kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

করোনাকালের পরের আর্থিক সমস্যাবলি

নরিয়েল রুবিনি

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



২০০৭-২০০৯-এর অর্থনৈতিক সংকটের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা ও ঝুঁকি অনেক বেড়েছে নীতিগত ভ্রান্তির কারণে। যে কাঠামোগত সমস্যার কারণে আর্থিক সংকট এবং পরে মন্দা দেখা দিয়েছিল সেগুলোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে সরকারগুলো সমস্যা আরো বাড়িয়েছে। তারা আরেকটি সংকট অনিবার্য করে তুলেছে। এখন সেটি দেখা দিয়েছে, ঝুঁকি প্রবল হয়েছে। এর ফলে ‘মহামন্দা’ দেখা দেবে।

কভিড-১৯-এর নীতিগত প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক আর্থিক ঘাটতি বাড়ার বিষয়টি ধরা হয়েছে, যা জিডিপির ১০ শতাংশ বা তার বেশি। এমন সময়ে এটা ঘটবে যখন অনেক দেশে ঋণের মাত্রা অনেক উঁচুতে থাকবে। বাজে যে ঘটনাটি ঘটবে সেটি হলো, অনেক পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের আয় কমবে। তার মানে প্রাইভেট সেক্টরের ঋণের মাত্রাও অসহনীয় হয়ে পড়বে; গণ-খেলাপি ও দেউলিয়াত্ব দেখা দেবে।

উন্নত দেশগুলোতে কভিড-১৯ সংকটের ফলে অনেক বেশি সরকারি অর্থ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হবে এবং ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার ও সংশ্লিষ্ট পাবলিক গুডস আবশ্যক হবে, বিলাসদ্রব্য নয়। বেশির ভাগ উন্নত দেশে বয়স্ক লোক আছে, ফলে হেলথকেয়ার ও সোশ্যাল সিকিউরিটি খাতে খরচ বাড়বে। এতে ইমপ্লিসিট ডেট (রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পরিশোধের ঘোষণা) আরো বাড়বে।

মূল্যসংকোচনের বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে। গভীর মন্দার বাইরেও সরঞ্জামাদিতে (অব্যবহৃত মেশিন ও ক্যাপাসিটি) এবং শ্রমবাজারে ব্যাপক সংকট তৈরি হবে। একই সঙ্গে পণ্যদ্রব্যে যেমন—তেল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেটালে দরপতন (প্রাইস কলাপস) সৃষ্টি হবে। এতে ঋণজনিত মূল্যসংকোচন ঘটারই সম্ভাবনা। ফলে অসমর্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেহেতু মূল্য সংকোচন ঠেকাতে লড়বে এবং হঠাৎ বর্ধমান সুদের হারের ঝুঁকি ঠেকাতে চেষ্টা করবে, ফলে মুদ্রানীতি হবে অনেক বেশি অপ্রথাগত এবং সুদুরবিস্তারি। স্বল্প মেয়াদে সরকারগুলোর মনিটাইজড ফিসকাল ডেফিসিট চালু রাখার প্রয়োজন পড়বে মন্দা ও মূল্য সংকোচন এড়ানোর জন্য। শেষ পর্যন্ত ত্বরান্বিত নির্বিশ্বায়ন ও নবায়িত সংরক্ষণবাদের কারণে স্থায়ী নেতিবাচক  সাপ্লাই শক দেখা দেবে। ফলে স্থবিরাবস্থা (স্ট্যাগফ্লেশন) অনিবার্য হয়ে উঠবে। 

অর্থনীতির ব্যাপক ডিজিটাল ব্যত্যয়ী দশা দেখা দেবে। শত-লক্ষ লোক চাকরি হারাবে অথবা কম আয় করবে; আয় ও সম্পদের ব্যবধান আরো বাড়বে। ভবিষ্যৎ সাপ্লাই-চেইন শক সামাল দিতে অগ্রসর অর্থনীতির কম্পানিগুলো লো-কস্ট এলাকা থেকে উৎপাদন হাইয়ার-কস্ট ডমেস্টিক মার্কেটে আবার নিয়ে যাবে। কিন্তু এতে ঘরের শ্রমিকদের সহায়তা হবে না; বরং অটোমেশনের গতি বাড়বে, মজুরিতে নিম্নচাপ তৈরি হবে এবং পপুলিজম, জাতীয়তাবাদ ও ভিনদেশি-বিদ্বেষ বাড়বে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্বিশ্বায়নের (ডিগ্লোবালাইজেশন) কথা আসে। এ মহামারি বলকানাইজেশনের প্রবণতা ত্বরান্বিত করছে এবং খণ্ডিতকরণ ঘটাচ্ছে, অবশ্য তা আগে থেকেই ঘটছিল। বেশির ভাগ দেশ তখন তাদের শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক ধস থেকে বাঁচানোর জন্য আরো সংরক্ষণবাদী হবে। মহামারি-পরবর্তী বিশ্বে পণ্য চলাচলে, সেবায়, পুঁজিতে, শ্রমে, প্রযুক্তিতে, ডাটায় ও তথ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আসবে। এরই মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যালসে, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টে, খাদ্যে এটা ঘটছে। সরকারগুলো সংকট সাপেক্ষে রপ্তানিতে বিধি-নিষেধ আরোপ করছে; অন্য সংরক্ষণবাদী ব্যবস্থাও নিচ্ছে।

পপুলিস্ট লিডাররা আর্থিক দুর্বলতার, গণবেকারত্বের এবং বর্ধমান অসমতার সুযোগ নেয়। তখন সংকটের জন্য বিদেশিদের ওপর দোষারোপ করা হয়। খাস শ্রমিকরা এবং মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ পপুলিস্ট কথাবার্তায় বেশি আকৃষ্ট হয়, বিশেষ করে অভিবাসন ও বাণিজ্যবিষয়ক কথাবার্তায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অনড়-অচল অবস্থা দেখা দেবে। ট্রাম্প প্রশাসন এ মহামারির সব দায় চীনের ওপর চাপানোর সব চেষ্টা করছে। আর শি চিনপিংয়ের সরকার বলবে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের শান্তিপূর্ণ উত্থানে বাধা দিচ্ছে। ফলে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, ডাটা এবং মনিটারি অ্যাগ্রিমেন্টস সব ক্ষেত্রে সম্পর্কছিন্নতার প্রবণতা তীব্র হবে। ফলে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে, যুক্তরাষ্ট্র বনাম তার প্রতিপক্ষ। শুধু চীন নয়, রাশিয়া, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গেও। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে গোপন সাইবারযুদ্ধ চাঙা হবে। প্রথাগত যুদ্ধও হতে পারে। তখন মার্কিন প্রাইভেট টেক সেক্টর তার ন্যাশনাল-সিকিউরিটি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

চূড়ান্ত ঝুঁকিটি হতে পারে পরিবেশগত বিপর্যয়, যা কভিড-১৯ দেখিয়েছে। আরো বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

এসব ঝুঁকি এরই মধ্যে কভিড-১৯-এর কারণে দৃশ্যমান। এরপর আসল ঝড় শুরু হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় এক দশকের বিপর্যয়ে পড়তে পারে। হয়তো ২০৩০-এর দশকে প্রযুক্তি ও অধিকতর যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ সমস্যার অনেকগুলোর নিরসন ঘটাতে পারবে এবং আরো সহযোগিতামূলক ও টেকসই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে। আপাতত আমাদের আসন্ন মহামন্দা সামাল দিতে হবে।

লেখক : নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতির অধ্যাপক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান ইউকে

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ :

সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা