kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

স্মরণ

সাংবাদিক ফখরে আলম : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

তারিকুল ইসলাম মুকুল

২ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাংবাদিক ফখরে আলম : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

আইসিইউ আর এইচডিইউ মিলিয়ে ২২ দিনের হাসপাতালবাসে আমি ছিলাম অনেকটা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। ২৩ এপ্রিল ফজর নামাজের পর আমি জ্ঞান হারাই। আমার ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্সড হয়ে গিয়েছিল। নিউমোনিয়া ও ডায়াবেটিস বেড়ে গিয়েছিল। এমনই এক সংকটজনক সময়ে ১৪ মে সাংবাদিক হারুন জামিল সেলফোনে আমার স্ত্রীকে জানালেন, যশোরের কৃতী সাংবাদিক ফখরে আলম ভাই আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আমি তখনো অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ফখরে আলম ভাইয়ের মৃত্যুর এই খবর শুনে আমি অনেকটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ি। ২০০০ সালের মার্চ মাসের দিকে ফখরে আলম ভাইয়ের সঙ্গে আমার সরাসরি প্রথম পরিচয় হয়। ওই বছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হওয়ার সময় আমি যশোরে ছিলাম। আমাদের প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন এবং আকিজ শিল্পগোষ্ঠী বন্যায় দুর্গত মানুষের জন্য যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনায় ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালায়। আমাদের প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন থেকে আদ্-দ্বীনের কর্মীরা রাত-দিন বন্যাপ্লাবিত দুর্গম এলাকার অসহায় মানুষের পাশে ছিলেন। তখন থেকেই মূলত ফখরে আলম ভাইয়ের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আমি ফখরে আলম ভাইয়ের নাম শুনেছি। অনেক লেখা পড়েছি। ফখরে আলম ভাইয়ের লেখার স্টাইলটাই আলাদা ছিল। তাঁর ব্যতিক্রমী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। তিনি যেকোনো ঘটনা ঘটলে সরেজমিনে দেখতেন, শুনতেন এবং তা নিজের মতো করে লিখতেন। ভাইয়ের লেখায় আঞ্চলিক কথ্য ভাষার ব্যবহার বেশি ছিল। ফখরে আলম ভাইয়ের সঙ্গে ২০০০ সালের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সঙ্গে ছিল গভীর আন্তরিক সম্পর্ক। প্রায় দিনই টেলিফোনে কথা বলতাম।

২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে আমাকে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের করপোরেট অফিস ঢাকার মগবাজারে বদলি করা হয়। স্থানান্তরিত হলেও ফখরে আলম ভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। যশোরে অফিসের কাজে গেলে ভাইয়ের বাসায় যেতাম। বাসায় গেলে ভাই তাঁর বাড়ির ছাদে দীর্ঘদিন ধরে পরিচর্যাকৃত বনসাইগুলো দেখাতেন। ভাই ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমিক। গাছ লাগাতে খুব ভালোবাসতেন। তিনি ২০১৫ সালে একটি বনসাই বটগাছ আমাকে উপহার দেন, যা তাঁর কাছে দীর্ঘ ২১ বছর ছিল। ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে আমবাগান আছে। ঢাকায় আসার পরও তিনি প্রতিবছর আমার জন্য আম পাঠাতেন। বিশেষ করে ভাইয়ের বাগানের আম্রপালি ছিল খুবই মজাদার। ফখরে আলম ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০১৯ সালে তাঁর যশোরের চাঁচড়ায় নিজস্ব বাড়ির ছাদে পরিচর্যাকৃত সব বনসাই যশোরের পুলেরহাটে অবস্থিত আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিক্যাল কলেজকে উপহার দেন। মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে ‘ফখরে আলম বনসাই’ নামে এখন সব গাছ পরিচর্যা করা হচ্ছে। আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিক্যাল কলেজ, পুলেরহাট, যশোরের স্থায়ী ক্যাম্পাসে ‘সাংবাদিক ফখরে আলম’ নামে একটি লেকচার থিয়েটার আছে, যা ওই কলেজ ক্যাম্পাস উদ্বোধনের দিন ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল তিনিই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এটি ছিল একজন গুণী সাংবাদিককে তাঁর জীবদ্দশায় সম্মানিত করার আদ্-দ্বীনের একটি প্রচেষ্টা।

ফখরে আলম ভাই ব্লাড ক্যান্সারের রোগী তা ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে নিশ্চিত হয়। তিনি ক্যান্সারের জন্য মূলত ভারতে চিকিৎসা নিতেন। প্রথম দিকে তিনি কলকাতায় টাটা মেডিক্যাল সেন্টারে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. মনি চান্দির কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। পরবর্তী সময় থেকে শেষ পর্যন্ত কলকাতায় অ্যাপোলো হাসপাতালে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অনুপম চক্রপাণির তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়েছেন।

মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে ফখরে আলম ভাই অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল হঠাৎ প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হলে যশোরের কুইন্স হাসপাতালে ভর্তি হন। এ সময় তিনি চোখে দেখতে পাচ্ছিলেন না। ফখরে ভাবি আমাকে ফোন দিলে আমাদের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ডা. মিনহাজ ভাইকে কুইন্স হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ডা. মিনহাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁর দুচোখের ‘ভিশন’ চলে গেছে। এখন থেকে আর চোখে দেখতে পাবেন না। ভিসা থাকায় পরদিন ২ এপ্রিল ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত শংকর নেত্রালয় চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য চলে যান। তবে চোখের ভিশন আর তিনি ফিরে পাননি।

দোষে-গুণে মানুষ। ফখরে আলম মানবদরদি ছিলেন। অসহায়, ছিন্নমূল, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে ভাই সব সময় ছিলেন। তাঁর সাংবাদিকজীবনের লেখালেখিতে এরাই ছিল অনেকাংশজুড়ে। সমাজের অনেক অসংগতি নিয়মিত তিনি কাগজের পাতায় তুলে ধরতেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের কিভাবে মানবসম্পদে পরিণত করা যায়, তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো যায়, সেই চিন্তায় স্ব-উদ্যোগী হয়ে অনেক কাজ করেছেন এবং তাদের নিয়ে চিন্তা করতেন, স্বপ্ন দেখতেন। যাঁরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে কাজ করতেন, তাঁদের পাশে তিনি সব সময় ছিলেন। বেসরকারি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন এবং আকিজ পরিবারের সঙ্গে সাংবাদিক ফখরে আলম ভাইয়ের ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ এক অনন্য সম্পর্ক। তিনি ছিলেন আদ্-দ্বীন ও আকিজ পরিবারের একজন। আদ্-দ্বীন ও আকিজ শিল্প পরিবারকে নিয়ে অসংখ্য সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আদ্-দ্বীন দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে।

ফখরে আলম ভাই ছিলেন বহু গুণের অধিকারী। তিনি একই সঙ্গে কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। তাঁর ২২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘মা সকিনা’ অন্যতম। বইটির প্রথম প্রকাশ ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে, পরিমার্জিত সংস্করণ ২০১৪ সালের এপ্রিল এবং পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সকিনা খাতুন হলেন শেখ আকিজ উদ্দিনের সহধর্মিণী এবং আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিনের মা।

১৯৮৫-৮৬ সালে ‘রোববার’ পত্রিকায় প্রতিবেদক হিসেবে সাংবাদিকতা শুরুর মধ্য দিয়ে দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, দৈনিক মানবজমিন, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক আমাদের সময়, দৈনিক যায়যায়দিনে কাজ করেছেন। তিনি সর্বশেষ কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফখরে আলম দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে কাজ করেছেন। তিনি এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর অনুসন্ধান করে সংবাদ পরিবেশন করেছেন। কৃষিবিষয়ক সাংবাদিকতায় ফখরে আলম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সাংবাদিকতা ও বৃক্ষরোপণে দেশ-বিদেশের অনেক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

ফখরে আলম ভাই অবশেষে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি। উল্লেখ্য, ১৪ মে ২০২০ যশোর জেনারেল হাসপাতালে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে তিনি মারা যান।

লেখক : উপমহাব্যবস্থাপক, প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগ, করপোরেট অফিস, আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশন, ঢাকা

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা