kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় পর্যুদস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

এম হাফিজউদ্দিন খান

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনায় পর্যুদস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাস নিয়ে যে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা চলছে, তাতে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। বাংলাদেশে এখনো সেভাবে বিষয়টা ভয়াবহরূপে হানা দেয়নি; কিন্তু শঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে। কোনোভাবেই এটাকে অ্যাভয়েড করার সুযোগ দেখছি না। সারা পৃথিবীতে ১০ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে ৫০ হাজারের বেশি। বাংলাদেশে গত রবিবার পর্যন্ত ৯ জন মারা গেছে, আক্রান্ত হয়েছে ৮৮ জন। সারা বিশ্বের তুলনায় এটা খুবই কম। তবে অন্য হিসাবে মৃত্যুহার বেশি। রাজনীতি একেবারেই বন্ধ। সেই পরিবেশও নেই। মানুষ খুব আতঙ্কে আছে। করোনার বাইরে দেশে এখন কোনো খবর নেই। এমন দুর্যোগ নিকট অতীতে দেখা যায়নি। অনেক মানুষ মারা গেছে, শোনা যাচ্ছে আরো বহু মানুষ মারা যাবে। সরকার সজাগ আছে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করতে। কতটুকু সম্ভব হবে বলতে পারি না। এতে সমস্যায় পড়েছে সাধারণ মানুষ, যারা দিন আনে দিন খায়। অনেকের খাদ্য মজুদ আছে, বেশির ভাগের নেই। খাদ্য সহায়তা দিয়ে বেশিদিন চালানো যাবে না। এখন যেটা করতে হবে—সাবধান থাকতে হবে এবং কৃষিতে জোর দিতে হবে। আমাদের তো তিনটা জিনিস আছে—কৃষি, রেমিট্যান্স এবং গার্মেন্টশিল্প। এগুলো নিয়ে আমরা ভালো ছিলাম। এখন তো সব কিছু পাল্টে যাচ্ছে।

এ মুহূর্তে দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে কোনো খবর ও পরিস্থিতি নেই, সে রকম কোনো আভাস এখন পর্যন্ত দেখতেও পাচ্ছি না। আর এখন সার্বিকভাবে দেশের রাজনীতি নিয়ে কিছু বলার নেই। কিছু বলতে গেলে অপ্রিয় সত্য কথাই বেরিয়ে আসে; যে কথাগুলো আমরা বারবার বলেছিও। বলে কোনো লাভও হয় না। কাজেই এক হিসেবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। কারণ হচ্ছে এই, বাংলাদেশে রাজনীতি নেই, তা তো নয়। রাজনীতি ও গণতন্ত্র দুটিই আছে বটে, তবে তা একদলীয় রাজনীতির মধ্যে মিলেমিশে আছে। সরকারের বাইরে আমি মনে করি এখনো বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় একটি দল, তারা কয়েকবার সরকার পরিচালনায় ছিল, এখনো তাদের অনেক কর্মী আছে, নেতা আছে এবং জনপ্রিয়তাও আছে। কিন্তু নানা কারণে তারা দাঁড়াতে পারছে না।

নতুন খবর হচ্ছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়েছেন, শর্ত সাপেক্ষে। এটা এক হিসেবে ভালো খবর। কিন্তু এতে বিএনপির কোনো উপকার হবে বা রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা বলা যায় না। কারণ তাঁর বয়সও হয়েছে আর তাঁর শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। তিনি রাজনীতি করবেন কি না বা সম্ভব হবে কি না, বলা যায় না। এখন তো সার্বিকভাবে রাজনীতি বন্ধ আছে। তিনি যদি সুস্থও থাকতেন, তাহলে যে কিছু করতে পারতেন, তা-ও না। এখন কোথাও কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। তবে তিনি যে ধারায় মুক্তি পেয়েছেন, সে ধারায় তিনি আগেও মুক্তি পেতে পারতেন। তাঁকে যে সরকার এই সময়ে মুক্তি দিয়েছে, এটা সরকারের একটা কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করি। তাঁর ওপর কোনো বিধি-নিষেধ না থাকলেও রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারত বলে মনে হয় না।

এরই মধ্যে কিছুদিন আগে দেশে নির্বাচন হয়ে গেল। সেখানে বিএনপি ভালো করতে পারেনি। সরকারদলীয় প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। এটাই আগে থেকে বোঝা গিয়েছিল বা ধারণা করা হয়েছিল যে তাঁরাই জিতবেন। বিএনপি বা শরিক দলের ভালো করতে পারার চেয়ে এখানে তারা হেরে গেছে, সেটা একটা দিক। তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেটা হচ্ছে, এমন একটা দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে নির্বাচন হতে পারল কী করে? এই নির্বাচনকে প্রহসন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

দু-একটি ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। মানুষ আতঙ্কের মধ্যে আছে। এর মধ্যে নির্বাচন হয় কী করে?

একটা দেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই বা গণতন্ত্র কতখানি আছে, তা বোঝা যাবে সে দেশের পক্ষপাতহীন নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই নির্বাচন হতে হবে সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে; যেখানে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই, ভীতি ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া নেই—এমন পরিবেশই তো কাম্য। কিন্তু এসব বলে কী-ই বা লাভ? কারণ এখানে সংসদ আছে; কিন্তু সেভাবে কার্যকর ও তুমুলভাবে সক্রিয়—এমনটা তো দেখা যায় না। দেশে বিরোধী দল আছে না নেই, সেটা তো পার্লামেন্টে সেভাবে দেখা যায় না। দেখা যাবে কী করে—বিরোধী দলকে নানাভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তারা না আন্দোলন করতে পারছে, না সংসদে গিয়ে জনগণের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে। পারছে না। কারণ সংসদ সেই অর্থে কার্যকর নয়। হ্যাঁ, সংসদ নিশ্চয়ই কার্যকর আছে, তবে সেটা বিরোধী দল ছাড়াই, শুধু সরকারি দল নিয়ে। এভাবে একটা দেশের সার্বিক সিদ্ধান্ত সেখান থেকে পরিচালিত হয়, সেই পার্লামেন্ট তো এভাবে চলতে পারে না। এসব নিয়ে আমরা নানা মাধ্যমে কথা বলেছি। কোনো লাভ হয়েছে বলে মনে হয় না।

যদিও নির্বাচনের আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছিলেন, ভয় পেলে ভোট দিতে যাবেন না। তিনি নিজেই এ কথা বলে নিয়ম ভঙ্গ করে তো নির্বাচনী কাজ শেষ করেছেন। ইচ্ছা করলেই এই নির্বাচনী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে পারতেন। আগের দিন ঘোষণা দিয়েও নির্বাচনী প্রগাপান্ডা বন্ধ করে দেওয়া যেত। তিনি তা করলেন না। এতে বোঝা যায়, ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মতো একটা নির্বাচন হোক, তিনি এটা চেয়েছেন।

আমাদের ধারণা ছিল যে খুব বেশি মানুষ ভোট দিতে আসবে না। আসেওনি। আর যেটা ধারণা করা হয়েছিল, সেটাই ঘটেছে। ৫.২৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। আমরা একটা আলোচনায় এই নির্বাচন বন্ধ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

সংবিধানে বাধ্যবাধকতা আছে যে ঘোষণার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু নিয়ম মেনে তো সব সময় কাজ হয় না। আর এটা তো দেখতে ভালো হলো না, এমন একটা পরিস্থিতিতে নির্বাচন। আমি নিজেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র। কাজেই আমরা কিছু বিষয় তো জানি। যেখানে বাইরে গেলে নিরাপত্তাহীনতার ব্যাপার আছে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, অসুখ, মহামারি ইত্যাদি দেখা দিলে নির্বাচন বন্ধ করা যায়; কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ইসি) তা করেনি। এতে বোঝা যায় যে এমন পরিস্থিতির পরও তারা নির্বাচন করে সরকারদলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করেছে।

একটা কথা বলা হয় যে ৫১ শতাংশ ভোট না পড়লে সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, যদিও এটা আইনে নেই। তবে যেভাবে নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে উঠেছে এবং মাত্র ৫.২৮ শতাংশ ভোট নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন সরকারদলীয় প্রার্থী, বোঝাই যায়, বেশির ভাগ মানুষ ভোট দেয়নি। যিনি এ নির্বাচনে জিতেছেন, তাঁর লজ্জা পাওয়া উচিত। কারণ মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এটাকে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা যায় না। কারণ মানুষ যে ভোট দিতে আসবে না, ভয় পাবে করোনা নিয়ে, তা সত্ত্বেও এভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে।

দেশের এখন যে পরিস্থিতি করোনাভাইরাস নিয়ে, অন্যদিকে তাকানোর সুযোগ নেই। কিন্তু অত্যন্ত শঙ্কার বিষয়, যারা বিদেশ থেকে আসছে তাদের তদারকি করা হচ্ছে না। যার যেমন ইচ্ছা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব খুব খারাপ কিছু উপহার দেবে বলে আমার ধারণা। এসব ক্ষেত্রে খুব শক্ত হাতে তদারকি করার দরকার ছিল।

নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে হয় না। আগেও করেনি, এখনো সেই অর্থে ভালো কিছু হচ্ছে না। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের নির্বাচন নিয়ে কত কথা হলো। পরে তো বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী মামলাও করেছেন। এতে কাজের কাজ কিছু হয়নি।

আমরা সব সময়ই বলে এসেছি, সুষ্ঠু রাজনীতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে মূল রাজনীতির বাইরে দেশে অবশ্যই একটা বিরোধী দল থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত বিএনপির বাইরে আমি আর কোনো বড় দল দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু বিএনপি দল হিসেবে থেকেও নেই। তারা মামলা ইত্যাদি নিয়ে নানাভাবে জর্জরিত। মামলার ভারে যেমন জর্জরিত, তেমনি দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়েছে। দলকে নতুন কিছু করতে হলে এবং উঠে দাঁড়াতে হলে সাংগঠনিক কাঠামো আগে ঠিক করতে হবে। যেকোনো সামাজিক ও জাতীয় ইস্যুতে আরো সক্রিয় হতে হবে। এখন যেহেতু কোনো রাজনৈতিক পরিবেশ নেই, তবে যতুটুক পারা যায় করোনায় পর্যুদস্ত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।

সরকার বলছে, খাদ্যের ঘাটতি নেই, কোনো সমস্যা হবে না। এত আত্মবিশ্বাস ভালো নয়। করোনার এই দুর্যোগ মুহূর্তে কৃষির ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। খাদ্যঘাটতি ও নানা ধরনের সমস্যা এখান থেকে কিছুটা হলেও পূরণ করা যাবে। এখন কৃষকদের প্রণোদনা দিতে হবে। কৃষি উপকরণ ও ঋণ দিয়ে তাদের পাশে থেকে উৎপাদন চালু রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন কৃষির উৎপাদন ব্যাহত না হয় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। খাদ্য মজুদ যা আছে, তাতে কয়দিন চলবে? সব কারখানা ও ফ্যাক্টরি বন্ধ, তাই কৃষিতে জোর দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প দেখছি না।  

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা