kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

প্রতিকারেই বেশি মনোযোগ দিতে হবে

অনলাইন থেকে

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানবতা ও প্রাণঘাতী ভাইরাসের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে। সোয়াইন ফ্লুর আগ পর্যন্ত মানুষের কাছে এই প্রতিযোগিতা খুব একটা পরিচিত ছিল না। ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই (সোয়াইন ফ্লু) ছিল প্রথম বড় ধরনের মহামারি। যুক্তরাজ্যে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ে ২০০৯ সালে। পাঁচ শর কম মানুষ মারা যায়। সে সময় যুক্তরাজ্য এই ভেবে আত্মতুষ্টি লাভ করে যে তাদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যেকোনো নতুন সংক্রামক ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করতে পারবে। সরকার সিদ্ধান্তে আসে, প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে, তবে তাতে অসহনীয় পর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতি হবে না। এ কথা লেবার সরকারের আমলে যেমন সত্য ছিল, তেমনি কনজারভেটিভ সরকারের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। গর্ডন ব্রাউনের আমলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অ্যালেন জনসন ২০০৯ সালে এক তদন্ত বোর্ডের সামনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে স্বীকার করেন, ‘আমাদের বিদ্যমান নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা (আইসিইউ) মহামারি বিপর্যয়কর হয়ে উঠলে সামাল দিতে পারবে না।’ এই পরিস্থিতিতে সেই সময় থেকে এখনকার লকডাউনের সময় পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এ কারণেই ঝুঁকির প্রকৃতি পাল্টে গেছে। সোয়াইন ফ্লুর চেয়ে এই করোনাভাইরাস ৫০ গুণ বেশি শক্তিশালী। খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে এটি। এখন বিশ্বায়ন অনেক বেশি। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি। বিশেষ করে যাঁরা ঘন ঘন ভ্রমণ করেন বা এমন লোকদের সংস্পর্শে বাস করেন। এঁদের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের একটি ভাইরাসকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে—বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই বিপর্যয়কর। এই ভাইরাস যেকোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। এমনিতেই শীতকালীন ফ্লু সামাল দিতে বেশির ভাগ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা হিমশিম খায়।

এই ভাইরাস আক্রমণের পর আমাদের সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ভেন্টিলেটরের চাহিদা বাড়ছে। অথচ সরবরাহ খুবই সীমিত। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত গুরুতর অসুস্থ রোগীরা এই ভেন্টিলেটর ব্যবহার করেই শ্বাস নেন। যেসব স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে এই করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন তাঁদের মধ্যে তীব্র ভীতি রয়েছে। এখানেও সমস্যা ‘ঘাটতির’। স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করাও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কম পরীক্ষার কারণে ভাইরাসটি শনাক্ত করা যাচ্ছে না। পরীক্ষা করা গেলে মৃত্যুহার হয়তো কিছুটা কমিয়ে আনা যেত। কারণ এর মাধ্যমে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

তবে পরীক্ষা করার জন্য কর্মী, সরঞ্জাম ও রাসায়নিকের প্রয়োজন। সমস্যা হচ্ছে, জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার (এনএইচএস) এই পরীক্ষা করার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। সরবরাহের ব্যাপারেও উদ্বেগ রয়েছে। ইতালির লম্বার্ডি পরীক্ষণসামগ্রীর বড় বাজার। ইউরোপে এই শহরটিই করোনাভাইরাসের আক্রমণে সবচেয়ে বিপর্যস্ত। বিশ্বজুড়েই এখন পরীক্ষা কিটের রাসায়নিকের চাহিদা প্রবল। ব্রিটিশ মন্ত্রী মাইকেল গভ সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে যে পদ্ধতি প্রয়োগ করে সফল হয়েছে, ব্রিটেনকেও এখন সেই পথই অনুসরণ করতে হবে।

গত জানুয়ারিতে যখন দক্ষিণ কোরিয়ায় এই ভাইরাসটি ছড়াতে শুরু করে তখন তাদের কাছে এর পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিট ছিল। তাদের এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার প্রধান পদ্ধতিটিই ছিল বেশি বেশি পরীক্ষা, কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা। তবে ফ্রান্সের কভিড-১৯-এর সঙ্গে লড়াইকারী প্রধান কর্মকর্তা জ্যাঁ ফ্রাংকোয়েস ডেলফ্রেইসির গত মাসের শেষ দিকে সতর্ক করে বলেন, ‘এখনকার সময়টি সহজ নয়, খুব কঠিন। তিনি আরো বলেন, পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। এগুলো মূলত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া যায়। চীনে এখনো উৎপাদন পুরোপুরি শুরু হয়নি। আর যুক্তরাষ্ট্র এগুলো নিজেদের জন্য রেখে দিয়েছে।’

এখন যা প্রয়োজন তা হচ্ছে আরো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যাতে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে চীনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। গত ২০ বছরে এই দেশটি শ্বাসযন্ত্রে আক্রমণ করা পাঁচটি ভাইরাসের মহামারি মোকাবেলা করেছে। জার্মানির স্বাস্থ্যব্যবস্থা সফলভাবে এই ভাইরাসের মোকাবেলা করতে পারছে, যা অন্য দেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। ইউনির্ভাসিটি কলেজ অব লন্ডনের ঝুঁকিবিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড আলেকজান্ডার নিউ স্টেটসম্যানকে বলেন, ‘মহামারির মোকাবেলা করতে গেলে যা প্রয়োজন তা হলো সরকারকে সেই কথাটি বলা, যা তারা শুনতে চায় না, তাদের এমন একটি ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করতে বলা হবে যে প্রেক্ষাপট তাদের দৃষ্টিতে কখনোই তৈরি হবে না। আর অর্থও তাদের কাছে নেই।’

প্রতিবছর যুক্তরাজ্যে নানা অসুখে ছয় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে কভিড-১৯-এ এর দ্বিগুণ মানুষ মারা যাবে এবার। এনএইচএস এর মোকাবেলা করতে পারবে না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কেউ জানে না কী ঘটতে চলেছে, এমনকি বিজ্ঞানও না। তবে এই পরিস্থিতি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তার ক্ষেত্রে আমাদের কী করতে হবে।

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা