kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

সরকার এতো নমনীয় কেন?

ফরিদুর রহমান

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকার এতো নমনীয় কেন?

গত শুক্রবার, এপ্রিল মাসের ৩ তারিখে জুমার আজানের পরপরই কোনো কোনো মসজিদ থেকে দেওয়া ঘোষণায় নামাজে যোগদানের উদাত্ত আহ্বান শুনে মনে হয়েছিল, ‘লকডাউন’ বা ঘরে থাকার সরকারি নির্দেশ বোধ হয় শিথিল করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, মসজিদে ‘সীমিত আকারে’ জামাত চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাড়া-মহল্লার অনেক মসজিদ থেকে মুসল্লিদের জামাতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত ভয়াবহতা বিবেচনায় না এনে এবং সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পেতে দেশের কোনো কোনো স্থানে দোয়া মাহফিল আয়োজনেরও খবর পাওয়া গেছে।

দেশে দেশে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। সারা বিশ্ব যখন ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন, সেই সময় সরকারের নানা পরিকল্পনা ও প্রচার সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে তেমন উদ্বেগ ও সচেতনতা—কোনোটাই লক্ষ করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ অবশ্যই মসজিদে এবং বিশেষ করে ওয়াজ মহফিলে ধর্মান্ধ হুজুরদের আশ্বাসবাণী। এসব বাণীর মধ্যে যে কয়েকটি কথা তাঁরা খুব জোরের সঙ্গে বলেছেন, প্রথমত, এই ভাইরাস কাফিরদের ওপর আল্লাহর গজব, মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হবে না। দ্বিতীয়ত, ছোঁয়াচে রোগ বলে ইসলামে কিছু নেই। তৃতীয়ত, কোনো মুসলমান যদি করোনায় আক্রান্ত হয়, তাহলে আল্লাহর কালাম মিথ্যা হয়ে যাবে। চূড়ান্ত মিথ্যাচার করে মুফতি পরিচয় দানকারী একজন বলেছেন, স্বপ্নে তিনি করোনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং করোনা তাঁকে বলেছে, বাংলাদেশের মুসলমানদের কোনো ক্ষতি হবে না।         

বাংলাদেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নির্বিশেষে ধর্মবিশ্বাসে আক্রান্ত মানুষ ধর্মগুরুদের এসব আশ্বাসে আস্থা স্থাপন করে নিশ্চিন্ত আছে এবং নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যখন ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার, তখনো আমাদের বোধোদয় ঘটেছে বলে মনে হয় না। মৃত মানুষের দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হয়ে চলেছে ইহুদি-খ্রিস্টান, হিন্দু-মুসলমান, নাস্তিক-আস্তিক এবং ধনী-নির্ধনসহ সব জাতি, রাষ্ট্র, সমাজ ও সম্প্রদায়ের মানুষ। মক্কায় কাবা শরিফ এবং মদিনায় মসজিদ-ই- নববী বন্ধ করে শহর দুটিতে কারফিউ জারি করা হয়েছে, ভ্যাটিকানে বন্ধ হয়ে গেছে রোমান ক্যাথলিক চার্চের সদর দপ্তর এবং প্রধান উপাসনালয়। পোপ ফ্রান্সিস তাঁর অলিন্দ থেকে ভক্তশূন্য চত্বরের দিকে হাত নেড়ে নিয়ম রক্ষা করে চলেছেন। ১২৮ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তিরুপতির তিরুমালা মন্দিরে। জেরুজালেমে সিনাগগের দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্মরণকালের মধ্যে এবারই প্রথম।

ইসলাম থেকে শুরু করে ইহুদি পর্যন্ত সব ধর্মের মোল্লা, পুরোহিত, যাজক ও রাব্বি নিজ নিজ ধর্মের যৌক্তিক অবস্থান থেকেই উপাসনালয়গুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যেখানে বিশেষ কোনো ভবন বা প্রতীক স্থাপনের আয়োজন না করে গাছের তলায় গামছা পেতে, পুকুরপারের বাঁধানো সিঁড়িতে, অফিসে বা কারখানায়, এমনকি চলন্ত বাসে-ট্রেনেও নামাজ আদায় করা যায়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আলেম-উলামারা তাঁদের অজ্ঞানতা থেকে মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য অনড় অবস্থান নিয়ে দেশকে একটা চরম নৈরাজ্য ও বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছেন।

সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস ডিজিজ বা কভিড-১৯-এর গণসংক্রমণের তথ্যগুলো বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, মালয়েশিয়ায় ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেছে কুয়ালালামপুর শহরের বাইরে শ্রী পেটালিংয়ে ধর্মীয় সমাবেশ থেকে। এখানে সংক্রমিত ৬৭৩ জন পৎসয়ক্রমে দক্ষিণ এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে দেগু শহরের শিন চেওনজি চার্চ অব জেসাস থেকে। ফ্রান্সের ওপেন ডোর চার্চে সমবেত আড়াই হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষের অর্ধেকই কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। ইরানে ছড়িয়েছে ফাতিমা রাদিআল্লাহু আনহার রওজা শরিফ থেকে।

সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দিল্লির নিজামুদ্দিনের তাবলিগি মারকাজ মসজিদে সমবেত দেশি-বিদেশি মুসল্লিদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে অন্তত সাড়ে ৬০০ মানুষ। তাদের অনেকে এরই মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে, কয়েক শ মানুষকে দিল্লির বিভিন্ন হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে এবং বাকিরা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, শুধু ধর্মীয় সমাবেশ থেকেই কি ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়ায়! তা যদি না হয়, তাহলে বিপুলসংখ্যক গার্মেন্টকর্মীর চলাচল ও সমাবেশ, হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লার আড্ডা, ত্রাণ বিতরণের জন্য মানুষ জমায়েত করা—এসবও কি করোনাভাইরাস ছড়ানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে না! নিঃসন্দেহে সব জনসমাগমই ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা সৃষ্টি করে। সে কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে সরকারসহ সব সমাজসচেতন মানুষ বেশি গুরুত্ব দিয়েছে দূরত্ব বজায় রাখা এবং ঘরে থাকার ওপর। কোনো একটি অজ্ঞতা বা অপকর্ম দিয়ে অন্য একটিকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টাও এক ধরনের অন্যায়।

সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক তত্পরতার বিপরীতে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাঁরা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের ঢিলেঢালা আচরণ মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার লোহার ঘরে সাপের অনুপ্রবেশের ফাঁকফোকর বন্ধ করতে না পারলে করোনাভাইরাসের গণসংক্রমণ এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা