kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

তামাশারও একটা সীমা থাকে

রেজানুর রহমান

৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তামাশারও একটা সীমা থাকে

রাজধানীমুখী মানুষ ঠেকাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। কেন নির্দেশ দিতে হলো? নির্দেশ দিতে হলো এই জন্য যে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকেই তা মানছে না। ভিড় এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে; অথচ ভিড় করেই মানুষ ঢাকার দিকে আসছে। দলে দলে। কাজেই ঠেকাও রাজধানীমুখী মানুষের স্রোত। কিন্তু সেটা কি আদৌ সম্ভব? ধরা যাক, মহিউদ্দিন নামের কেউ একজন ঢাকায় থাকেন। ছুটি পেয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, ঢাকায় ফেরা দরকার। কেন আপনি তাঁকে বাধা দেবেন? কোন যুক্তিতে? তর্কের খাতিরে হয়তো তাঁকে বলা যেতে পারে—আপনাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে ঘরবন্দি থাকার জন্য। অথচ আপনি ঘর থেকে বের হয়েছেন, আপনি অপরাধী। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো! ভালো কথা। কিন্তু তাঁকে অপরাধ করার সুযোগ করে দিয়েছে কে? যখন পরিবারসুদ্ধ শহর ছেড়েছিলেন তখন তো কেউ তাঁকে বাধা দেয়নি। বলেনি, আপনি শহর ছাড়তে পারবেন না। যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। এখন কেন বলা হচ্ছে, আপনি ঢাকায় ফিরতে পারবেন না? এক যাত্রায় তো দুই নিয়ম হতে পারে না!

সরকারি ঘোষণায় বলা হলো, ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে সাধারণ ছুটি থাকবে। এই ছুটি গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু হঠাৎ করে ঘোষণা দেওয়া হলো, ৫ এপ্রিল সব গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান খুলে যাবে। চাকরি হারানোর ভয়ে দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে ঢাকায় ফিরতে শুরু করল গার্মেন্ট শ্রমিকরা। শুধু বেতনটা হবে—এই আশায় ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে মায়েরা হেঁটেছেন বহুদূরের পথ। আহ্! কী নিদারুণ কষ্ট। বারবার বলা হচ্ছে, করোনা থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। অথচ গায়ে গায়ে, পায়ে পায়ে, হাতে হাত ধরে ঢাকার দিকে আসছে জনস্রোত। হঠাৎ একটা তামাশা দেখানো হলো। হাজার হাজার অসহায় গার্মেন্ট শ্রমিকের সঙ্গে নির্দয় তামাশা। বাড়ি থেকে ডেকে এনে বলা হলো, কারখানা বন্ধ। এটা কোনো সভ্য দেশের ঘটনা হতে পারে!

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে দেখলাম হেঁটে, মিছিলের ভঙ্গিতে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত। দেখে বোঝার উপায় নেই দেশটি করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে আন্তরিক। ঢাকামুখী জনস্রোত দেখে অনেক নেতিবাচক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকামুখী জনস্রোত ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, যা কার্যত সম্ভব নয়। কারখানা খুলবে—এই খবর পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকের মিছিল ঢাকার দিকে ফিরছে, তাদের আটকাবেন কোন যুক্তিতে? গার্মেন্ট শ্রমিকরা তো কোনো অপরাধ করেনি। চাকরি বাঁচাতে তারা ঢাকামুখী হয়েছে। যদি অপরাধ কেউ করে থাকেন, তাঁরা কারখানা মালিক। কোন যুক্তিতে তাঁরা শ্রমিকদের ঢাকায় ডেকে আনলেন! এখন তাদের বলা হচ্ছে, কারখানা খুলছে না। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সব গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। বাহ্! কী তামাশা। মসকরারও একটা সীমা থাকা উচিত।

প্রাণঘাতী ভাইরাস কভিড-১৯ থেকে বাঁচতে সারা পৃথিবীতে যখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে তখন চলছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার লুকোচুরি খেলা! সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পর ঈদের ছুটির আনন্দে ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটতে শুরু করল অনেক মানুষ। লঞ্চে, বাসে, ট্রেনে গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে তারা গমন করেছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রামে যাওয়া বেশির ভাগ মানুষ সরকারের ‘ঘরবন্দি’ থাকার সিদ্ধান্ত মানেনি, মানছে না। বরং হৈ-হুল্লোড় করে বেড়াচ্ছে। রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়েছে। সেই মানুষগুলোই ১১ এপ্রিল সাধারণ ছুটি শেষে আবার গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে ঢাকায় ফিরবে। আমরা কি নিশ্চিত করে বলতে পারি, গ্রাম থেকে এবার যারা ঢাকায় ফিরবে, তাদের একজনের শরীরেও প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থাকবে না? একজনের শরীরেও যদি করোনাভাইরাস থাকে, তাহলে ভিড়ের হাজার হাজার মানুষকে সহজেই কাবু করে ফেলবে! আমরা কি এ ব্যাপারে সজাগ আছি?

গুটিকয়েক শহর ছাড়া দেশের আর কোথাও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার সরকারি পরামর্শ মানা হচ্ছে না! গাজীপুরের অদূরে মাওনা এলাকা থেকে আমার এক আত্মীয় জানালেন, এলাকার বাজার ও রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজনকে দেখলে সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে, চলে গেলেই আবার ফিরে আসে। করোনা যেন অনেকের কাছে হাসিঠাট্টা-কৌতুকের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি না হলে ভবিষ্যতে হয়তো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক, আনন্দ আলো

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা