kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

বিশ্বায়নের ইতি ঘটাবে কভিড-১৯!

অনলাইন থেকে

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাভাইরাস মহামারি সংক্রমণের আগে থেকেই বিশ্বায়ন নিয়ে সংকট ছিল। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ এবং অর্থিক সংঘাতের কারণে কয়েক দশক ধরে বিশ্ব শাসন করা এই উন্মুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থা করোনা আসার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন লকডাউন, বন্ধ করে দেওয়া সীমান্ত এবং বিঘ্নিত বাণিজ্যের কারণে আরো সঙ্গিন অবস্থায় পড়েছে বিশ্বায়ন। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় হিথ্রো বিমানবন্দরে যাত্রীর সংখ্যা কমেছে ৯৭ শতাংশ। মেক্সিকোর গাড়ি রপ্তানি এপ্রিলে ৯০ শতাংশ পড়ে গেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে কন্টেইনারবাহী জাহাজের আনাগোনা শুধু মে মাসেই বাতিল হয়েছে ২১ শতাংশ। অর্থনীতিগুলো খুলে দেওয়ার পর এসব তৎপরতা কিছুটা বাড়বে। তবে মুক্তভাবে চলাফেরা করা এবং মুক্ত বাণিজ্যের স্বস্তিকর বিশ্বে আমরা খুব শিগগিরই ফিরতে পারব—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এই মহামারি ভ্রমণ ও অভিবাসন কমিয়ে মানুষকে আত্মমুখী করে তুলবে। এই প্রবণতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ধীর করবে, ঝুঁকি বাড়িয়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়াবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে। চীন এখন বিশ্বের প্রধান কারখানায় পরিণত হয়েছে। সীমান্তগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে মানুষ আর পণ্যের চলাচল, রাজধানী আর তথ্যের জন্য। ২০০৮ সালে লেম্যান ব্রাদার্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বহু ব্যাংক ও বহুজাতিক কম্পানি তাদের তৎপরতার রাশ টেনে ধরে। এর পরই আসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য লড়াই। গত বছর উহানে যখন ভাইরাস ছড়াচ্ছিল তখন চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক ছিল ১৯৯৩ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ।

এশিয়া থেকে পশ্চিমের দিকে এক ধরনের বিপর্যয় ছড়াতে শুরু করে গত জানুয়ারি থেকে। কারখানা, দোকান ও দপ্তরগুলো বন্ধ হতে থাকে। চাহিদায় ধস নামে। সব পণ্যের ক্ষেত্রেই অবশ্য এ কথা সত্য নয়। খাদ্যের চাহিদা রয়েছে। অ্যাপল জানিয়েছে, তারা আইফোন উৎপাদন অব্যাহত রাখবে। তবে চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া চীনের পণ্য রপ্তানি এখনো বন্ধ। তবে এই পরিস্থিতির সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ। এ বছরই বৈশ্বিক বাণিজ্য কমবে ১০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত। এ মাসের প্রথম ১০ দিনে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্য গত বছরের তুলনায় কমেছে ৪৬ শতাংশ। ১৯৬৭ সালের পর এত দুরবস্থা আর দেখা যায়নি।

বিশ্বজুড়ে শাসনব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য চলছে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। কোয়ারেন্টিনের নিয়ম নিয়ে খাবি খাচ্ছে ফ্রান্স ও ব্রিটেন। ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল নিয়ে তদন্তের দাবি করায় অস্ট্রেলিয়ার ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে চীন। আর হোয়াইট হাউস এখনো বাণিজ্য নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি অবস্থায়ই রয়ে গেছে। বিশ্বজুড়েই বিশ্বায়নের বিপক্ষে মত প্রবল হচ্ছে। স্বাস্থ্য সেবা সরঞ্জামের প্রাপ্যতা আমদানির ওপর নির্ভরশীল বা ফসল ফলানো, গৃহস্থালির নানা কাজের জন্য অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভশীলতাকে মানুষ আর সুনজরে দেখছে না।

সবে তো শুরু। চীনের বাইরে তথ্যপ্রবাহ প্রায় মুক্ত হলেও মানুষ বা পণ্যের চলাচল এবং রাজধানীগুলো এখনো উন্মুক্ত নয়। প্রথমেই দেখা যাক মানুষ কী ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে—ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসনের কাটছাঁট করেছেন। তাদের যুক্তি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকানদেরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। বাকি দেশগুলোও একই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। ভ্রমণের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে কাজের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ অবরুদ্ধ সীমান্তের মধ্যে বাস করছে। বহু দেশই হয়তো একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণকারী রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের চলাচল শুরু করবে। যেমন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড বা তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে চলাচল শুরু হতে পারে। তবে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে চলাচলের এই সংকট রয়েই যাবে। বিমান নির্মাতা কম্পানি এয়ারবাস উৎপাদন কমিয়েছে। বিশ্বায়নের প্রতীক এমিরেটস জানিয়েছে, ২০২২ সালের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ তারা দেখছে না।

মূলধন প্রবাহতেও সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ডুবতে বসেছে। এ বছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা বিনিয়োগ কমেছে ৪০ কোটি ডলার। দুই বছর আগের তুলনায় এই পরিমাণ ৬০ শতাংশ কম। এ বছর বহুজাতিক কম্পানিগুলোও হয়তো তাদের বৈদেশিক বিনিয়োগ এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেলবে।

নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দরিদ্র দেশগুলো হিমশিম খাবে। ধনী দেশগুলোতে জীবনযাপন ব্যয় বাড়বে, জীবনও আগের মতো মুক্ত থাকবে না। টিকাদান কর্মসূচির মতো প্রকল্পগুলোতে অর্থের জোগান দেওয়া বা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে বাড়তি প্রাণোদনা দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। 

বিশ্বায়নের ওপর বড় ধরনের আঘাত এগুলো। বিশ্বায়নকে এবার আমাদের বিদায় জানাতেই হবে। তার জায়গা দখল করবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ।

 

সূত্র : ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা