kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থ কে দেখবে?

আবু তাহের খান

৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থ কে দেখবে?

করোনাজনিত পরিস্থিতিতে শিগগিরই যে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে, সে এক অনিবার্য বাস্তবতা। তবে সে ক্ষেত্রে এক দেশ থেকে অন্য দেশের পার্থক্য হবে শুধু এটুকু যে কোথাও তা অনেক আগেই শুরু হয়ে যাবে আবার কোথাও তা দেখা দেবে একটু পরে। একইভাবে মন্দার পরিধি ও মাত্রার ক্ষেত্রেও থাকবে এই তারতম্য। কোথাও হয়তো তা নিয়ন্ত্রণসীমার মধ্যে থেকে যেতে পারে আবার কোথাও তা নিয়ন্ত্রণসীমার বাইরে চলে গিয়ে সৃষ্টি করতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত মানবিক বিপর্যয়। তবে কোথায় কী ঘটবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে মন্দা-প্রস্তুতির ধরন ও পরিস্থিতি মোকাবেলার কৌশলের ওপর, যেমনটি লক্ষ করা গেছে করোনার চিকিৎসা পরিস্থিতি মোকাবেলার ক্ষেত্রে। উপযুক্ত কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে চীন, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়া একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে; অন্যদিকে তা করতে না পারায় চরম মূল্য দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে ইউরোপের অনেক দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রকে। ফলে এরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সর্বসাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশ কী করতে পারে, তা নিয়েই এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

করোনাপূর্ব সময়ের বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি প্রধান দুর্বলতা এই যে প্রবৃদ্ধির হারে অনেকখানি এগিয়ে থাকলেও মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে থেকেও দারিদ্র্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যেকোনো সময় ধপ করে এরা দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় দুর্বলতা, কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখলেও অপেক্ষাকৃত কম প্রবৃদ্ধি হারের এই খাতে জনসংখ্যার বিরাজমান আধিক্য সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এ খাতে কর্মরতদের একটি বড় অংশই ছদ্মবেকার, করোনার মতো পরিস্থিতিতে একটু চাপে পড়লেই যারা পূর্ণ বেকার হয়ে পড়তে পারে।

এদিকে করোনার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার এরই মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুদান তহবিল বরাদ্দ করেছে, যা মূলত পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদানে ব্যয় করবে। ধারণা করা যায়, ক্রমান্বয়ে অন্যান্য সংগঠিত খাতও সরকারের কাছ থেকে অনুরূপ অনুদান আদায় করে নিতে সক্ষম হবে এবং সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে যাদের যোগাযোগ যত নিবিড়, বাংলাদেশের সামাজিক অভিজ্ঞতা বলে, তারা তত বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, করোনাজনিত অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সহায়তার বেশির ভাগই যাবে বিত্তবান শ্রেণির হাতে, যারা ঝুঁকিতে পড়লেও তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু দারিদ্র্যঝুঁকিতে থাকা ৫০ শতাংশসহ নিম্ন আয়ের অপরাপর যে মানুষ আজ চরম বিপর্যয়ে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কার মুখে রয়েছে, তাদের কী হবে?

নিম্নবিত্তের সাধারণ মানুষের অবস্থা হবে করুণ থেকে করুণতর। এর মূল কারণ, নিম্ন আয় শ্রেণির মানুষ তাদের স্বার্থের প্রশ্নে বিত্তবান শ্রেণির মতো মোটেও সংগঠিত নয়। তৈরি পোশাক থেকে হিমায়িত খাদ্য, ওষুধ থেকে চামড়া, রিয়েল এস্টেট থেকে জনশক্তি রপ্তানি, ব্যাংকিং-বীমা থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যলয়, আমলা থেকে আড়তদার, চিকিৎসক থেকে প্রকৌশলী—সবারই নিজ নিজ গোষ্ঠী বা শ্রেণিভিত্তিক সমিতি বা সংগঠন আছে। তারা সবাই জানে কিভাবে চাপ প্রয়োগ করে অথবা ছলে-বলে-কৌশলে কিংবা প্রয়োজনে ব্ল্যাকমেইল করে দাবি বা আর্থিক সুবিধা আদায় করতে হয়। কিন্তু জমিতে খেটে খাওয়া কৃষক, মুটে-মজুর বা রিকশাচালক, ছোট্ট দোকানি অথবা ফুটপাতের বিক্রেতা, মাঝি-জেলে কিংবা পাহারাদার—নিম্ন আয় শ্রেণির এই সাধারণ মানুষের কারোরই কোনো সংগঠন নেই। ফলে তারা মোটামুটি বঞ্চিতই হবে।

উপমহাদেশের অতীত অভিজ্ঞতাও মোটামুটি এ আশঙ্কাকেই সামনে তুলে ধরে। এ অঞ্চলে অতীতে যতবারই বড় ধরনের বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামা, যুদ্ধবিগ্রহ বা অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হয়েছে ততবারই সুবিধাবাদী শ্রেণির মানুষ তাদের বিত্ত-বৈভব আরো বাড়িয়ে তুলেছে। বিপরীতে বিত্তহীন বা নিম্নবিত্তের মানুষ নিঃশেষিত হতে হতে মৃত্যু বা চূড়ান্ত মানবেতর জীবনের মুখে নিপতিত হয়েছে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে বিশেষভাবে পরিচিত, শুধু বাংলায়ই ৩০ লাখ মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। তবে তা খাদ্যের অভাবে নয়, পর্যাপ্ত খাদ্য থাকা সত্ত্বেও সামর্থ্যের অভাবে তা ক্রয় করতে না পারার কারণে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বছরে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদনকারী বর্তমান বাংলাদেশে, যেখানে মানুষের গড় মাথাপিছু আয় প্রায় এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার, সেখানে তেমন পরিস্থিতির আর কখনোই পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। তবে পাশাপাশি এটাও সত্য যে স্বাধীনতা-উত্তর গত ৪৯ বছরের মধ্যে সম্পদের এমন চরম বৈষম্যও এ দেশে আর কখনো দেখা যায়নি।

এ অবস্থায় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিবেকবান প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের কাছে প্রথম প্রস্তাব : করোনাজনিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় খণ্ড খণ্ড ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একসঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। তা না হলে কম অগ্রাধিকার খাতে অর্থ বরাদ্দ বা ব্যয় হয়ে যাওয়ার পর অধিক জরুরি খাতের জন্য অর্থের ঘাটতি দেখা দিতে পারে এবং এতে সম্পদের ব্যাপক অপচয় ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রস্তাব : কৃষি খাতের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করুন। কারণ অর্থনৈতিক মন্দা বা বিপর্যয় দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত এই কৃষিই হবে আমাদের বাঁচার মূল রক্ষাকবচ। অথচ সত্য এই যে কৃষির পক্ষে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করার মতো কোনো সংগঠন কৃষকের নেই, যেমনটি অন্যান্য খাতে রয়েছে। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০৮-০৯-এর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময় অনেক শক্তিশালী দেশই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়লেও বস্তুত এই কৃষি খাতের কারণেই বাংলাদেশকে তা খুব একটা কাবু করতে পারেনি। সরকার যেন তার মন্দা মোকাবেলা কর্মসূচিতে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে।

তৃতীয় প্রস্তাব : ২০২০-২১ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে কৃষক ছাড়াও নিম্ন আয় গোষ্ঠীর অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য যেন জীবিকাসহায়ক ও জীবনধারণমূলক পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে। সে ক্ষেত্রে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), সামাজিক বনায়ন ইত্যাদির আওতা সম্প্রসারণ করে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। গ্রামীণ নারীদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিআরডিবি, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান যাতে উৎসাহব্যঞ্জক মূল্যে কিনে নেয়, তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। আর গ্রাম ও শহর—সর্বত্র আরো ব্যাপক হারে টিসিবি কর্তৃক ন্যায্য মূল্যে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে।

চতুর্থত : মন্দা দেখা দিলে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে গ্রামের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাবে। এই ঝরে পড়ার হার রোধকল্পে বিদ্যালয়গুলোর জন্য খাদ্য ও শিক্ষা উপকরণের বিতরণ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে তেমনি তা দরিদ্র পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তার পরিমাণ বাড়াতেও কাজে আসবে।

পঞ্চমত : সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে ঝুঁকি মোকাবেলার সামর্থ্য আছে এমন বিত্তবান শ্রেণির জন্য আর্থিক প্রণোদনা দানের বিষয়টি যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে এই বিপদের দিনে স্বল্প আয়ের ও স্বল্পবিত্তের মানুষের আর্থিক সহায়তাদানের বিষয়টি বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।

সব মিলিয়ে মূলকথা হচ্ছে, ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত নিম্ন আয় গোষ্ঠীর অসংগঠিত সাধারণ মানুষকে প্রস্তাবিত সমন্বিত পরিকল্পনার (যদি তা গ্রহণ করা হয়) একেবারে প্রথমেই স্থান দিতে হবে। তা না হলে করোনাজনিত অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবেলায় অনাকাঙ্ক্ষিত করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনা থেকে বলব, দেশে বর্তমানে যে চরম বৈষম্য ও বৈষম্যমুখী প্রবণতা বিরাজ করছে, আসন্ন মন্দার কালে দরিদ্রের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সে বৈষম্য আরো বেড়ে যাবে, যা বৈষম্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম করে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে কারোরই কাম্য হতে পারে না।

 

লেখক : পরিচালক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা