kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

মহাদুর্যোগ কভিড-১৯ ও বাংলাদেশ

খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মহাদুর্যোগ কভিড-১৯ ও বাংলাদেশ

এই প্রবন্ধ যখন লেখা হচ্ছে তখন বিশ্বে কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা ৯ লাখের কাছাকাছি এবং মৃত্যুসংখ্যা ৪৫ হাজারের অধিক। বাংলাদেশে সরকারি পরিসংখ্যানে মৃত্যুসংখ্যা পাঁচ ও আক্রান্তের সংখ্যা ৫১। বিশ্বের ২০১টি দেশে কভিড-১৯ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুতে বিশ্বের ৫০ মিলিয়ন মানুষ মারা যাওয়ার পর প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ ধরনের ঝুঁকিতে সারা বিশ্ব উপলব্ধি করতে পারছে রাষ্ট্র-রাষ্ট্র যুদ্ধ, জাতিগত দাঙ্গা, সহিংসতা, দুর্ভিক্ষ থেকেও কতটা ভয়ংকর এ ভাইরাস। করোনা গ্রুপের সংক্রামক রোগ যথা—SARS-COV-2 যখন বিস্তার লাভ করেছিল তখন এর বৈশিষ্ট্য ছিল র‌্যান্ডম মিউটেশনের মাধ্যমে বিস্তার ঘটানো; কিন্তু কভিড-১৯-এর ব্যতিক্রম এবং প্রতিনিয়ত জিন মিউটেশনের মাধ্যমে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। প্রচলিত কোনো প্রতিষেধক এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নয়। নতুন প্রতিষেধক আবিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চললেও কবে নাগাদ আবিষ্কারের মাধ্যমে এটি বাজারজাত হবে, তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

বাংলাদেশে এ ভাইরাসে যাদের মৃত্যু ঘটেছে এবং যেসব রোগী শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন আছে, তাদের বেশির ভাগই হয় বিদেশফেরত অথবা তাদের পরিবারের সদস্য। উল্লেখ্য, জানুয়ারি থেকে মার্চের ২৯ তারিখ পর্যন্ত ছয় লাখের অধিক প্রবাসী বাংলাদেশে এসেছে, যাদের বেশির ভাগই ‘হোম কোয়ারেন্টিন’-এর কথা বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। তারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে নিজেদের বাড়ির বাইরে জনসাধারণের সঙ্গে অবাধে মিশেছে, এমনকি নিজের বাড়িতে পরিবারের অন্য সদস্যদের মাঝে অবাধে মেলামেশা করে বড় ধরনের ঝুঁকি ও নাজুকতা সৃষ্টি করেছে। বলে রাখা ভালো, আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, যারা এরই মধ্যে মারা গেছে এবং করোনায় আক্রান্ত তাদের বেশির ভাগ প্রবাসী বাঙালি, যারা দেশে ফিরেছে এবং তাদের পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সদস্য। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে করোনা বিস্তার রোধে টোটাল লকডাউন বা আংশিক লকডাউনের কথা বলেছে, এমনকি প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা জারি করার জন্য বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে দেশে আংশিক লকডাউন কার্যকর করেছে।

কভিড-১৯ মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। কাজেই এটি মোকাবেলায় সবচেয়ে জরুরি যে পদক্ষেপ দরকার সেটি হলো প্রিভেনশন বা প্রতিকার। আর এই প্রতিকারের প্রথম ধাপ হচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির নিরাপদ দূরত্ব নির্বাহ (কমপক্ষে ছয় ফুট)। হাট-বাজার, দোকানপাট, যানবাহন সর্বত্র এ নির্দেশ মেনে চলা জরুরি। যেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশি থেকে এ রোগ ছড়ায় সেহেতু হাঁচি ও কাশির সময় হাতের কনুই বা টিস্যু পেপার/রুমাল ব্যবহার জরুরি। নিজের হাত কোনো অবস্থায়ই নাক, মুখ ও চোখে না দেওয়া। প্রতিনিয়ত সাবান পানি/স্যানিটাইজার/হ্যান্ডরাবের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকিমুক্ত রাখা। যারা অসুস্থ তাদের সংস্পর্শ থেকে নিরাপদ দূরে রাখা। বাড়িতে সার্বক্ষণিক অবস্থান করা। যেসব বয়স্ক লোকের হার্ট, লাং, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস প্রভৃতি সমস্যা ও ব্যাধি রয়েছে তাদের বাধ্যতামূলক বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা এবং সাবান বা অন্যান্য জীবাণুনাশক দিয়ে হাত ধোয়ানোর ব্যবস্থা করা। লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে স্থানান্তর করা। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে হাঁচি-কাশি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। নবজাতকের ক্ষেত্রেও অতি বেশি সতর্কতা অবলম্বন দরকার। যারা অ্যাজমা রোগী তাদের অবশ্যই বেশি সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনোভাবেই নাক, গলা, লাং আক্রান্ত না হয়। বিশেষ করে নিউমোনিয়ার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, কভিড-১৯ বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে মারাত্মক ও মহাদুর্যোগের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এ মহাদুর্যোগ ও মহামারি প্রতিরোধ ও মোকাবেলায় সব শ্রেণি-পেশার জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি ও নাজুকতা নির্ণয় করতে হবে। কারণ সব জনগোষ্ঠী একই ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি নয়। কাজেই কভিড-১৯ ঝুঁকি নিরসনের পূর্বশর্ত হবে ঝুঁকিকে নিরূপণ করা, যার পূর্বশর্ত হলো বাস্তবে করোনা আক্রান্ত রোগীকে শনাক্তকরণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। বলা দরকার, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক করোনা রোগী শনাক্তকরণ সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি জেলায় এ ব্যবস্থা নিতে হবে দ্রুততম সময়ে। অবশ্য এরই মধ্যে সরকার বিভাগীয় পর্যায়ে করোনা শনাক্তের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দিকনির্দেশনা দিয়েছে। যেসব এলাকা/অঞ্চলে বিদেশফেরত জনগোষ্ঠী অবস্থান করছে, সেসব এলাকা অতি দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের করোনা শনাক্তকরণের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশও প্রশাসন থেকে এসেছে। বর্তমান ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে নাজুক জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কার্যকর অ্যাকশন প্ল্যানের মাধ্যমে করোনাঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র ও নাজুক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এলাকা/অঞ্চলভিত্তিক চিহ্নিত করা জরুরি। পাশাপাশি কন্টিনজেন্সি প্ল্যানের মাধ্যমে ঝুঁকি ও নাজুকতা ম্যানেজ করার সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করা। সারা দেশে এ মুহূর্তে যে পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে করোনা মোকাবেলার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সেগুলো নিম্নরূপ:

অতি দ্রুত মেকশিফট হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে করোনা রোগীর চিকিৎসার প্রস্তুতি, বিশেষ করে প্রতিটি জেলায় এটি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোর, জেলা সদর হাসপাতাল, প্রাইভেট ক্লিনিকের সবাইকে জরুরি সেবার আওতায় এনে সমন্বয় সাধন করতে হবে। দেশের উল্লেখযোগ্য ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানিগুলোকে অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াশ, হ্যান্ডরাব ও জীবাণু নিরোধক লিকুইড সাবান তৈরি করে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারকে হস্তান্তর করতে হবে। গার্মেন্টশিল্প অবিলম্বে স্বাস্থ্যসম্মত ও অধিক নিরাপদ মাস্ক তৈরি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে সরবরাহ করবে। মহামারি প্রতিরোধে মেডিক্যাল ডাক্তার ও স্টাফের পাশাপাশি পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞ, দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবীর সমন্বয়ে এবং জরুরি সার্ভিসসমূহ যথা—ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস, সিভিল সার্জন, উপজেলা হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, স্থানীয় সরকারের জেলাভিত্তিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে সমন্বয়ের মাধ্যমে টাস্কফোর্স গঠন করে সারা বাংলাদেশে করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এসব মাঠ পর্যায়ের সেবা প্রদানকারীদের সুরক্ষার জন্য ‘প্রটেকটিভ কিটস’ তৈরির ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে; শুধু বিদেশ মুখাপেক্ষী হলেই চলবে না, বরং শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী হতে হবে। করোনা শনাক্তকরণের জন্য গণস্বাস্থ্য টিম এরই মধ্যে যে সফলতা দেখিয়েছে তা দ্রুত অপারেশনাল স্টেজে নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্র্যাশ প্রগ্রাম নিতে হবে এবং সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন মেকশিফট হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে কার্যকর প্যাথলজি ইউনিট খোলার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। সারা বাংলাদেশকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে ফুডব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে বেকার, দুস্থ, ভূমিহীন, অসহায় ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে তাদের দোরগোড়ায় নিয়মিত খাবার ও সুপেয় পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। হেলথ ও হাইজিন নির্বাহের জন্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। আতঙ্কগ্রস্ত না হওয়ার লক্ষ্যে সব পর্যায়ের মানুষকে নানা ধরনের কার্যকর করণীয় বিষয়ে ব্যাপক প্রচার ও সম্প্রচার চালানো অত্যন্ত জরুরি। বিত্তবানদের এই মহাবিপর্যয়ে তাদের উদ্বৃত্ত রিসোর্সসমূহ সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব নিরসনে সরকারের সংশ্লিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে দিতে হবে, যাতে আপত্কালীন ফান্ড/রিসোর্সের বাজার স্টক করা যেতে পারে। সরকারের আপত্কালীন ফান্ড স্থাপন ও দ্রুত অবমুক্তির মাধ্যমে সব ধরনের প্রয়োজন মেটানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে বাজেট ও এডিবি থেকে অর্থ জরুরি তহবিল বা এনডোর্সমেন্ট ফান্ডে হস্তান্তর করতে হবে। সর্বোপরি এটি কারো একক দায়িত্ব নয়, বরং ধনী-দরিদ্র্য, জাতি-গোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ, নৃগোষ্ঠী, জেন্ডার নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে নিজেদের সুরক্ষার মাধ্যমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া যদি দ্রুততম সময়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সক্ষম হয়, বাংলাদেশও পারবে এই মহামারি তথা মহাদুর্যোগকে রুখতে। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের নিমিত্তে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল স্থাপন করতে হবে। হাসপাতালের জরুরি সেবায় নিয়োজিত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা, ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের জন্য সুরক্ষাবিষয়ক পরিবহনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য দরকার কার্যকর স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সঠিক ও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেগুলোর বাস্তবায়ন।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা