kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

অর্থনৈতিক কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না

ডা. মো. আশরাফুল হক

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অর্থনৈতিক কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না

স্বাস্থ্য হচ্ছে একজন ব্যক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে অবহেলিত অংশও বলা চলে। আমরা যদি সুস্থ থাকি, তাহলে এ বিষয়ে নজরই দিতে চাই না। তখনই মনোযোগ দিয়ে থাকি, যখন জটিলতা তৈরি হতে থাকে। প্রাত্যহিক জীবনে সঠিকভাবে চলাচলের জন্য আমাদের সুস্থ থাকা বাঞ্ছনীয়। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালন এবং একটি প্রতিপাদ্য বিষয় ঠিক করে, যার দ্বারা সবার কাছে একটি বার্তা পৌঁছানো যায়। সেই বার্তা অনুসরণ করে বিশ্বের নানা দেশ তাদের লক্ষ্য ঠিক করে। আর লক্ষ্য ঠিক হলেই বের হয়ে আসে ঘাটতি কোথায় থেকে যাচ্ছে, যার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের হানি হচ্ছে।

এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়—সবার জন্য স্বাস্থ্য, যাতে অর্থনৈতিক কারণে কেউ বঞ্চিত হবে না। এটির মাঝে একটি বিশাল অর্থ নিহিত। আমাদের দেশে সংবিধানে রয়েছে সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার কথা। এখন প্রাথমিক স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ এখনো অনেকটাই অপ্রতুল। সেই সঙ্গে যখন যোগ হয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা তখন একে নিশ্চিত করা আরো কঠিন হয়ে যায়।

জাতিসংঘের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থার মাঝে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্যতম। এটি মূলত ছয়টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে থাকে—১. উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা : দারিদ্র্যের সঙ্গে স্বাস্থ্যহানির সম্পর্ক রয়েছে। কাজেই উন্নয়ন ছাড়া যেমন দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়, তেমনি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নও সম্ভব নয়। ২. স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করা : প্রচলিত, নতুন সৃষ্ট ও নবধারায় সৃষ্ট রোগের হাত থেকে বাঁচার জন্য এটি কাজ করে। ৩. স্বাস্থ্য কাঠামোর উন্নয়ন : অনেক অনুন্নত দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সঠিক নয়। এসব দেশে স্বাস্থ্যকাঠামোর উন্নয়নে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর্থিক অনুদান, ওষুধ সরবরাহ, তথ্য বিনিময়, জনবলকে প্রশিক্ষণ প্রদানসহ সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে সহযোগিতা করে থাকে। ৪. স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য গবেষণা : প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে কোন দেশে কেমন ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে, সেই আলোকে গবেষণা করে আক্রান্ত বিভিন্ন দেশ আগাম তথ্য প্রদান করে থাকে। ৫. উন্নয়ন সহযোগী তৈরি করা : সমগ্র বিশ্বেই নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাজ করে থাকে। তাদের মাঝে সামঞ্জস্যসাধনের কাজটিও এটি করে থাকে। ৬. নিজস্ব কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি : স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। নিজস্ব দক্ষতা উন্নয়ন করা না গেলে সেটি মোকাবেলা করা সম্ভব হয় না। সেই কাজটিও এই সংস্থা করে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই দিবসটি শুধু তার প্রতিষ্ঠা পালনের উপলক্ষ হিসেবে উদ্যাপন করে তা নয়, সঙ্গে এটি বর্তমান যে সমস্যা প্রকট তার দিকে নজর দিয়ে তা সমাধানের জন্য লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করে।

যেসব বিষয়ের দিকে তারা লক্ষ করে তার মধ্যে রয়েছে—১. বার্ধক্য ও স্বাস্থ্য তথ্য। ২. মিডিয়া কিভাবে সম্পৃক্ত থেকে দিনটিকে তাত্পর্যপূর্ণ করতে পারে। ৩. কারিগরি ও যোগাযোগ মাধ্যমের যাবতীয় তথ্য। ৩. মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা।

জীবনে সঠিকভাবে চলার উপায় কী আসলে?

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, উপযুক্ত বিশ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সুস্থ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—এই কয়েকটি মূল বলা চলে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলেই বেশির ভাগ জিনিস সমাধান হয়ে যায়।

আজ ২০২০ সালের শুরুতে আমরা দেখছি, ভাইরাস আমাদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যদি সুস্থ জীবন যাপন করি, তাহলে ভাইরাস আমাদের শরীরে প্রবেশ করার কথা নয়। আবার প্রবেশ করলেও শরীরের রোগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট থাকলে তা আমাদের ক্ষতি করার আশঙ্কা কম। বাস্তবে আমরা কী দেখছি? বিশ্বের ২০৫টি দেশে আজ ভাইরাস আক্রমণ করেছে। সামাজিক মানুষ আজ ঘরে বন্দি। খালি চোখে যাকে দেখা যায় না, আমরা কে কত দিন তার বিরুদ্ধে টিকে থাকব। সবই আসলে প্রকৃতির স্বাভাবিকতার ব্যত্যয়ের ফসল।

সব কিছুর ভালো দিক ও খারাপ দিক রয়েছে। তেমনি এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি বিশাল শিক্ষা হয়ে থাকবে। গেল বছর পর্যন্ত পালিত কয়েকটি বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল নিম্নরূপ—

২০১০ :  নগরায়ণ এবং স্বাস্থ্য : শহরগুলোকে স্বাস্থ্যকর করুন

২০১১ :  অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের আজ কোনো পদক্ষেপ নেই, আগামীকাল কোনো নিরাময় নেই

২০১২ :  সুস্বাস্থ্য বছরের পর বছর জীবনকে যুক্ত করে

২০১৩ :  স্বাস্থ্যকর হার্ট বিট, স্বাস্থ্যকর রক্তচাপ

২০১৪ :  ভেক্টরবাহিত রোগ : ছোট কামড়, বড় হুমকি

২০১৫ : খাদ্য সুরক্ষা

২০১৬ : ডায়াবেটিসকে থামিয়ে দিই

২০১৭ : হতাশা : আসুন কথা বলি

২০১৮ : সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ : প্রত্যেকে, সর্বত্র

২০১৯ : সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ : প্রত্যেকে, সর্বত্র

একটু খেয়াল করে দেখি প্রতিপাদ্যগুলো। গত ১০ বছরে যদি সঠিকভাবে মেনে চলা হতো বিষয়গুলো, তাহলে বিশ্ব আজ হুমকির মুখে পড়ত না। সুস্থ জীবনযাপন থেকে আমরা অনেক অনেক দূরে থাকি বলেই আজ আমরা প্রকৃতির কাছে অসহায়। লক্ষ করে দেখুন, বর্তমান সময় থেকে বাঁচার পথ কী বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সবই কিন্তু জীবনযাপনের স্বাভাবিক পথ। আমরা ভুলে গেছি বলেই মনে করিয়ে দেওয়া লাগছে বিশ্বব্যাপী। এই বছরটি তাই হয়তো আগামী দিনের জন্য বড় একটি উদাহরণ তৈরি করবে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা প্রতিটি রাষ্ট্রের, প্রতিটি রাষ্ট্র পরিচালকের জন্য, প্রতিটি মানুষের জন্য।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা