kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

পরিবেশ নিয়ে বিকল্প বিষয়ে ভাবা হবে কি!

ফাতিহ বিরোল

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভেনিসের খালগুলোতে আবার স্বচ্ছ জলের ধারা বইছে। মানুষের কর্মকাণ্ড থমকে দাঁড়ালে প্রকৃতির স্বচ্ছন্দে চলা শুরু হয়। আকাশেও পরিবর্তনের একটা গল্প লেখা হচ্ছে। সারা দুনিয়ায় করোনার বিস্তার ঠেকাতে স্থানে স্থানে লকডাউন ঘোষণা করায় বায়ুদূষণকারী উপাদান কমছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণেও ভাটার টান। দূষণ যে কমছে তা দেখছে স্যাটেলাইটগুলো; চীনের বড় শহরগুলোতে জানুয়ারি থেকে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রায় লক্ষণীয় নিম্নগতি দেখা যাচ্ছে। এ গ্যাস অন্তর্দহন ইঞ্জিনগুলো থেকে নির্গত হয়, সেগুলো এখন বন্ধ। কারণ দেশব্যাপী কোয়ারেন্টিনের কারণে বিদ্যুেকন্দ্র ও কারখানা এখন বন্ধ। এ গ্যাস শ্বাসে ব্যাঘাত ঘটায়। এর মাত্রা কমলেই উপকার।

ভাইরাস ও লকডাউনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুরূপ ধারা দেখা দিয়েছে। ইতালির উপগ্রহ-ডাটা নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের কনসেন্ট্রেশন কমার বার্তা দিয়েছে, বিশেষ করে মহামারির মূল ফোকাস পো উপত্যকায়। মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায়ও নিম্নগতি দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটিতে পিক আওয়ার ট্রাফিক ১৩.৫ থেকে ২৬ শতাংশ ইন্টারভ্যালে নেমে এসেছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, শহরটিতে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা গত বছরের এ সময়ের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি ক্ষতিকর অন্যান্য দূষণকারী পদার্থও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে; গ্রিনহউস গ্যাসের মাত্রাও কমবে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এও দেখেছেন, নিউ ইয়র্কে কার্বন ডাই-অক্সাইডের কনসেন্ট্রেশনও কমেছে। গত মার্চের তুলনায় এ মার্চে কার্বন ডাই-অক্সাইড ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমেছে। শিল্প-কারখানা বন্ধের ফলে চীনে কার্বন ডাই-অক্সাইড গত বছরের তুলনায় এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২৫ শতাংশ কমেছে। মানুষ আশার রুপালি রেখা দেখতে পাচ্ছে; কিন্তু সেটি নির্ভর করছে এই কমতির প্রক্রিয়া স্থায়ী হবে কি না তার ওপর। বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি অব লিগের ফ্রাঁসোয়া জিমেন বলেছেন, জলবায়ুর জন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণে দীর্ঘস্থায়ী নিম্নগতি দরকার। কিন্তু এমনটি ঘটা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং সংকটজনিত ক্ষতি পোষাতে আরো খারাপ কর্মকাণ্ড হবে।

কার্বন ডাই-অক্সাইডের কমার বিষয়টি স্বল্পস্থায়ী হওয়ারই কথা। গত ১৬ মার্চ নরওয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট রিসার্চের গ্লেন পিটার্স এস্টিমেট করে বলেছেন, যদি মার্চ মাসের শুরুতে দেওয়া ওইসিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী বিশ্বের জিডিপি এ বছর ১.৫ শতাংশ (মহামারির আগের হিসাবের অর্ধেক) হয়, তাহলে হ্রাসকৃত কর্মকাণ্ডের কারণে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ ১.২ শতাংশ কমবে। এই কমার ঘটনাটি (যদিও তখনো অর্থনীতি বর্ধমান থাকবে) ঘটবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বর্ধমান কার্বন এফিসিয়েন্সির কারণে। বেশির ভাগ পূর্বাভাসদাতা এ বছর বিশ্ব জিডিপি সংকুচিত হওয়ার কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, পুরো ৪ শতাংশ কমবে। এটি ২০০৭-০৮ সালের সংকটে যা হয়েছিল তার দ্বিগুণ। ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ আরো অনেক কমবে। তবে অনেক দিন তা বহাল থাকবে না। ২০০৯ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি ও সিমেন্ট উৎপাদনজনিত কার্বন নিঃসরণ ১.৪ শতাংশ কমেছিল; তবে এক বছর পরেই নিঃসরণ ৫.৮ থেকে ৫.৯ শতাংশ হার বাড়ে। ২০১০ সালের শেষে বার্ষিক নিঃসরণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ছিল। মোট কথা অর্থনৈতিক সংকট বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণে সামান্যই পার্থক্য ঘটিয়েছিল। ২০০৮ সালের পরে নিঃসরণ বাড়ার কারণ কিছু বড় উদীয়মান অর্থনীতির দ্রুত প্রবৃদ্ধি, যেমন—চীন ও ভারত। কিছু কার্বনঘন খাতকে, যেমন—নির্মাণশিল্প, প্রমোট করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ বড় কারণ; কম দামি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারও একটি কারণ।

দুঃখজনক! এখনো পরিবেশগতভাবে অযথা প্রণোদনার প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। কানাডা তার তেল-গ্যাস শিল্পের জন্য মাল্টিবিলিয়ন ডলারের বেইল-আউটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এয়ারলাইনসগুলো ক্রমাগত সাহায্য চাইছে। চীনের কিছু প্রদেশ নির্মাণশিল্পে ২৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। জনসাধারণকে গাড়ি কেনার জন্য উৎসাহিত করছে চীন।

আগামী নভেম্বরে গ্লাসগোতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। সেখানে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ক্রমবর্ধমানতার সমস্যা নিরসন নিয়ে সরকারগুলোর পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা। আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত সম্মেলন পেছানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। করণীয় বিষয়ক ঐকমত্যে পৌঁছানোর বিষয়টি চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে। আগামী জুনে বনে অনুষ্ঠেয় প্রস্তুতি সভা বিলম্বিত হলে বিষয়াদি জটিল হয়ে পড়বে।

জলবায়ুর ক্ষেত্রে কভিড-১৯-এর ফলাফল কী হবে, তা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—এক. মহামারি কত দিন চলবে; দুই. কী করে রাজনীতিকরা সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে তাঁদের অর্থনীতিকে উদ্ধার করবেন। তাঁরা কি জ্বালানি, পরিবহন ও নির্মাণশিল্পের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিতে চলবেন, নাকি সৌরশক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গাড়ির জন্য আরো ব্যাটারি, হাইড্রোজেনচালিত ফুয়েল সেল গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ করবেন? কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ছাড়াই ইস্পাত ও সিমেন্ট উৎপাদনের উপায় বের করার জন্য অর্থ বরাদ্দ করবেন কি তাঁরা?

 

লেখক : ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি

এজেন্সির প্রধান

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ :

 সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা