kalerkantho

রবিবার । ২৮ আষাঢ় ১৪২৭। ১২ জুলাই ২০২০। ২০ জিলকদ ১৪৪১

ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনার দায় কার?

ফরিদুর রহমান

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনার দায় কার?

ঈদের ছুটির আগের এক দিন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঠা ঠা রোদে একটি ব্যাংকের সামনে লম্বা লাইনের মাঝামাঝি এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন। মুখে মাস্ক পরা থাকলেও অবসরপ্রাপ্ত ওই সরকারি কর্মকর্তাকে চিনতে পেরে কাছাকাছি এসে অন্তত এক মিটার দূরত্ব রেখে কুশল জিজ্ঞেস করলাম। তিনি হাতে ধরা দুই ব্যাংকের তিনটি চেক দেখিয়ে বললেন, ‘গত ৪ তারিখ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত দুই সপ্তাহে তিনবার বেরিয়ে আজ এই শাখাটি খোলা পেয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি, তাও শেষ পর্যন্ত টাকা তুলতে পারব কি না জানি না।’  আমার নিজের অবস্থা প্রায় তাঁর মতো হলেও সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘একটু খোঁজখবর নিয়ে বের হলে হতো কিংবা অন্য কাউকে পাঠাতে পারতেন।’ তাঁর কথা থেকে জানলাম, আগের দুই দিন ব্যাংকের শাখায় সশরীরে উপস্থিত হওয়ার পরে নিশ্চিত হয়েই আজ এসেছেন এবং বাসায় অসুস্থ স্ত্রী ছাড়া পাঠানোর মতো অন্য কেউই নেই।

শুধু অবসরপ্রাপ্ত এই বয়োবৃদ্ধ সরকারি কর্মকর্তাই নন, বিভিন্ন ব্যাংকের অসংখ্য গ্রাহক সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে কোন ব্যাংকের কোন শাখা কিভারে খোলা থাকবে তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। হাতে গোনা দুই-একটি ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন শাখার সময়সূচি প্রকাশ করেছে অথবা এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রাহকদের সময়সূচি জানিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংকের দরজায় উপস্থিত হয়ে বন্ধের নোটিশ পড়ে আসতে হয়েছে। অনেক ব্যাংকের কোনো কোনো শাখা বন্ধ দরজায় নোটিশ টানানোর কষ্টটুকুও করেনি। ফলে ব্যাংকের খোলা-বন্ধের সময়সূচি নিয়ে গ্রাহকের ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে প্রশ্নাতীতভাবেই ব্যবস্থাপনার অযোগ্যতা এবং পেশাদারিত্বের অভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে।   

ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে আসা গ্রাহকদের অনেকেই মনে করেন, ব্যাংকিং ক্ষেত্রে আরেকটি বড় ভুল ছিল আংশিক বা সীমিত আকারে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে সরকার যখন ঈদের কেনাকাটার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে শপিং মল এবং বিপণিবিতান খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সেই সময় বিভিন্ন এলাকায় ব্যাংকের বহুসংখ্যক শাখা বন্ধ রাখা বা সাপ্তাহিক এক-দুদিন খোলা রাখার সিদ্ধান্ত যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে তা ব্যাংকের নির্ধারিত শাখাগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় এড়ানোর কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলা বড় রকমের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ফলে গ্রাহকসেবায় উন্নতি লক্ষ করা গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই মেনে নিতে হয়েছে ‘সার্ভার ডাউন’-এর বিপত্তি। গ্রাহকদের পক্ষে আরো একটি বড় অভিযোগ বেশির ভাগ ব্যাংকের একটি ‘হেল্প লাইন’ থাকলেও সেখানে ফোন করে বা নির্ধারিত নম্বরে এসএমএস পাঠিয়ে প্রায় কখনোই কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্দেশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অগ্রাহ্য করা হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড এবং ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রে। করোনাজনিত সংকটকালে যেকোনো ব্যাংক থেকে ইস্যুকৃত ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যেকোনো ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে বাড়তি ফি আদায় করার কথা নয়; কিন্তু একাধিক এটিএম বুথে অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে দেখা গেছে আগের মতোই নির্ধারিত হারে ফি কেটে নেওয়া হয়েছে। তবে এসব ব্যাংককে সবচেয়ে বেশি তৎপর দেখা যাচ্ছে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া আদায়ের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুসারে ৩১ মে পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের অপরিশোধিত বিলের জন্য কোনো লেট পেমেন্ট ফি এবং সুদ আদায় করার কথা নয়। কিন্তু বেশির ভাগ ব্যাংকই আগের মাসের বিলের সঙ্গে লেট ফি যোগ করে নতুন বিল পাঠিয়ে দিয়েছে।

ক্রেডিট কার্ডের অনিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কল সেন্টারে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকের পক্ষ থেকে উত্তরদাতা তাঁর অজ্ঞতা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাঁরা কোনো নির্দেশনা পাননি। অন্যদিকে আগের মাসের অপরিশোধিত বিলের জন্য তাগাদার পর তাগাদা দিয়ে গ্রাহকদের অতিষ্ঠ করে ফেলেছে কয়েকটি ব্যাংক। ই-মেইল এবং এসএমএস পাঠিয়েও বকেয়া আদায় করতে না পেরে সরাসরি ফোন করেও বিল পরিশোধের তাগিদ দিয়ে চলেছে তারা। অব্যস্থাপনার আরেকটি উদাহরণ হলো, বকেয়া টাকা ড্রপবক্সে ফেলতে যাওয়া গ্রাহকের অনেকেই ড্রপবক্স বন্ধ পেয়েছেন এবং অনেক বুথে খুলে রাখা ড্রপবক্স নষ্ট হলেও তা মেরামত করে ব্যবহারযোগ্য করার ক্ষেত্রেও জরুরি উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। তাগাদা দেওয়া ব্যাংকগুলোর অনেক শাখা বন্ধ থাকায় ইচ্ছা থাকলেও গ্রাহক তাঁদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন না বলেও জানা গেছে। 

নির্ধারিত অনেক ব্যাংকের শাখা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পরিবার সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকরাও বিড়ম্বনায় পড়েছেন। নিয়মিত আয় হিসাবে যারা সঞ্চয়পত্রের মাসিক বা ত্রৈমাসিক মুনাফার ওপর নির্ভরশীল, যথা সময়ে টাকা তুলতে না পারায় বাড়ি ভাড়াসহ দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তারা চরম সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।

পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় এই যখন অবস্থা, তখন একজন সাধারণ গ্রাহক হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ব্যাংক পরিচালনা সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো কারা গ্রহণ করেন? ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কোনো নীতিনির্দেশনা দিয়ে থাকে কোনো ব্যাংক কি তা অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা রাখে? যোগসাজশে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকের নির্লিপ্ততা, বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচার, বিত্তবানের সুদ মওকুফ এবং ঋণের দায়ে বিত্তহীনের কোমরে দড়ি পরানোর অনেক কাহিনি এ দেশের মানুষের কাছে নিত্যদিনের  ঘটনা। কিন্তু একটি বৈশ্বিক সংকটের কালে জনস্বার্থে কিছু নীতি নির্দেশ প্রণয়ন ও তা কার্যকর করার ব্যবস্থাও যদি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানটি যোগ্যতার সঙ্গে করতে না পারে এবং নীতি-নির্দেশ অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নিশ্চয়ই কোনো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না।   

     

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান)

বাংলাদেশ টেলিভিশন 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা