kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

সময়ের প্রতিধ্বনি

মানুষ মানুষের জন্য

মোস্তফা কামাল

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মানুষ মানুষের জন্য

‘মানুষ মানুষের জন্যে

জীবন জীবনের জন্যে

একটু সহানুভূতি কি

মানুষ পেতে পারে না; ও বন্ধু’

বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকার সেই কালজয়ী গান ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ আজও মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। আজও মানুষকে ভাবায়। মানুষের চেতনাকে শাণিত করে; জাগিয়ে তোলে। ভূপেন হাজারিকা আমাদের মাঝে নেই। আছে তাঁর গান। মানুষ বিপদাপন্ন হলে এই গান যেন আরো বেশি করে আমাদের মাঝে ফিরে ফিরে আসে।

আমরা মানুষ হয়ে অসহায় মানুষের পাশে কি দাঁড়াচ্ছি? অবশ্যই অনেকে দাঁড়াচ্ছেন। আরো অনেক বেশি মানুষকে আমরা দেখতে চাই। আসুন, আমরা মানবতার হাত বাড়াই। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াই। দেখুন, বাইরে ওরা একমুঠো খাবারের জন্য হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করছে।

ওদের কোনো কাজ নেই। তাই রোজগারও নেই। একজন অসহায় মা তাঁর সন্তানের মুখে খাবার দিতে পারছেন না। সেই মায়ের যন্ত্রণাটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন! তাঁর সন্তান যখন খাবারের জন্য কান্নাকাটি করে, তখন তিনি কতটা অসহায় বোধ করেন!

হঠাৎ বেকার হয়ে যাওয়া বাবা যখন তাঁর সন্তানের মুখে আহার জোগাতে ব্যর্থ হন, তখন তাঁর মনের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করুন। তিনিই হয়তো সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এই কঠিন বিপদে তাঁর যাওয়ার জায়গা কোথায় বলুন!

ভালোই তো ছিল সব কিছু। কেন হঠাৎ এমনটি ঘটল? এতে কি ওই অসহায় মানুষগুলোর কোনো হাত ছিল? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে ওই লোকগুলো কেন খাবারের কষ্ট পাবে? কেন একমুঠো ভাতের জন্য হাত পাতবে?

আমরা মানুষ হয়ে কি ওদের পাশে দাঁড়াব না! ওদের কষ্টের সময় সহানুভূতির হাত বাড়াব না!

তাহলে আর আমরা কিসের মানুষ!

মানুষের মানবিক গুণাবলিই যদি না থাকবে তাহলে কিসের মানুষ আমরা! মানবিকতাই তো মানুষের আসল পরিচয়!

আমাদের অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা হয়ে না যায়! আমরা যেন আমাদের সহানুভূতির পরশ দিয়ে অসহায়কে সাহস জোগাতে পারি! তার কাঁধে হাত রেখে বলতে পারি—ভয় নেই, শঙ্কিত হয়ো না। আমরা তোমাদের পাশে আছি।

করোনাভাইরাস এমন এক অজানা আতঙ্ক যে বিশ্বের কোনো দেশই এর থেকে মুক্ত হতে পারেনি; নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। পৃথিবীর সব মানুষই অজানা আতঙ্কে ভুগছে। এই বুঝি করোনাভাইরাসের কবলে পড়ছে!

মানবজাতির ওপর প্রকৃতির এ এক ভয়ংকর শাস্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। সামান্য একটি ভাইরাস, যা চোখে দেখা যায় না, অথচ তার ভয়ে সবার ঘুম হারাম!

প্রকৃতি নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময়ের জন্য এই ভাইরাস পাঠায়নি। প্রকৃতিই একসময় ভাইরাসটির কার্যশক্তি বিনাশ করে দেবে। কিংবা ভাইরাসটির বিস্তার রোধ করবে। কিন্তু মানবজাতি এর থেকে কি কোনো শিক্ষা নেবে?

আমরা যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি, দেশে দেশে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য শক্তিধর দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে। প্রযুক্তির উত্কর্ষ দেখানোর জন্য চাঁদে মানুষ পাঠাচ্ছে। আবার রোবট বানিয়ে তা দিয়ে কাজ করাচ্ছে। এই মানুষই তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কম্পিউটারসহ অত্যাধুনিক অনেক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা কতটুকু এগিয়েছে? বিশ্বের কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এই খাতে?

প্রতিবছর বিশ্বের কত মানুষ ক্যান্সারে মারা যায়? কত মানুষ লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে ভুগতে ভুগতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে? এ ধরনের রোগের চিকিৎসার জন্য কেন এখন পর্যন্ত একটি টিকা আবিষ্কার করা গেল না?

বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আবিষ্কারে এত এত টাকা যদি আমরা খরচ করতে পারি, তাহলে কেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্কর্ষসাধনে বড় বিনিয়োগ হলো না? পৃথিবী ধ্বংস করার জন্য তো মারণাস্ত্রের দরকার নেই। তার জন্য ছোট্ট একটি ভাইরাসই যথেষ্ট। তাহলে শুধু শুধু কেন পারমাণবিক অস্ত্রের বড়াই? সেই বড়াই এখন কোথায়?

আমার আশা, এবারের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বনেতারা শিক্ষা নেবেন এবং পারমাণবিক খাতে ব্যয় না করে সেই অর্থ চিকিৎসাবিজ্ঞান খাতে ব্যয় করবেন, যাতে যেকোনো ভাইরাসের টিকা কিংবা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন না হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান কতটা পিছিয়ে আছে তা ক্যান্সার ও লিভারের সমস্যায় মৃতের হার দেখলেই বোঝা যায়। এ দুটি রোগে আক্রান্ত হলে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসাই করাতে পারে না। কেন এর জন্য টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হলো না? এটা কি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যর্থতা নয়? এ ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে হবে। তা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক মোকাবেলায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আবিষ্কারের ব্যাপারেও মনোযোগ বাড়াতে হবে। কারণ এত বড় ধাক্কা তো বিগত পাঁচ শ বছরেও আসেনি।

যদিও আমরা লক্ষ করছি, বিভিন্ন দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ওষুধ আবিষ্কারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কেউ বলছেন, এক মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন। কেউ বলছেন ছয় মাস সময় লাগবে।

আবার কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রায় করোনাভাইরাস খুব বেশি ছড়াতে পারে না। তাই শীতপ্রধান দেশগুলোতে আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। মারাও যাচ্ছে বেশি। গরমপ্রধান অঞ্চল, বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলের গরমপ্রধান দেশগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

ধর্মবিশ্বাসীরা করোনাভাইরাসকে আসমানি বালা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, মুসলমান আক্রান্ত কম হবে। বিশেষ করে যাঁরা নামাজ-রোজা করেন, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখেন, তাঁদের তেমন কিছুই হবে না।

আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে অবশ্য নামাজির সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। মুসল্লিরা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে বলছেন, তিনি যেন বালা-মুসিবত দূর করে দেন।

আমরা সবাই জানি, করোনাভাইরাস প্রথম ছড়ায় চীনের উহান থেকে। তখন বলা হয়েছিল, চীন নিজেরাই ভাইরাসটি তৈরি করে ছেড়ে দিয়েছে। তা না হলে সে দেশের বেশি মানুষ কেন মারা যায়নি, কিংবা আক্রান্ত হয়নি? এখন বলা হচ্ছে প্রকৃতির শাস্তি কিংবা আসমানি বালা।

করোনাভাইরাসকে যা-ই বলা হোক, এটি মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত, সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। করোনার ভয়ে সারা বিশ্ব আজ কাঁপছে। অজানা আতঙ্কে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এর মধ্যেই বিশ্বের ২০৪ দেশে আক্রান্ত হয়েছে ১১ লাখের বেশি মানুষ। মৃতের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা।

এখনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি বলেই মানুষ প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করছে।

আমরা জানি, এই রাজধানী শহরের এবং এই দেশের কয়েক কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত। আবার কয়েক কোটি আছে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এদের বেশির ভাগই লজ্জায় হাত পাততে পারে না। অথচ তাদের ঘরে খাবার নেই। সন্তানগুলো ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। এই মানুষগুলো বড় অসহায়। এরা হচ্ছে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এদের খোঁজ কেউ রাখে না।

এদের পরিবারে হয়তো একজন চাকরি করেন। সেই একজনের ওপর পাঁচ-সাতজন সদস্যকে নির্ভর করতে হয়। তার ওপর লেখাপড়ার খরচও আছে। এদের আবার অনেক বেশি সামাজিকতা থাকে। আত্মীয়-স্বজন থাকে। সেগুলো যথাযথভাবে করতে না পারলে চলে না। সব মিলিয়ে এরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে আছে। পারলে এদেরও সহায়তা করুন।

অবশ্যই সাহায্য করতে গিয়ে ক্যামেরায় ছবি তুলবেন না। আপনি যে সাহায্য করছেন তা মানুষকে জানাবেন না। ওই সাহায্য তার দরকার নেই। একজনকে সাহায্য দিয়ে হাজারজনকে করেছেন বলে মিথ্যা প্রচার করবেন না। এমন সাহায্য তারা চায় না।

সৃষ্টিকর্তাকে যদি বিশ্বাস করেন তাহলে তাঁর একটি বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখুন। তিনি পবিত্র কোরআনে বলেছেন, তোমরা এমনভাবে সাহায্য করো, যেন ডান হাতেরটা বাঁ হাত আর বাঁ হাতেরটা ডান হাত না জানে।

এর অর্থ কী? আমরা কি একবারও চিন্তা করে দেখেছি? আমরা যা করছি তা কি ভেবেচিন্তে করছি? আমরা যদি সত্যি সত্যিই মানবিক হয়ে থাকি তাহলে তো আমাদের এত হাঁকডাক করা উচিত নয়। সাহায্য দেওয়ার নামে এত ঢোল পেটানো উচিত নয়।

অথচ কিছু মানুষকে দেখি, তারা সাহায্যের নামে ঢোলবাদ্য বাজিয়ে সবাইকে অস্থির করে তোলে। সবাইকে জানিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বলে, আমি এত এত লোককে সাহায্য করেছি। আসলে তারা সাহায্যের নামে নিজেদের প্রচার করে বেড়ায়। এদের আর যা-ই হোক, মতলব ভালো নয়। এদের চিনে রাখুন।

সব শেষে শক্তিমান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ভাষায় বলতে চাই—

‘মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।

মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও।

মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।’

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক

কালের কণ্ঠ ও সাহিত্যিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা