kalerkantho

সোমবার । ২৯ আষাঢ় ১৪২৭। ১৩ জুলাই ২০২০। ২১ জিলকদ ১৪৪১

বুকের গভীরে আছে প্রত্যয় আমরা করব জয় একদিন

আবদুল বায়েস

২৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বুকের গভীরে আছে প্রত্যয় আমরা করব জয় একদিন

করোনা মোকাবেলায় লকডাউন কখনো সফল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত বিশেষত গরিবের পেট আর হাত খালি থাকবে। ভাবতে অবাক লাগে যে লকডাউনের মধ্যেও শ্রমিক শ্রেণি তাদের বকেয়া বেতনের জন্য রাস্তায়  নামতে বাধ্য হয়

 

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস পশ্চিমা তথা পুরো বিশ্ব তছনছ করে দিয়েছে। মোট মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বয়স্কদের জন্য এই ভাইরাস মৃত্যু সম। এমনকি উন্নত ও ধনী দেশগুলোর অবস্থাও ত্রাহি মধুসূদন। আপাতত কেউ এই ভাইরাসের কারণ নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না; সব মনোযোগ মৃত্যুর মিছিল ঠেকানোর দিকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আঘাত হেনে ভাইরাসটি এখন অতি দ্রুতবেগে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে ধাবমান। ধাবমান বলছি কেন, অলরেডি এর হিংস্র ছোবলে ধরাশায়ী হতে শুরু করেছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। ইংরেজিতে বলে, নো হেড, নো হেডেক অর্থাৎ মাথা নেই তো মাথা ব্যথাও নেই। করোনায় যখন বিশ্ব কাঁপছিল এবং কুপোকাত, তখন বিশেষত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবস্থা অনেকটা দাঁড়িয়েছিল এ রকম : নো টেস্ট, নো টেনশন। হাতে গোনা কয়েকটি নমুনা পরীক্ষায় প্রাপ্ত আক্রান্তের ও মৃতের সংখ্যা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেয়নি আমাদের। মনে মনে আশা ছিল ঝড় বয় বটগাছের ওপর দিয়ে, চারাগাছ বুঝিবা রক্ষা পাবে এই যাত্রায়। কিন্তু বিধি বাম—করোনাভাইরাস কাউকে ছাড়ে না। এখন শুনছি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা করোনার করুণ শিকার। তাই বলে বাংলাদেশের সরকার এবং সমাজ কিন্তু বসে থাকেনি। যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে করোনা পরীক্ষার পরিধি বিস্তৃত করে রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করার। এসেছে কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন এবং লকডাউনের মতো নিবারক ব্যবস্থা, যাতে করে ছোঁয়ায় যেন রোগ না ছড়ায়। কিন্তু এত কিছুর পরও সার্বিক পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় মাত্র। আক্রমণকারী করোনা উঠোনে অপেক্ষা করছে যেন ঘরের দরজা খোলা মাত্রই টুঁটি চেপে ধরবে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ছয়টি নমুনা পরীক্ষায় অন্ততপক্ষে একটি পজিটিভ এসেছে। গবেষক জাফর সাদেক তাঁর পোস্টে বলছেন, বাংলাদেশের খানার গড়পড়তা আকার যদি ৪.২ হয় অর্থাৎ একটি খানায় যদি চারজনের ওপর বাস করে তাহলে বলতে হয় দেশের প্রায় প্রত্যেক খানা হয় বাঘের মুখে নয়তো বাঘের কড়া নজরদারিতে রয়েছে। তার মানে পুরো বাংলাদেশ ঝুঁকিতে আছে—স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই ঘোষণা সঠিক এবং সময়োচিত। আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, গ্রামবাংলায় যত খানা আছে তার মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খানার অন্তত একজন সদস্য বিদেশগত। কোনো কোনো গ্রামে এই হার অনেক বেশি—৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ। এরা বিদেশ থেকে এসে হাসিখুশিতে স্বজনদের বাড়ি যায়; তারা আবার তাদের স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশা করে। যদি ধরে নিই যে একজন করোনাভাইরাস পজিটিভ নিয়ে গড়ে ১০ জনের সঙ্গে  মেশে, যারা প্রত্যেকে ১০ জনকে ছোঁয়, তাহলে পরিস্থিতি কত ভয়াবহ হতে পারে? এর সঙ্গে যদি সমাবেশ, মহাসমাবেশ, বাজার, গণপরিবহন, খেলার মাঠ বিবেচনায় নিই তাহলে উদীয়মান বিপত্সংকেতের কোনো নম্বর দেওয়া যাবে না, যাকে বলে বিপদ ইনফিনিটি। সরকারের দিক থেকে প্রচেষ্টার ত্রুটি দেখছি না—তা লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ কিংবা সংগ্রহ ও নিবারণমূলক পদক্ষেপ হোক। তবে অতীতে যেমন প্রণোদনা প্রদানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকত বলে অভিযোগ আছে, তদারকির ও নিরীক্ষায় ঘাটতির কথা মুখে মুখে, এবার যেন সেটা না হয়। মনে রাখতে হবে চলমান সংকট কারো কারো ভাগ্যের দরজা খোলার চাবি—শকুনের চোখ যেমন মানুষের লাশের দিকে। সম্পদ সব সময় সীমিত কিন্তু ঠিক এখন আরো বেশি সীমিত। কাজেই সম্পদের অপচয় কিংবা চুরি ঠেকাতে শাসকদের মেকিয়াভেলির ‘প্রিন্স’ হওয়া ছাড়া বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। আরেকটি কথা স্বীকার করতে হবে যে লকডাউন তথা নিবৃত্তিমূলক পদক্ষেপ এখন খুব জরুরি। অতি সাধারণ কথায়, এটি ছোঁয়াচে রোগ, যা রকেটের গতিতে সংক্রমিত হতে থাকে। তাই প্রথম প্রধান পদক্ষেপ হলো জনসমাবেশ যেখানে, প্রতিরোধ সেখানে। ইউরোপ ও আমেরিকায় এক ধাক্কায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তারপর পরিবহন, বাজার, খেলাধুলা, কনসার্ট এবং সবশেষে লকডাউন। কোথাও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ কথা ঠিক যে করোনা মোকাবেলায় এগুলো কখনো সফল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত বিশেষত গরিবের পেট আর হাত খালি থাকবে। সেটা করতে হলে ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছানো এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের কোনো বিকল্প নেই। ভাবতে অবাক লাগে যে লকডাউনের মধ্যেও শ্রমিক শ্রেণি তাদের বকেয়া বেতনের জন্য রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়। ত্রাণ চোর যেমন কঠোর শাস্তি পাবে তেমনি পোশাক কারখানার মালিকও বকেয়া বেতনের জন্য শাস্তি পেতে পারে। আসুন সবাই মিলে চলমান সংকটকালের আচরণগত নিয়ম-কানুন ও শিষ্টাচার পরতে পরতে মেনে চলি। সরকারকে বলি, আরো কঠোর হোন; পপুলিস্ট পলিসিতে করোনা প্যানডেমিক থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। কখনো ভেবেছেন এই ভাইরাসটির কাছে আপনি কত অসহায়? বিপত্সংকেত কত তা পর্যন্ত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বলি, মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে ঘরে থাকি আর প্রতিদিন হাত ধোয়ার সময় ২০ সেকেন্ড গুনগুন গাই : আমরা করব জয়, আমরা করব জয়, আমরা করব জয় একদিন, আহা বুকের গভীরে আছে প্রত্যয় আমরা করব জয় একদিন।

 

লেখক : সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা