্মন্যতা আঁকড়ে ধরবে—সেখান থেকে বের হয়ে আসাটা নিশ্চয়ই সহজ হবে না।

আমরা প্রতিবছরই দেখি পরীক্ষার ফল খারাপ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় কেউ কেউ। এ ক্ষেত্রে প্রথমত আমরা অভিভাবকরা দায়ী। দ্বিতীয়ত আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সাংস্কৃতিগত দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি দায়ী। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আশ্রয়স্থল তার পরিবার। তাই পরিবারের পক্ষ থেকেই সন্তানকে হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয়—এমন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি থেকে দূরে থাকি।

সন্তান জিপিএ ৫ না পাওয়ায় আমরা অভিভাবকরা হতাশ হয়ে উঠি। কিন্তু একবারও চিন্তা করি না পরীক্ষার ভালো ফলাফলই জীবনের সব কিছু না। বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন পড়াশোনায় এতই খারাপ ছিলেন যে তাঁকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল! স্কুল থেকে দেওয়া চিঠিতে লেখা ছিল, ‘টমাস পড়াশোনায় খুবই অমনোযোগী এবং তার মেধাও ভালো নয়। এ ধরনের ছাত্রকে স্কুলে রাখা সম্ভব না।’ কিন্তু টমাসের মা চিঠিটা খুলে ছেলেকে পড়ে শুনিয়েছিলেন, ‘টমাসের মেধা সাধারণ ছাত্রদের চেয়ে অনেক বেশি। এমন মেধাবী ছাত্রকে পড়ানোর ক্ষমতা সাধারণ স্কুলের নেই। অতএব, তাকে যেন বাড়িতে রেখে পড়াশোনা করানো হয়।’ মায়ের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে টমাস জটিল জটিল বিষয় পড়া শুরু করেন। বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করতে গিয়ে তিনি ১০ হাজারবারেরও বেশিবার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে তা আবিষ্কার করেন, থেমে যাননি। কারণ তাঁর মা তাঁর মধ্যে এ বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়! মায়ের মৃত্যুর বহু পর টমাস স্কুলের সেই চিঠিটি খুঁজে পেয়েছিলেন। চিঠিটি পড়ে তিনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘টমাস ছিল একজন মেধাহীন শিশু। একজন অসাধারণ মায়ের অনুপ্রেরণায় সে হয়ে উঠে যুগের সেরা মেধাবী।’

কাজেই পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য আমরা আমাদের শিশুকে মানসিক চাপে না ফেলে, উৎসাহিত করি। অল্পতেই সন্তুষ্টি হয়ে শিশুর আগামী দিনের যাত্রাকে পরিচ্ছন্ন করি। শঙ্কা ও হীনম্মন্যতা যেন আমার সন্তানকে আঁকড়ে না ধরে—তেমন সচেতনতাই বাঁচাতে পারে সন্তানের ভবিষ্যেক। সর্বোপরি এই দেশ কিংবা জাতিকে।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা