kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

কভিড-১৯-এর পর গরিব দেশগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে

মার্ক লোকক

২০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্যক্তি, পরিবার, শিল্প ও জাতি—যে যার মতো করে করোনাভাইরাস মহামারিকে মোকাবেলার পরিকল্পনা করছে। তবে একটি নিষ্ঠুর সত্য এখনো যথাযথভাবে মেনে নেওয়া বাকি। এই কভিড-১৯ মহামারি এবং এর কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মন্দার কারণে দরিদ্র দেশগুলো ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা ও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

এই সংকট মোকাবেলায় ধনী দেশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা ও ঋণের ব্যাপারে তাদের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। মহামারি-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারবে না তারা। যে অস্বাভাবিক সংকটের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তার সমাধান স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে আসবে না।

ধনী দেশগুলো তাদের বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ বাড়াতে পারে। আর আর্থিক সংস্থাগুলোর তাদের ঋণ দেওয়ার শর্ত শিথিল করার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে সহনীয় করার চেষ্টা করতে পারে। এই মহামারির প্রতিক্রিয়া চলবে বহু বছর ধরে। বিষয়টি একই সঙ্গে যন্ত্রণাদায়ক এবং সবার জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। 

করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমরা এখনো অনেক কিছুই জানি না। তবে এই দুর্যোগ মোকাবেলায় দরিদ্র দেশগুলোর কেমন খরচ হতে পারে সে সম্পর্কে খানিকটা ধারণা করাই যায়। একই সঙ্গে এর মোকাবেলায় কী করা যেতে পারে সে ব্যাপারে পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

আমাদের স্মরণকালে অর্থনীতির গতি এতটা শ্লথ আগে আর কখনো হয়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি এ বছর ৩ শতাংশে নেমে আসবে। সে ক্ষেত্রে মহামন্দার পর এটিই হবে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি।

গরিব দেশগুলোতে সহিংসতা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বাড়বে। একাধিক দুর্ভিক্ষের সামনে পড়তে যাচ্ছি আমরা। অর্থনীতির চাকা থেমে গেছে প্রায়। কারণ রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও পর্যটন প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ। গরিব দেশগুলো তাদের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। ফলে যেকোনো সময় হাম, ম্যালেরিয়া, কলেরা এবং অন্য অসুখ ছড়িয়ে পড়তে পারে।  

আমাদের হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোতে বাস করা ১০ শতাংশ মানুষকে এই মহামারির বিপর্যয়কর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে ৯ হাজার কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে। এই অর্থের পরিমাণ খুব বেশি নয়। বিশ্বজুড়ে ধনী দেশগুলো যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার মাত্র ১ শতাংশ এই অর্থ।

এর দুই-তৃতীয়াংশ দিতে পারে বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের ঋণের শর্তে পরিবর্তন আনতে হবে। বাকিটা আসবে ধনী দেশগুলোর ‘আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা’য় বিদেশি সহায়তার অংশ হিসেবে। বর্তমানে প্রতিবছর এই সহযোগিতার পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি ডলার। এর চেয়ে ২০ শতাংশ বাড়ানো গেলেই আগামী ১২ মাসের জন্য প্রয়োজনীয় তিন হাজার কোটি ডলার পাওয়া যাবে।

তবে নিজ দেশে ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধরত সরকারগুলোর পক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রকে অর্থ সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টি খুব একটা স্বস্তিকর নাও হতে পারে। কারণ এখন এই দেশগুলোতেও মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকেরই চাকরি নেই, প্রিয়জনকে হারিয়েছেন কেউ কেউ। উন্নত দেশগুলো নিজেরাও অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত। তবে সহযোগিতা করার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কোনো কোনো দেশ এরই মধ্যে তাদের অর্থনীতি আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। আর এ কারণেই এখনই তাদের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো সাহায্য করা শুরু করতে হবে। 

অনেক দেশই হয়তো বর্তমান পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত সহায়তা করার বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান। তবে আমার অভিজ্ঞতা ভিন্নকথা বলে। ২০০৮ সালের মন্দার দুই বছর পর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মানবিক সহায়তা সংগ্রহ বেড়েছিল ৪০ শতাংশেরও বেশি। মানবতা ও সমবেদনা থেকে এই বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল। তবে এর সঙ্গে দাতা দেশগুলোর নিজ স্বার্থ উদ্ধারের বিষয়টিও ছিল।  

সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, বিশ্বের সবচেয়ে ভঙ্গুর দেশেও যদি নেতিবাচক কিছু ঘটে তার প্রভাব উন্নত দেশগুলোর ওপর গিয়ে পড়ে। তা সেই সংকট অনিয়ন্ত্রিত আভিবাসন হোক, সন্ত্রাস বা বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা যা-ই হোক না কেন। দরিদ্র দেশগুলোতে এই ভাইরাস অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া হলে নিশ্চিতভাবেই তা পুরো বিশ্বকে সংক্রমিত করবে। এই দেশগুলোতে অর্থনীতি পড়ে যাওয়া বা অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

এ সপ্তাহেই বিশ্বের কিছু মানুষ আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। আমরা দেখেছি, ব্যক্তি মানুষও একটি পুরো জাতিকে পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে। একই কথা পুরো বিশ্বের জন্যও সত্য। 

লেখক: জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল এবং জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক

সূত্র: গার্ডিয়ান

ভাষান্তর: তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা