kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

প্রত্যেকটি মানুষের খাদ্যের অধিকার আছে

সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত

৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রত্যেকটি মানুষের খাদ্যের অধিকার আছে

পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের লকডাউন কিছুটা শিথিল হলো। হস্তিনাপুর থেকে আর্যবর্ত, মানুষ যখন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, তখন লোককে বাঁচানোর জন্য দিল্লিতে যাঁরা সরকার চালাচ্ছেন, তাঁদের সদর দপ্তর নাগপুরের আরএসএস থেকে নির্দেশ দেওয়া হলো গোচোনা বা গোবর খেলেই এই রোগ নির্মূল হবে। ছয় বছর আগে মোদি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাদের প্রধান কর্মসূচি ছিল গোমাংস বন্ধ করা, গরু কাটা বন্ধ করা। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে তা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

রামায়ণ-মহাভারত ও শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কিত বিভিন্ন ধারাবাহিক একাধিক আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ  করে টিভিতে দেখানো শুরু হলো। বিজ্ঞান হিন্দুত্ববাদীদের কাছে যতই তুচ্ছ বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, ততই মানুষের ওপর চরম দুর্দশা নেমে আসছে। তাই ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদির দিবানিদ্রায় স্বপ্ন দেখলেন ভারত থেকে  ১০০০ এবং ৫০০ টাকার নোট তুলে নিতে হবে। তুলেও নিলেন। কোটি কোটি মানুষ তাদের অর্জিত অর্থ তোলার জন্য লাইন দিয়েছিলেন। কয়েকজন মারাও গেলেন।

আর এবারও ৭০-৭৫ দিন আগে হঠাৎ তাঁর খেয়াল হলো ভারতে লকডাউন করতে হবে। ঘোষণাও করে দিলেন। বন্ধু ট্রাম্পকে ফোন করে বললেন, ভারতের মানুষ লকডাউন মেনে নিয়েছে। আমি খুব খুশি। এর পরিণাম কী দাঁড়াল?

বিশ্ব দেখছে। কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হস্তিনাপুর থেকে আর্যাবর্তের লোকেরা না খেয়ে মারা যেত না।

গত ডিসেম্বরে চীনের উহানে করোনা রোগ দেখা দিয়েছে, যা ভয়ংকরভাবে ভারতকে আক্রমণ করতে পারে। সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী কংগ্রেস দলের রাহুল গান্ধী যখন এই বক্তব্য রাখছিলেন, তখন সরকারপক্ষের সদস্যরা চিৎকার করে তাঁকে বসিয়ে দেন। রাহুল তিন তিনবার বলার চেষ্টা করেন। এটাও একটা ইতিহাস। রাহুল সংসদ থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের তাঁর বক্তব্য বিস্তারিতভাবে বলেছিলেন। ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন ২০ মার্চ সাংবাদিক বৈঠক করে স্বীকার করেন, নোভেল করোনাভাইরাস কভিড-১৯ ভারতকে গ্রাস করতে চলেছে, সেটা তিনি জানতে পারেন ১৭ মার্চ। কেন ৮ তারিখে রাহুলকে বক্তব্য রাখতে দেওয়া হলো না, তার অন্যতম প্রধান কারণ মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস শাসিত সরকারকে কিনে নেওয়ার জন্য দর-কষাকষি। ২২ জন বিধায়ককে কিনে বিমানে করে বেঙ্গালুরুর একটি পাঁচ তারা হোটেলে রাখা হয়েছিল।

কমলনাথ সরকার সংখ্যালঘু হয়ে পড়ল। বিষয়টি গড়াল দেশের শীর্ষ আদালতে। কমলনাথকে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের নির্দেশ দিলেন শীর্ষ আদালত। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সেদিকে না গিয়ে ১৬ তারিখে পদত্যাগ করলেন। ২২ জন বিধায়ক গোপনে ফিরে এসে বিজেপি সরকারে যোগ দিলেন। কমলনাথ বারবার দিল্লিকে সতর্ক করে বলেছিলেন, করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে। এখন আপনারা এই খেলা খেলবেন না।

চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। তাঁদের রাজ্য সরকার কিনতে হবে। মধ্যপ্রদেশের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পৃথ্বিরাজ চৌহান এবং একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়া আর কোনো মন্ত্রী নিয়োগ হয়নি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মধ্যপ্রদেশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ভারতে তৃতীয় স্থানে।

এই লেখা পর্যন্ত ভারতে করোনা আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৯৯ জন। মারা গেছেন চার হাজার ৭০৬ জন, সুস্থ হয়েছেন ৭১ হাজার জন। পরিস্থিতি এখানে শেষ নয়। ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া কোটি কোটি শ্রমিক সেই সব রাজ্যে আটকে পড়েন। তাঁরা দেশে ফিরতে চান। বাচ্চা ছেলে-মেয়ে কোলে নিয়ে মহিলা, অন্তঃসত্ত্বা মা শত শত মাইল হেঁটে এগোতে থাকেন। পথিমধ্যে অনেকেই মারা যান। কত লোক মারা গেছে, তার কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতি যখন ভয়ংকর রূপ নেয়, তখন আসরে নামেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সোনিয়া দাবি করেন অবিলম্বে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থা করা হোক। গেরুয়া সরকার নিশ্চুপ। দেশের ২২টি আঞ্চলিক দলের নেতাদের নিয়ে সোনিয়া গান্ধী ভিডিও কনফারেন্স করে ওই দাবি তোলেন। ২২টি দলের সব নেতাই সোনিয়ার সুরেই নিজ নিজ রাজ্যে রাস্তায় নেমে পড়েন। তখন মোদি সরকারের টনক নড়ে।

তার আগের দিন কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক সোনিয়া তনয়া প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দুই হাজার বাস ভাড়া করে দিল্লিতে দাঁড় করিয়ে রাখেন। উদ্দেশ্য, দিল্লিতে কর্মরত অন্য রাজ্যের শ্রমিকদের তাদের নিজেদের রাজ্যে পৌঁছে দেওয়া। তখন দিল্লির রাস্তায় হাজার হাজার পরিযায়ী। মোদি সরকারের মন্ত্রীরা টিভির পর্দায় অকথ্য ভাষায় গালাগাল দিতে থাকেন। উত্তর প্রদেশের আরেক গেরুয়াধারী মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, দিল্লি থেকে উত্তর প্রদেশ হয়ে কোনো রাজ্যে বাস যাবে না। পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটে। দিল্লির রাস্তায় মানুষকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করতে দেখা যায়।

দুটি ইংরেজি চ্যানেল এনডিটিভি এবং ইন্ডিয়া টুডে বারবার যোগী আদিত্য নাথের বক্তব্য টেলিকাস্ট করে। এ ঘটনার মধ্যেই দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে আর্যাবর্তের নায়ক নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করলেন, দেশের মানুষকে সাহায্য করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কেয়ার নামে একটি তহবিল গঠন করেছেন। প্রথা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীদের একটি করে প্রাণ তহবিল আছে। সেই তহবিলে ৪৮ ঘণ্টায় ১২৫ কোটি টাকা মোদি সংগ্রহ করেন। বিরোধী দল এবং বিশিষ্ট আইনজীবীরা দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থাকা সত্ত্বেও তিনি অন্য আরেকটি তহবিল গঠন করেন কী করে। সংবিধানে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশও নেই।

একটি অর্ডিন্যান্স করে মোদির বেআইনি কাজের অনুমোদন নিজেই দিয়ে দেন। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবীরা এ ব্যাপারে একটি মামলাও রুজু করেছেন। মোদির গোয়েবলসরা টিভির পর্দায় বলছেন, ওই টাকার কিছুটা তিনি খরচ করেছেন গুজরাটের করোনা আক্রান্তদের জন্য।

একই সঙ্গে করোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে অনাহার, অর্ধাহার, চিকিৎসার অভাব প্রভৃতি উপসর্গও। কোনো কোনো জায়গায় বাঁচার জন্য ৪৫ টাকার পিপিই কিট  বিক্রি হয় ২৫০ টাকায়। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিলে যে টাকা উঠেছে, তার কোনো অডিট হবে না। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, এই টাকা আসলে বিজেপি ও আরএসএস নির্বাচনী খাতে ব্যয় করবে। এই করোনার সুযোগে আমেরিকা ও গুজরাটের শিল্পপতিদের কাছে দেশের একাধিক সংস্থা বিক্রি করা হবে বলে দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন ঘোষণা করেছেন।

ভারতের প্রত্যেকটি মানুষের খাদ্যের অধিকার আছে। ইউপিএ সরকারের আসলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ‘রাইট টু ফুড’ বলে একটি আইন পাস করিয়েছিলেন। খাদ্যের অধিকার সাংবিধানিক অধিকার। ভারতে বর্তমানে আর্থিক পরিস্থিতি গত ৭০-৭২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। এপ্রিল মাস পর্যন্ত গত এক বছরে হস্তিনাপুর থেকে আর্যাবর্ত ১২ কোটি লোক রুজি-রোজগার হারিয়েছে। মে মাসের হিসাব এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদরা মোদির সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন এবং রাহুল গান্ধীর সুরে সুর মিলিয়ে বলছেন, প্রত্যেক ভুক্তভোগী মানুষকে সাড়ে সাত হাজার টাকা করে দিতে হবে ন্যায় প্রকল্পে। দেশ-বিদেশের অর্থনীতিবিদরা রাহুলের এই বক্তব্যকে মান্যতা দিয়ে বলছেন, এটাই ভারতকে বাঁচানোর উপায়।

সম্প্রতি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। তিনি প্রশ্ন করেন, একটা তত্ত্ব সর্বত্র চালানো হচ্ছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প নরেন্দ্র মোদিদের মতো স্ট্রংম্যানরাই পারেন দেশকে যাবতীয় বিপর্যয় থেকে মুক্ত করতে। এর জবাবে অভিজিৎ বলেন, শুধু ভারত বা আমেরিকা নয়, ব্রাজিলেও এই একই তত্ত্ব চালানোর চেষ্টা চলছে। এটাকে মূর্খামি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। স্ট্রংম্যান নয়, মানুষের হাতে চাই নগদ টাকা। কোনো একজন ব্যক্তি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে পারেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে চাই সাধারণ মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া। তাঁর মতে, আয়ের দিক থেকে পিছিয়ে পড়া ৬০ শতাংশ মানুষের হাতে কিছু পরিমাণ নগদ টাকা তুলে দেওয়া প্রয়োজন। অভিজিৎ বাবুর সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজনসহ একাধিক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। অথচ সাধারণ গরিব মানুষের হাতে টাকা আসা তো দূরের কথা, পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যুই ঠেকাতে পারছে না মোদি সরকার।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা