kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

টেকসই উন্নত বাংলাদেশের পূর্বশর্ত সমন্বিত গবেষণা নীতিমালা

তৌহিদ এলাহী

২১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টেকসই উন্নত বাংলাদেশের পূর্বশর্ত সমন্বিত গবেষণা নীতিমালা

আজ থেকে ১০-১২ হাজার বছর আগে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমেই মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার শুরু করে। এরপর নানা সভ্যতার বিকাশ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জয়যাত্রা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে এগিয়ে গেছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের এই সভ্যতাগুলো জীবন-জীবিকা, যুদ্ধজয়ের নেশা ও প্রতিভাবান মানুষের ছোঁয়ায় নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করে দুনিয়াকে সামনের দিকে পরিচালিত করেছে। যুগে যুগে নানা সভ্যতা, যেমন—রোমান, ইসলামী কিংবা শিল্প বিপ্লবোত্তর আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা বিশ্বজোড়া তাদের সামরিক, আর্থিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছে। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎপার্ষে রাষ্ট্রের নীতি বা পলিসিগত ভূমিকা প্রবল হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।

পঞ্চাশের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে পরাশক্তিগুলো নিজেদের নানাভাবে গুছিয়ে ও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ ৪ অক্টোবর ১৯৫৭ তারিখে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সারা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেয় মহাশূন্যে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুিনক-১ উৎক্ষপণের মাধ্যমে। সারা দুনিয়া তাক লাগলেও মার্কিনরা হয়ে যায় ভীত ও উৎপাণ্ঠিত—জ্ঞান ও বিজ্ঞানে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব এই বুঝি হাতের মুঠো ফসকে বের হয়ে গেল। অধুনা বিশ্বে যেকোনো ঘটনার চেয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্পুিনক উৎক্ষপণ অধিক তাৎপর্যপূর্ণ; যদিও এর ফলাফল বেশির ভাগ আবর্তিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে। তখনই দেশটি বুঝতে পারে, শুধু বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণাই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা ও টেকসই করতে পারে। ফলে একমুহূর্ত দেরি না করে ১৯৫৮ সালে গঠন করে নাসা  (NASA)| প্রতিরক্ষা ও উন্নততর গবেষণার জন্য চালু করে ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স এডুকেশন অ্যাক্ট’ ও ‘অ্যাডভান্স রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি’।

বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও গবেষণার এই অভিজ্ঞতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, পরাশক্তি হিসেবে এগিয়ে থাকা চীন, জাপান, জার্মানি, ইংল্যান্ড, হালের দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া—সবার। দেশ হিসেবে যদি আমরা তাদের পর্যায়ে পৌঁছতে চাই, সমন্বিত বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণা আইন ও নীতিমালার বিকল্প নেই। যেহেতু সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাই এ উন্নয়ন বাস্তবায়ন ও টেকসই করতে গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের উপযোগী নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। কেননা সব জ্ঞান ও প্রযুক্তির জন্য অন্যদের ওপর নির্ভর করে বা ধার করে খুব বেশি এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। এগিয়ে গেলেও টিকে থাকা অবাস্তব। আর গবেষণা বা উন্নয়নের সূত্রটি ধরিয়ে দিতে হয় সরকারকেই, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যায় সরকারের খরচে বের করে আনা তত্ত্বীয় জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। যেমন—বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষপণকারী প্রতিষ্ঠান এলন মাস্কের স্পেসএক্স বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলেও এদের পথ দেখিয়েছে সরকারি খরচে চালানো নাসার মতো প্রতিষ্ঠান। আর সারা দুনিয়াতেই বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সূতিকাগার হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর বাইরেও সরকারি গবেষণাগার বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ প্রয়োজনে গবেষণা করে থাকে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করে। তাই বাংলাদেশেও শুরু করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের টাকায় চলে। এ দেশে সরকারের নিজের তেমন কোনো গবেষণাগার নেই। তাই প্রয়োজনমতো সরকার বিভিন্ন অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করতে পারে। অর্থ দিলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাতারাতি কোনো বৈপ্লবিক ফল এনে দেবে, তা কিন্তু নয়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এবং দেশের গবেষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থা রাখতে হবে।

আস্থা রাখলে যে ভালো ফল পাওয়া যায়, সেটি এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যে।

বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি পলিসি একক কোনো আইন বা নীতিমালা দ্বারা সম্ভব নয়। সরকারের নানা বিভাগের সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন নতুন পলিসি তৈরি বা সংশোধন করে দেশকে একটি গবেষণা সংস্কৃতি উপহার দেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমাদের দেশের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ। সারা দুনিয়াতেই ভালো গবেষণা অভিজ্ঞতাসহ পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও এখানে মাস্টার্স পাস করার পরই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ দক্ষ গবেষক ও গবেষণা পরিচালক পায় না। প্রয়োজনে বেতন স্কেলে দু-এক ধাপ এগিয়ে দিয়ে দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করলে অনেক সমস্যার সমাধান একসঙ্গে পাওয়া যাবে। দেশের ভেতর পিএইচডি লেভেলের গবেষণা বেড়ে যাবে, পাশাপাশি গবেষণায় দক্ষ ব্যক্তিদের সরাসরি শিক্ষক হিসেবে পাওয়া যাবে।

এরই মধ্যে গবেষণার জন্য যে অল্পবিস্তর টাকা সরকারিভাবে দেওয়া হয় সেটার বাছাই, গ্রহণ, মূল্যায়ন, অগ্রগতি ও কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য গবেষক ও সরকারি ব্যক্তিবর্গ থেকে বাছাই করে একটি বিশেষ দলকে উন্নততর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরকার প্রদত্ত অর্থের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি ‘সায়েন্স ডিপ্লোমেসি’ ও ‘টেকনোলজি ডিপ্লোমেসি’তে দেশের দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিজ্ঞান গবেষণায় উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে, নতুন প্রযুক্তি আমদানি বা গ্রহণ করতে, নিজস্ব প্রযুক্তি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে এই কূটনীতি সামনের দিনগুলোতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। নিকট ভবিষ্যতেই ‘ফাইভজি’ আমদানি কিংবা দেশের উদ্ভাবনী পাটপণ্যগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে কাজে লাগবে এই কূটনৈতিক দক্ষতা। অর্থাৎ ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর ধারণা দেশের গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। সরকারের স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, মৎস্য, বাণিজ্য, পাট, বস্ত্রসহ সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের চাহিদা মোতাবেক একটি সমন্বিত বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন পলিসি তৈরি আশু প্রয়োজন। এই পলিসি বা নীতিমালার লক্ষ্য হবে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণায় দেশকে ধীরে ধীরে উন্নত বিশ্বের সমকক্ষ করে তোলা।

বাংলাদেশ যেহেতু ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে যেতে চায়, তাই আবশ্যিকভাবে এ দেশের গবেষণা পলিসি, স্ট্যান্ডার্ড ও খরচও সে সময়ের মধ্যে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিতে হবে। কভিডের মতো মহামারির নিরাপত্তায় পূর্বপ্রস্তুতিতে জোর দিতে হবে। ইউনেসকোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া, ইসরায়েল, জাপান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র যথাক্রমে প্রতিবছর মোট জিডিপির ৪.৩, ৪.২, ৩.৪, ২.৯ ও ২.৭ শতাংশ ব্যয় করে গবেষণায়। ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশে এই গবেষণা ব্যয় বা ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশের আশপাশে হলে কেমন হয়? সত্যিকার অর্থে, এই ব্যয় দেশের মোট জিডিপির ৩ শতাংশের আশপাশে না হলে উন্নত বাংলাদেশ দেখাটাই সুদূরপরাহত হবে, অথবা উন্নত হলেও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে সন্দেহ থেকে যাবে।

লেখক : গবেষক, দ্য বুশ স্কুল অব পাবলিক অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সার্ভিস

টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা