kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

টাকা দিলে বাঘের চোখও মেলে!

আবদুল মান্নান

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টাকা দিলে বাঘের চোখও মেলে!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, ‘আমাকে ছাড়া সকলকে কেনা যায়।’ কথাটি যে কত বড় সত্য তা এখন সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। রমজান মাসের দু-একটি ঘটনা। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, রমজান মাসে আল্লাহ শয়তানকে কোয়ারেন্টিনে রাখেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এই পবিত্র মাসে মর্ত্যে মানুষরূপী অন্য ধরনের শয়তানের আবির্ভাব হয়, যারা কোনো জাতপাত-ধর্মের বাছবিচার না করে হরদম সবাইকে খারাপ কাজের উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করে এবং প্রায়শ সফল হয়। ঈদ উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকা বন্ধ ছিল পাঁচ দিন। আমার স্কুলজীবন থেকে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। আমাদের দেশে অনেকগুলো প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আছে। দু-একটি বাদ দিলে সব চ্যানেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবর পরিবেশন থেকে বিরত থাকে নানা অজুহাতে। খবরের জন্য পত্রিকা আমার একমাত্র ভরসা। করোনাজনিত কারণে গত মার্চের শেষ সপ্তাহে আমার এলাকায় হকাররা পত্রিকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, ব্যতিক্রম ছিল সম্ভবত আমার হকার। একদিন হকার তো বলেই দিল, আমি পত্রিকা না নিলে সে নাকি বাড়ি চলে যেত। সে আমাকে ডজনখানেক পত্রিকা দেয়, যার বেশির ভাগই সৌজন্য সংখ্যা। ঈদ শেষে শুক্রবার পত্রিকা দিতে এসে হকার জানাল, বাড়ি না গিয়ে সে ভালোই করেছে। কারণ তাদের বাড়িতে ছয়জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

আমার কন্যা স্যানিটাইজার ধুয়ে-মুছে যখন একটা পত্রিকা হাতে দিল তখন প্রথম পৃষ্ঠার মূল খবরটা দেখে কিছুটা স্তম্ভিত হলেও অবাক হইনি। একটি খবরে বলা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে চার্টার্ড বিমানে লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান ও তাঁর স্ত্রী। লন্ডনে মোরশেদ খানের ছেলে ফয়সাল মোরশেদ খান সপরিবারে বসবাস করেন। মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা ছিল এবং দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। টাকা থাকলে বাঘের চোখও পাওয়া যায়।

দেশ ছাড়ার আগে ইমিগ্রেশনের সব কর্মসূচি নির্বিঘ্নে সেরেছেন মোরশেদ খান ও তাঁর স্ত্রী। সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি ছাড়া তাদের পক্ষে বিমানবন্দর ত্যাগ করা সম্ভব ছিল না। রীতিমতো থ্রিলার আর কী! টাকা থাকলে কি না হয়!

কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একজন অফিস সহকারী মাত্র ২০ হাজার টাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল একজন স্বঘোষিত ছাত্রনেতার কাছে পাচার করে দিয়েছিলেন, যার ফলে খোদ প্রধানমন্ত্রীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তির সহায়তা ছাড়া এমন একটি দুঃসাহসী কাজ করা একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী বা ওই তথাকথিত ছাত্রনেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বোর্ড সদস্যের বিরুদ্ধে এমন জালিয়াতির সংবাদ অসংখ্য আছে। উপ-উপাচার্য নিয়োগের ব্যাপারে এমন একটা কেলেঙ্কারি ঘটতে যাচ্ছিল কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দৃঢ়তার কারণে তা ঘটতে পারেনি। মঞ্জুরি কমিশনে আমার দায়িত্ব পালনের সময় একজন বোর্ড সদস্য তো প্রকাশ্যে বলেই ফেলেছিলেন, টাকা দিলে সব কেনা যায়। শুধু চেয়ারম্যানকে কেনা গেল না।

প্রধানমন্ত্রী হয়তো জানেন না, সরকারের কত পদপদবি নিলামে বেচাবিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠান দখল হওয়ার নজিরও আছে। দখলকারী বেশ ক্ষমতাশালী। এর ফলে যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী বা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী তাঁরা প্রধানমন্ত্রী থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন, অভিমান করেছেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বেঈমানি করেন না। এটা প্রধানমন্ত্রীর নিজের কথা।

দেশে করোনা নামের অতিমারি (ঢ়ধহফবসরপ) হানা দিল মার্চের প্রথম সপ্তাহে। এখন সবাই জানেন এই ভয়ংকর অতিমারির উৎপত্তিস্থল চীনের উহান প্রদেশে। এখন ২১২ দেশে এর রমরমা রাজত্ব চলছে। রাজা-উজির কোনো বাছবিচার নেই। ধরছে, অনেককে মারছে। বাংলাদেশে নিজ থেকে এই অতিমারি হয়তো একসময় আসত; কিন্তু আমরাই আগ বাড়িয়ে ইতালি থেকে বিমান ভর্তি করে শ তিনেক বঙ্গসন্তানকে করোনাসহ (অনেককে) নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলাম কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। তাঁরা নাকি সেখানে বেশ অর্থকষ্টে ছিলেন। কিন্তু বিমানে ফিরতি টিকিটসহ একেকজন কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা খরচ করেছেন, যা দিয়ে সেই দেশে দুই মাস থাকা যেত। ইতালির মতো শীতপ্রধান দেশে যেসব বাঙালি থাকেন তাঁরা দেশে আসেন সাধারণত শীতের সময়। কারণ তখন সেখানে সব কিছুর ব্যয় বেড়ে যায়, বিশেষ করে বিদ্যুতের বিল। রুম গরম করার জন্য বিদ্যুতের বিল বেশ বড় আকারের হয়। সেই বিলের টাকা দিয়ে অনেকে দেশে আসেন। এবার মার্চের প্রথম দিকে যখন তাঁরা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন ইতালি করোনায় সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত। তখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মারা গিয়েছে। যেসব বাঙলি ইতালি বা অন্য দেশে থাকেন, তাঁরা বেশির ভাগ ছোটখাটো চাকরি করেন, যেমন—রেস্টুুরেন্ট, মুদির দোকান, ডেলিভারি বয়, ট্যাক্সি চালক ইত্যাদি। আর যাঁদের চাকরি থাকে না তাঁরা অনেকেই পর্যটকদের কাছে বাদাম বিক্রি করেন কবুতরকে খাওয়ানোর জন্য। কেউ কেউ ফুলও বিক্রি করেন, আর কেউ বা টুরিস্ট গাইড। কোনো কাজকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। মার্চের প্রথম দিকে তাঁরা যখন দেশে এলেন, সরকার অনেকটা চটজলদি একটা কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা নিল বিমানবন্দরের নিকটস্থ হাজি ক্যাম্পে। ইতালিফেরত যাত্রীরা মনে করেছিলেন, সেখানে ফাইভস্টার হোটেলের সুবিধা ভোগ করবেন। কিন্তু এই ব্যবস্থা ছিল সাময়িক। অস্বীকার করার উপায় নেই যে পূর্বের অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে সেখানে অব্যবস্থাপনা ছিল। যাত্রীদের বলা হলো এটি সাময়িক ব্যবস্থা। পরীক্ষা করে যাঁদের কোনো সমস্যা নেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে। সমস্যা থাকলে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে। তা শোনার পর এক শ্রেণির যাত্রীর সেখানে সেই কী হুংকার! এক তরুণ তো ভুল ইংরেজিতে বাংলাদেশেরই চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিলেন। বারবার বলছিলেন, তিনি নাকি ইতালির পাসপোর্টধারী। তাঁকে তখনই তাঁর দেশে ফেরত পাঠানো উচিত ছিল। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। পরে জানা গেছে, ইতালিফেরত একজনের কাছ থেকে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। ওই ইতালির নাগরিক নাকি দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সরকারি দলের এক নেতার হেফাজতে আছেন।

দিন যতই যেতে থাকে পরিস্থিতি ততই খারাপ হতে থাকে। ২৬শে মার্চ সরকার দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করল, লকডাউন বা কারফিউ না, যা অন্য দেশে করেছে। ছুটি মানে অফিস-আদালত বন্ধ। অন্য সব খোলা থাকতে পারবে। মানুষ বিষয়টাকে সেভাবেই নিয়েছে। বেশ কিছুদিন অফিস আর স্কুল-কলেজে যাওয়া ছাড়া সবার কাজকারবার আগের মতোই চলল। ছুটি পেয়ে কেউ কেউ কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান বেড়াতে গেল পরিবার নিয়ে। কেউ গেল গ্রামের বাড়ি। বিয়ের পিঁড়িতে বসল অনেকে। খুনখারাবিও বন্ধ থাকল না। তারপর সরকার ঘোষণা করল, ছুটি বাড়বে কিন্তু এক অজ্ঞাত কারণে ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকল। এর সঙ্গে যোগ হলো রাস্তার পাশে চুলকানির মলম বিক্রি করা কিছু বেকার স্বঘোষিত ইসলামী চিন্তাবিদ। তাঁরা তাঁদের কিছু অন্ধ ভক্তকে জানিয়ে দিলেন করোনা মুসলমানদের জন্য আসেনি, এসেছে ইহুদি, খ্রিস্টানদের জন্য। করোনা একটি অতি সংক্রামক রোগ, একজনের কারণে ৪০৬ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারেন বলে গবেষকরা বলছেন। বলা হলো, একজন থেকে আরেকজন কমপক্ষে তিন ফিট দূরত্ব রাখবেন। কে শোনে কার কথা।

সরকার একবার বলে, ঈদের সময় যে যেখানে আছে সেখানে থাকবে। কেউ বাড়ি যাবে না। নতুন পুলিশ মহাপরিদর্শক বেশ জোর গলায় জানালেন, যদি ঈদের ছুটিতে নিজ আবাস্থল ছাড়েন, তাহলে ঈদ করতে হবে রাস্তায়। কয়েক দিন পর সরকার ঘোষণা করল, ঈদে বাড়ি যান (সঙ্গে করোনারভাইরাসও নিয়ে যান)। ছুটল মানুষ বাড়ির দিকে হাজারে হাজারে। সরকার ঘোষণা করল, ৩১ তারিখ থেকে অফিস-আদালত খোলা। কিন্তু যাঁরা দেশের বাড়িতে গিয়ে করোনার চাষ করে এসেছেন, তাঁরা কি এসেই অফিসে ঢুকে যাবেন? তাঁদের কি ১৪ দিন সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে না? সরকার আরো জানাল, গণপরিবহনে চড়া বা অফিস করা হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। প্রশ্ন—তা মনিটর করবে কে? অনেকে বললেন, এটা এক ধরনের মসকরা।

প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসক ড. এ বি এম আবদুল্লাহসহ দেশের সংশ্লিষ্ট সব বিশেষজ্ঞ যখন বললেন, এখন বাংলাদেশে করোনা বিস্তার ও মৃত্যুর হার তুঙ্গে, তখন দেশে অন্তত ১০ দিনের জন্য কারফিউ জারি করা উচিত। তখন ঘটনা ঘটল উল্টো। আমি সব সময় ষড়যন্ত্রতত্ত্বে খুব বেশি বিশ্বাস করি না। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে কিছু একটা হচ্ছে। শেখ হাসিনার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রশ্ন—এসব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কে নিচ্ছেন? আর যদি প্রধানমন্ত্রী নেন, তাহলে তাঁকে কি প্রকৃত সব তথ্য দেওয়া হচ্ছে?

 

 লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা