kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

কালান্তরের কড়চা

তীরে এসে তরি যেন না ডোবে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

২০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



তীরে এসে তরি যেন না ডোবে

বাংলাদেশে করোনার হামলা বন্ধ হয়নি। খুশির খবর, পৃথিবীর দুটি দেশ এই হামলা থেকে মুক্ত হয়েছে। একটি দেশ জার্মানি, অন্যটি অস্ট্রিয়া। দুই দেশের সরকার এই ঘোষণাটি দিয়েছে। সুখবর ঝুটা হলেও ভালো। তাই এই খবরে সবাই খুশি হবেন। কিন্তু বিশ্বপরিস্থিতি খুশি হওয়ার মতো নয়। ট্রাম্পের আহাম্মকির জন্য বিশ্বের সুপারপাওয়ার এখন করোনায় বিপর্যস্ত। ব্রিটেনের অবস্থাও তা-ই। শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছিল, পয়লা জুন থেকে ব্রিটেনে স্কুলগুলো খোলা শুরু হবে। ডাক্তার ও বিজ্ঞানীরা একযোগে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন; বলেছেন, পয়লা জুন স্কুল খোলা শুরু হলে এক লাখের বেশি মানুষ মারা যাবে।

বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা গত মঙ্গলবার (১৯ মে) পর্যন্ত ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যুহার যদিও তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু রোগের সংক্রমণ ঘটছে দ্রুত। এটা হয়তো ঘটত না, যদি ব্যবসায়ীদের চাপে সরকার গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি, দোকানপাট খুলে না দিত এবং লকডাউন শিথিল না করত। ব্যবসায়ীদের চাপের চেয়ে জননিরাপত্তাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া সরকারের উচিত ছিল।

গত মার্চ মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশে করোনার হামলা শুরু হতেই শেখ হাসিনা এই মহামারি প্রতিরোধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। আহার নেই, নিদ্রা নেই, চব্বিশ ঘণ্টা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দৃষ্টি রেখেছেন এবং ভিডিও কনফারেন্স মারফত মহামারি প্রতিরোধব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন। অর্থাৎ এই বিশ্বদানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশে সেনাপতির দায়িত্ব শেখ হাসিনা তুলে নিয়েছেন নিজের হাতে। প্রশাসনের যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সময় নিঃসংকোচে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নির্দেশ চাইতে পারেন। আমার নিজের চোখে সামাজিক মাধ্যমে দেখেছি, গাজীপুর জেলার এসপি একটি সমস্যায় কী করবেন, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করে তা জেনে নিচ্ছেন।

হাসিনা-চরিত্রে যেকোনো বিপদে রুখে দাঁড়ানোর প্রবণতাটি আমাদের সবার জানা। অতীতে ঝঞ্ঝা, মহামারি, প্লাবনে তিনি তাঁর চরিত্রের এই দিকটির পরিচয় দিয়েছেন। এ জন্য বাংলাদেশে করোনা মহামারি দেখা দেওয়ার পর অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করেছি। ভেবেছি, যোগ্য মাঝির হাতেই নৌকার বইঠা আছে। হাসিনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছিলেন মোটামুটি ভালোভাবেই। সরকারি ছুটি ঘোষণা করে, লকডাউন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা করে, করোনা মহামারি রোধে দেশের সীমিত ব্যবস্থাকে দ্রুত উন্নত করে, রোগ শনাক্ত করার ‘কীটের’ অভাব দূর করে, হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা এবং তাদের জন্য বেডের সংখ্যা বাড়িয়ে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বুথ প্রতিষ্ঠা করে রোগ শনাক্ত করা ও রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা দ্বারা মানুষের মনে অন্তত এই আশা জাগিয়েছেন, করোনাকে হটানো অসম্ভব নয়।

শেখ হাসিনার একটি দল আছে, একটি সরকার আছে। তবু বলতে গেলে জার্মানির চ্যান্সেলর এবং নিউজিল্যান্ডের তরুণী প্রধানমন্ত্রীর মতো তিনি যেভাবে একক সাহসে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন, তা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রশংসা অর্জন করেছে। যে যতই সমালোচনা করুক, বাংলাদেশের মতো অতি ঘনবসতির এবং নাগরিক দায়িত্ব পালন সম্পর্কে প্রায় অসচেতন জনগোষ্ঠীর দেশে কোনো সংকটেরই কোনো ত্বরিত সমাধান নেই।

এটা ভারতে প্রমাণিত হয়েছে। ব্রিটেন, আমেরিকার মতো উন্নত ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দেশেও করোনা সংকট বাড়ছে বৈ কমছে না। বাংলাদেশে সমস্যাটি হাসিনা সরকার নিয়ন্ত্রণে আনতে চলেছিল। তা হঠাৎ হাত ফসকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল কেন? বাংলাদেশের প্রাত্যহিক খবরের দিকে যাঁরা নজর রেখেছেন তাঁরা জানেন, শহরাঞ্চলের শিক্ষিত-অশিক্ষিত কোনো জনগোষ্ঠীরই বড় অংশ সরকারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না। দোকানে বা বাজারে জিনিসপত্র কিনতে গেলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরস্পরকে যতটা দূরত্বে কিউতে দাঁড়াতে বলা হয়েছে, পুলিশের উপস্থিতিতে তা মানা হয়, পুলিশ চলে গেলেই আবার জনজোয়ার।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে যাতায়াতের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল তা কেউ মানছে না। পুলিশ এদের ওপর জোর খাটাবে, এদের লাঠিপেটা করবে তা-ও সব সময় সম্ভব নয়। এটা দিনমজুরের দেশ। এদের বেশি দিন লকডাউনে বা আইসোলেশনে রাখা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু হাসিনা সরকার একটি অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। দেড় কোটি মানুষের জন্য সরকারি খাদ্য সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্যাকেজ সাহায্য দ্বারা সাধারণ মানুষের অভাব দূর করার ব্যবস্থা করেছে।

১৭ মে রবিবার ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি প্রবাসজীবন শেষ করে স্বদেশে ফিরে আসেন। এই দিবস পালন উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন করোনাজনিত সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য প্রধানমন্ত্রীর যেসব প্যাকেজ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। এই বিবরণ শুনলে মনে হয় না আর কোনো উন্নয়নশীল দেশে এই ধরনের পরিকল্পনা অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছেন। তাতে এটুকু সান্ত্বনা ছিল যে বিশ্বব্যাপী এই মহাসংকটে বাংলাদেশ অন্তত তার নিজস্ব পন্থায় সংকট সমাধানের পথে চলেছে।

আর কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সংকটের তুলনা চলে না। ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশের ঘাড়ের ওপর বসে রয়েছে। এদের আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা শেখ হাসিনা বলতে গেলে একা সামলাচ্ছেন। জাতিসংঘও তাঁর সাহস ও সাফল্যের প্রশংসা করেছে। এখন গোঁদের ওপর বিষফোড়ার মতো এই ভয়াবহ কভিড-১৯-এর মৃত্যুথাবা। এই থাবার মুখে প্রধানমন্ত্রী ভেঙে পড়েননি, সাহস হারাননি। নিজস্ব সীমিত সম্পদ নিয়েই লড়াইয়ে নেমে পড়েছেন।

ঠিক এই সময়ে আমাদের এক শ্রেণির নব্য ধনী ব্যবসায়ী করলেন অকল্পনীয় কাণ্ড। তাঁদের মুনাফার বিরাট তহবিল থেকে দরিদ্র গার্মেন্টকর্মীদের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা না করে গরিব শ্রমিকদের দরদি সেজে তাঁদের স্বার্থে গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেন। তাঁদের সঙ্গে একজন মন্ত্রী এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের এক সাবেক মেয়রের স্ত্রীও জড়িত বলে জানা যায়।

গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাতে প্যান্ডোরার বাক্সের ঢাকনা যাতে একসঙ্গে খুলে না যায় সে জন্য তাঁরা কিছু রক্ষাকবচ রাখবেন বলেছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি তাঁরা রাখেননি। ফলে কী হয়েছে? বাঁধে সামান্য ছিদ্র হলেও যেমন পানির স্রোত রোখা যায় না, তেমনি গার্মেন্টকর্মীরাও দলে দলে এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। মালিকদের উৎসাহ পেয়ে তাঁরা মফস্বল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে দল বেঁধে চলে এসেছেন। গার্মেন্ট মালিকরা সরকারকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করেননি।

চিকিৎসক বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, এর ফল ভালো হবে না। তা-ই হয়েছে। গার্মেন্টকর্মীদের মধ্যে দ্রুত করোনা ছড়িয়েছে। সরকার অবশ্য গার্মেন্টকর্মীরা রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু তা আর কতটুকু? সমুদ্রে গোস্পদের মতো। কারণ গার্মেন্টশিল্প খুলে যাওয়ার ফলে শুধু গার্মেন্টকর্মীরাই নয়, অন্যান্য শিল্প ও কলকারখানার কর্মীরাও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন।

সামনে রোজার ঈদ। বাঙালি মুসলমানের একটি শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। এ সময় ছেলে-মেয়ে এবং নিজেদের জন্য জামা-কাপড় কেনার ধুম পড়ে। সুতরাং ঢাকায় শপিং মলগুলো খুলে রাখার কথা উঠেছে। কেউ কেউ খুলে দিয়েছেন। একটা বছর নতুন জামা-কাপড় না কিনেও ঈদ করা যায়—এটা কি মানুষকে বোঝানো যেত না। ধন্যবাদ জানাই বসুন্ধরা শপিং মলের মালিকদের। এটি ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিরাট শপিং মল। কিন্তু খবরে দেখলাম, এই শপিং মলের কর্তৃপক্ষ করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে বসুন্ধরা শপিং মল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধরনের সিদ্ধান্ত কি মানবতার স্বার্থে অন্যান্য শপিং মলের কর্তৃপক্ষও নিতে পারে না? জানি না, তারা নিয়েছে কি না। নিয়ে থাকলে অনেক জীবন রক্ষা পাবে। সরকারের ওপরও অস্বাভাবিক চাপ অনেকটা কমবে।

আমার আশঙ্কা বাড়ছে। বাংলাদেশে মাঝখানে ভাইরাসে আক্রান্তদের সংখ্যা একটু থমকে দাঁড়ালেও এখন আবার বাড়ছে। সরকার তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করার জন্য। কিন্তু তাদের সাফল্যগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমাদের মধ্যে উপযুক্ত নাগরিক চেতনার অভাব এবং এক শ্রেণির মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর অসাধুতার জন্য। প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে কেউ কেউ যেমন আলু সিদ্ধ করে খেতে চায়, এরাও তেমনি দেশের ও জাতির এত বড় বিপদের সময়ও মানুষের জীবনের চেয়ে তাঁদের আর্থিক মুনাফাটাই বড় করে দেখছেন।

এই এক শ্রেণির লোভী ব্যবসায়ীর মানবতার প্রতি মমত্ব ও দায়িত্ববোধ কত কম সরকার তা দেখেছে রানা প্লাজার দুর্ঘটনার সময়। এই প্লাজার মালিক শয়ে শয়ে মানুষের জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ত্রুটিপূর্ণ ফাউন্ডেশন দেওয়া ভবনে ক্রমাগত ভারী মেশিনারি তুলতে দিয়েছেন। পরিণামে ভবনটি ভেঙে পড়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। বর্তমানের ঝুঁকি আরো বেশি। বিবেচনাহীনভাবে দোকানপাট, শপিং মল খোলা হলে লাখো মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি ভুল, গোড়াতে কভিড-১৯-কে তাচ্ছিল্য করার কারণে গোটা আমেরিকা আজ বিপর্যস্ত। এদিক থেকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী (তরুণী) গোড়াতেই কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করে তাঁর দেশের মানুষকে বিপদমুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গোড়া থেকেই ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সরকারের সাধ্যানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু বর্তমানে এক শ্রেণির লোভী ব্যবসায়ীর তৎপরতায় এবং জনসমাজের একটি শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বড় অংশের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধের অভাব প্রমাণিত হওয়ায় করোনা পরিস্থিতির আবার অবনতি ঘটেছে। শেখ হাসিনার এত চেষ্টা এবং তাঁর সরকারের এত তৎপরতা সত্ত্বেও তীরে এসেও তরি যেন না ডোবে। অর্থাৎ ভাইরাসের দৌরাত্ম্যে সারা দেশ যেন বিপর্যস্ত না হয়। শেখ হাসিনার কাছে আমার প্রার্থনা, আমার অনুরোধ—হাসিনা, আরো কঠোর হোন, আরো সতর্ক হোন।

লন্ডন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২০

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা