kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

স্মরণ

রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ও বাংলাদেশ

লে. জে. মাহবুবুর রহমান (অব.)

৩০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ও বাংলাদেশ

আজ শহীদ জিয়ার মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করছি এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে, যাঁকে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে মর্মান্তিকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। তাঁর অপরাধ, তিনি দেশকে বুক উজাড় করে ভালোবেসেছিলেন। ভালোবেসেছিলেন দেশের মাটি ও মানুষকে। তাঁর অপরাধ, তিনি জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে নিশ্চিত করতে কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। জাতিকে একটি মর্যাদাবান ও গৌরবোজ্জ্বল সোপানে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। ৩৯ বছর আগে ঠিক আজকের এই দিনে ঘাতকরা এই সিংহমানবকে স্টেনের এক ঝাঁক বুলেটের গুলিতে স্তব্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশকে চিরদিনের জন্য দুর্বল ও পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল। তারা জাতির সম্মান ও গৌরব ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। জাতিকে এক নৈরাজ্যের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল।

জিয়া সম্পর্কে কোনো বলাই যথেষ্ট বলা নয়। জিয়া একটি ইতিহাস। জিয়া একটি প্রতিষ্ঠান। জিয়া একটি বৈপ্লবিক চেতনা। জিয়া একটি রাজনৈতিক দর্শন। আজ জিয়া সম্পর্কে দুটি কথা বলতে গিয়ে প্রথমে সৈনিক জিয়ার কথা বলতে চাই। আমরা দেখেছি, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে লাহোর সীমান্তের খেমকারান সেক্টরে প্রচণ্ড যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলাফলের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগ্য অনেকখানি নির্ভর করছে। সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি ডিভিশনের ইউনিট প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এটি ছিল বেশির ভাগ বাঙালি সৈনিক ও অফিসার নিয়ে গঠিত। এই ব্যাটালিয়নের অধিনায়কও ছিলেন একজন বাঙালি। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রচণ্ড সাহসিকতার সঙ্গে জীবন-মরণ সংকল্প নিয়ে চরম রণদক্ষতা প্রদর্শন করে সেই সেক্টরে ভারতের আগ্রাসন ঠেকিয়ে দেয়। গোটা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে রেজিমেন্টের কৃতিত্ব কিংবদন্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাপ্টেন জিয়া এই রেজিমেন্টের (প্রথম ইস্ট বেঙ্গল) ছিলেন কম্পানি অধিনায়ক। তাঁর কম্পানি এই কৃতিত্বের এক বড় দাবিদার।

এরপর ১৯৭১। ক্যাপ্টেন জিয়া থেকে মেজর জিয়া। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের বাংলাদেশ। গোটা দেশে টানটান উত্তেজনা। চারদিকে প্রতিবাদ আর বিক্ষোভের আগুন। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার স্পৃহায় পাগলপারা। এদিকে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যায় মত্ত। মানুষ বিভ্রান্ত ও দিশাহারা। নেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা। নেই স্থির কোনো লক্ষ্য, বিশদ কর্মসূচি ও পরিকল্পনা। এমনই এক চরম সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্বের এক মহাশূন্যতায় ইথারে ভেসে এলো, ‘...আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি...’। তিনি গোটা জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে আহ্বান জানালেন। শুধু ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, তিনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন, ফোর্স সংগঠিত করলেন, যুদ্ধাস্ত্র ও রণসম্ভার সংগ্রহ করলেন এবং প্রচণ্ড সাহসিকতায় যুদ্ধ পরিচালনা করলেন। দেশকে স্বাধীন করতে এক বড় ভূমিকা রাখলেন।

সৈনিক জিয়া মহান। বৃহত্তর ক্যানভাসে জাতীয় পরিসরে রাষ্ট্রনায়ক জিয়া আরো অনেক মহান, মহত্তর। ১৯৭৫ সালে এক মহা অস্থিরতার মধ্যে জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। জাতির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগ নেমে আসে। রাষ্ট্রব্যবস্থা চরম সংকটাপন্ন হয়। জাতি হারায় মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ঘটনার ক্রমবিবর্তনে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি জাতীয় অঙ্গনে অনেক উদ্বিগ্নতা, অনিশ্চয়তা। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে। আর এরই উত্তাল তরঙ্গমালার চূড়ায় আরোহণ করে জাতির সেই মহাশূন্যতায় জেনারেল জিয়া উঠে আসেন জাতির শীর্ষ নেতৃত্বের পাদপ্রদীপে।

জিয়া গণতন্ত্রের প্রাণপুরুষ। আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি। তাঁর ছিল সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি। তিনি ছিলেন এক ভিশনারি-এক স্বপ্নদ্রষ্টা। কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি জাতীয় কবির মর্যাদা দিলেন। নজরুলও সৈনিক ছিলেন। নজরুল লিখেছেন, ‘চির উন্নত মমশির, শির নিহারী আমারি, নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রীর।’ জিয়া বিশ্বাস করতেন, জাতীয় কবির এ মহান অভিব্যক্তি বাঙালি জাতির সব মানুষের জন্য, গোটা বাংলাদেশের জন্য। নিজের দুই শক্ত পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বসভায় হিমালয়ের উচ্চতায় দৃশ্যমান থাকবে বাংলাদেশের শির। জিয়া জাতিকে একটি সত্যিকার গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। আনতে চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি। দিতে চেয়েছিলেন জাতিকে সম্মান আর গৌরব—সেই মুক্তিযুদ্ধের ব্র্যাকেটবন্দি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, গণচীন আর ভিয়েতনামের মতো।

জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার সময়কাল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত—মাত্র পাঁচ বছর বা একটু বেশি। এই স্বল্প সময়ে তিনি যুগান্তকারী সব বড় কাজ করে গেছেন। তাঁর সঙ্গে আমি ভারতবর্ষের ইতিহাসের সেই পাঠান সম্রাট শের শাহর অনেক মিল খুঁজে পাই। শের শাহর শাসনকাল ছিল এমনই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কিন্তু জনকল্যাণে, সাধারণ মানুষের মঙ্গলে তাঁর কীর্তিগুলো ছিল যেমন অভিনব, তেমনি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাবের, যা আজও তাঁর দূরদর্শিতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে, প্রতিটি বিষয়ে একটি বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, নারী-শিশু—সব কিছুতেই একটা বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন। গোটা জাতিকে তিনি একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। একটি দৃঢ় জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। পরিচয় সংকটে আক্রান্ত হীনম্মন্যতায় ভুগছে তখন জাতি। তিনি তাকে তার সত্যিকারের পরিচয়, তার লুপ্ত বিস্মৃত স্বকীয়তার মহান পরিচিতি উন্মোচন করে দিতে পেরেছিলেন। আর সে পরিচিতি বাংলাদেশের আবহমানকালের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন, তারই আবিষ্কার তিনি ঘটিয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত তাঁর মন-মনন। তাঁর চেতনা ও রাজনৈতিক দর্শন।

আজ শহীদ জিয়ার শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁকে গভীরভাবে স্মরণ করছি।

 

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা