kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

আসুন, আগে মানুষ বাঁচাই

ড. আতিউর রহমান

৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



আসুন, আগে মানুষ বাঁচাই

বিশ্বজুড়েই চলছে তাণ্ডব। করোনাঝড়ে উবে গেছে বিশ্বের ৫৩ হাজার প্রাণ। সব কিছু থমকে আছে। অর্থনীতির চাকা বন্ধ। সামাজিক দূরত্বে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে মানুষ। প্রকৃতি খানিকটা স্বস্তিতে আছে। ধীরে ধীরে পৃথিবীটাই বদলে যাচ্ছে। মনে হয়, পুরনো পৃথিবীকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। পুরনো অনেক অভ্যাস, চাওয়া-পাওয়া বদলে যাবে। ডিজিটাল জীবনচলা, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি মানুষকে কি আর আগের মতো থাকতে দেবে? যারা নিঃস্ব, যাদের চালচুলা নেই, তাদের কী হবে? তাদের হাতে স্মার্টফোন নেই। তাদের নতুন কাজের দক্ষতাও নেই। তাদের বাঁচার উপায় কী? আমরা কি সত্যি জানি তারা এখন কিভাবে বেঁচে আছে। কী খাচ্ছে? কী করছে? আমরা তো প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরে বসেই প্রিয়জনের মুখ দেখতে পাচ্ছি। অফিসের ও বাইরের অনেক কাজও করতে পারছি। কিন্তু তারা তো এই নয়া ধারার পৃথিবীর সঙ্গে অভ্যস্ত নয়।

করোনাক্রান্ত সারা পৃথিবীর মতোই বাংলাদেশের প্রান্তজনের দুর্দশার শেষ নেই। সরকার তার সাধ্যমতো করছে। কিন্তু সমাজ কী করছে? অতিধনীদের অতিমানবীয় সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ তো সেভাবে চোখে পড়ছে না। তবে ব্যতিক্রমও আছে। এই দুর্দিনে সরকারের কাছ থেকে আরো কতটা আদায় করা যায় তারই কসরত চলছে দিবানিশি। এবারের মানবিক বিপর্যয়টা অন্য রকম। খুবই ভয়ের। ছোঁয়াচে রোগের শঙ্কা বিরাজমান। তবু তো নয়া প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে মানুষ বাঁচানোর সংগ্রামে শামিল হওয়া যায়। তবে ধীরে হলেও মানুষ জাগছে।

হঠাৎ করেই পৃথিবীজুড়ে নেমে এসেছে এই মানবিক দুর্যোগ। শুরুটা চীনে হলেও একেবারে কাবু করে ফেলেছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে। প্রতিদিনই অসংখ্য প্রাণ যাচ্ছে এ দুই অঞ্চলে। এদের মধ্যে আমাদের আপনজনরাও আছেন। বাঁচার টানেই অনেকে পাড়ি জমিয়েছিলেন এসব উন্নত দেশে। কিন্তু এই মহামারি উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও যে এমন করে তছনছ করে দেবে তা কি জানতাম! বাঙালি অনেক ডাক্তারকেও এরই মধ্যে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। অনেকেই আতঙ্কে স্বদেশে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁরা হয়তো জানতেন না যে তাঁদের কারণে তাঁদের নিকটাত্মীয়দের জীবনে এই মারণব্যাধির ঝুঁকি তৈরি হবে। আমরাও শুরুতে হয়তো এর ভয়াবহতা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এখন আমাদের সবারই সংবিৎ ফিরেছে। সরকার, অসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, পরিবারসহ সবাই আমরা চেষ্টা করছি একই দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য। গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এবারের এই দুর্যোগ গেল বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়ানক। বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই ধুঁকছিল। আরেকটি বিশ্বমন্দা দরজায় দাঁড়িয়ে যখন, তখনই এলো এই অদৃশ্য শত্রুর মহা আক্রমণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিও আজ সারা বিশ্বের সঙ্গে জড়াজড়ি করে আছে। আমাদের প্রধানতম রপ্তানি খাত, রেমিট্যান্স, কৃষিপণ্য—সব কিছুই বিশ্বের হাল-হকিকতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই আমাদের অর্থনীতি ও সমাজে যে এই দুর্যোগের প্রভাব পড়বে তা তো জানা কথা। তবে এই মুহূর্তের উদ্বেগ অর্থনীতি নয়। এখনকার দুর্ভাবনা কী করে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা যায় তাকে ঘিরেই। আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ততটা আধুনিক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যখন এই আজব রোগ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ভাবুন আমাদের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কতটা ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে! তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, যেকোনো মূল্যে আমাদের ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা দিতে হবে।

আশার কথা, সরকার, স্থানীয় সরকার, ব্যক্তি খাত ও অসরকারি খাত স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহে এগিয়ে এসেছে। এখন দরকার আরো বেশি বেশি রোগীর পরীক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা। এরই মধ্যে কেন্দ্রীভূত পরীক্ষাব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে অনেকগুলো হাসপাতালে এই পরীক্ষাকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েও এই পরীক্ষার সুযোগ মিলবে। আরো দ্রুত পরীক্ষা চালিয়ে সত্যিকারের রোগাক্রান্তদের আলাদা করে ফেলা এখন সময়ের দাবি। এটা করা না গেলে রোগ বয়ে বেড়ানো মানুষ বেশি থেকে গেলে তারা আরো বেশি করে এই রোগ ছড়াবে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই বলে আসছে, ‘টেস্টস, টেস্টস এবং টেস্টস’। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ নিয়ে এই দিকটায় আমাদের মনোযোগ অক্ষুণ্ন রাখতে পারব।

বাংলাদেশের মানুষ চিরকালই বৈরী পরিস্থিতি ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করে এগিয়েছে। এ দেশের ইতিহাস ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ইতিহাস। এই করোনা দুর্যোগের সময়ও আমরা তার ধারাবাহিকতাই দেখছি। বসুন্ধরা ও ওয়ালটন গ্রুপের মতো বড় বড় শিল্প গ্রুপ যেমন দ্রুত এগিয়ে আসছে, একইভাবে এগিয়ে আসছে তরুণদের গড়ে তোলা স্টার্টআপগুলোও। দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যক্তি খাতের এমন সক্রিয় অংশগ্রহণ অবশ্যই আশা জাগাচ্ছে। সামাজিক সংগঠনগুলোও পিছিয়ে নেই। যেমন—করোনায় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে ‘এক টাকায় আহার’ কর্মসূচির মাধ্যমে আগেই সুপরিচিত বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন যে কাজগুলো করে যাচ্ছে তা সবারই নজর কেড়েছে, সবাইকে সাহসও জোগাচ্ছে। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা তাদের সংগঠকদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপন্ন প্রান্তিক মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পরও এ দেশের সংস্কৃতিকর্মীরা এভাবে পর্যুদস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় আলোচনায় আনতে চাই। তা হলো, এই যে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ, বিশেষ করে আমাদের তরুণরা, করোনা পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে এগিয়ে আসছেন, তাঁদের কাজের মধ্যে একটি সমন্বয় সাধনের জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করা দরকার বলে মনে করি। করোনা পরিস্থিতিতে যে প্রান্তিক মানুষরা বিভিন্ন স্থানে আয়-রোজগারহীন অবস্থায় আটকা পড়ে আছেন, তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাঁদের চাহিদাগুলোর একটি ডিজিটাল ম্যাপিং করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে কভিড-১৯ ভাইরাসটি আমাদের জন্য একেবারেই নতুন। আমরা এখনো এই ভাইরাসটি কিভাবে ছড়ায় এবং কিভাবে এর ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যায় তা জানছি। যেমন—জাপানিজ অ্যাসোসিয়েশন ফর ইনফেকশাস ডিজিজ জানাচ্ছে যে ঘরে পর্যাপ্ত বাতাসের আসা-যাওয়া না থাকলে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে নির্গত মাইক্রো-ড্রপলেট ঘরে আটকে থাকে এবং এতে করোনা ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। কাজেই ঘরে বাতাস যাওয়া-আসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই দুর্যোগ মোকাবেলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিশ্বাসযোগ্য তথ্যসংবলিত জনবার্তা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে এই জনবার্তা খুবই দক্ষতার সঙ্গে দিতে শুরু করেছেন। পুরো জাতি এতে উপকৃত হচ্ছে। সময় এসেছে সরকারের বাইরের অন্য শুভ শক্তিগুলোর এগিয়ে আসার। মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি খাদ্য ও আয়ের সংস্থানও করে দিতে হবে। আর এখানেই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক কর্মসূচির কথা এসে যায়। তিন স্তরের এই কর্মসূচির রূপরেখা এমনটি হতে পারে :

ক. এই মুহূর্তের কর্মসূচি : হঠাৎ থমকে যাওয়া জনজীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে শহর ও গ্রামের ‘দিন আনি দিন খাই’ গোষ্ঠীর মানুষদের খাবার ও আয়ের সংস্থান করতে হবে। গণছুটির পর থেকেই অনেক দিনমজুর শ্রমজীবী মানুষ এবং খুদে ব্যবসায়ী চলে গেছেন। যাঁদের নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে তাঁরাই চলে গেছেন। বাদবাকিরা ঢাকা ও অন্যান্য বড় বড় শহরেই রয়ে গেছেন। প্রধানত বস্তিতে থেকে যাওয়া এই মানুষগুলোর আয়-রোজগার বন্ধ। যাঁরা ফ্ল্যাটবাড়িতে কাজ করতেন, ঠেলাগাড়ি চালাতেন, রিকশা চালাতেন, তাঁরা কর্মহীন। দু-এক দিন পরপর কোনো এনজিও বা সামাজিক গোষ্ঠী একবেলা খাবার পৌঁছে দিচ্ছে। বাদবাকি দিন তাঁরা অভুক্তই থেকে যাচ্ছেন। তাঁদের বিজলিবাতি, গ্যাস, স্যানিটেশনের খরচও বহন করতে হচ্ছে। তাঁদের জন্য গ্রামের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেই। তাঁদের জন্য দ্রুত বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ছে। স্থানীয় সরকার, সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর ও এনজিও মিলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ব্যক্তি খাতের সম্পদশালী করপোরেটদের উদারহস্তে এই কর্মসূচি চালু রাখতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। তবে সরকারকেই সবার আগে এ ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। শহরে অনেকগুলো এতিমখানা আছে। মাদরাসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাদের অনেক ছেলে-মেয়ে এখনো রয়ে গেছে। তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাদের খাবারের দায়িত্ব কি সরকার নেবে না? এদের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কথাও ভাবুন। এমনিতেই সমাজ তাদের বোঝা মনে করে। এই দুঃসময়ে তাদের কে দেখবে? ভিক্ষুকদের অবস্থা কেমন? তারা কি না খেয়ে মরে যাবে? এ বিষয়টিও ভাবতে হবে।

খ. স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি : স্বল্প মেয়াদে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষদের দায়িত্ব এক অর্থে সরকারকেই নিতে হবে। সরকার নিচ্ছেও। গ্রামে ভিজিডি, ভিজিএফ কর্মসূচি চালু আছে। ১০ টাকায় চাল বিক্রির কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। শহর থেকে যারা স্বল্পকালের জন্য ফিরে গেছে, তাদেরও এসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না সরকার তা গভীরভাবে ভাবতে পারে। এ জন্য যে বাড়তি খাবার সরবরাহের প্রয়োজন হবে তা হিসাব করে খাদ্য মজুদ কর্মসূচিতে প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এ জন্য বাড়তি বোরো ধান ক্রয় এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য আমদানির পরিকল্পনা এখনই নিতে হবে। চর ও হাওরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। সে জন্য আলাদা করে তাদের জন্য সবাইকে ভাবতে হবে। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় নগরের মধ্যবিত্ত। তারা ফ্ল্যাটবাড়িতে আটকা পড়ে আছে। আর কয়েক দিন পরই ঘরের বাজার শেষ হয়ে যাবে। তাই তারা অনলাইনে কেনার সুযোগ চাইবে। এরই মধ্যে গড়ে উঠা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন—গ্রসারি) এদের চাহিদা মেটাতে পারে। তাদের জন্য সস্তায় চলতি পুঁজির ব্যবস্থা করতে পারে ব্যাংকগুলো। সে জন্যই দরকার একটি সুনির্দিষ্ট এমএসএমই সহায়ক তহবিল। পুনরর্থায়নের নীতিতে চলতে পারে এই তহবিল। আসলেই এসএমই ও কৃষি খাতকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এমন সহায়ক কর্মসূচি চালু করার কোনো বিকল্প নেই।

গ. দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি : দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সম্প্রসারণমূলক বেশ কিছু কর্মসূচির সূচনা করেছে। শিল্প মালিকদের কিস্তি শোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে নেওয়া ঋণ শোধের সময় বাড়িয়ে দেওয়া, রপ্তানি আয় জমা করার মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া, বাণিজ্য অর্থায়নের শর্ত শিথিল করা ছাড়াও ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য বাড়ানোর জন্য রেপোর হার ০.২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া, সিআরআর আধা শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার মতো বেশ কিছু সহায়ক নীতি সমর্থন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ও করোনা সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ বিনা শুল্কে আমদানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তা ছাড়া পাঁচ হাজার কোটি টাকার সহায়ক তহবিলকে রপ্তানিমুখী শিল্পের টিকে থাকার কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এটিকে ২ শতাংশ সুদের পুনরর্থায়ন কর্মসূচিতে রূপান্তর করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন ধরেই অনেকগুলো পুনরর্থায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে হাত পাকিয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এবারের এই সর্বগ্রাসী মন্দা মোকাবেলায়ও বাংলাদেশ ব্যাংক তার বিচক্ষণতা ও পারদর্শিতা দেখাবে।

এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এই মহাসংকট মোকাবেলার জন্য দরকার হবে বিপুল অর্থ। স্বভাবতই আমাদের মতো একটি অর্থনীতির জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ আমাদের সম্পদ খুবই সীমিত। কাজেই যথাযথ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেই আমাদের এগোতে হবে। আমরা আশা করতে পারি, পরে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পক্ষ থেকে সহায়তা এলে এ ধাক্কাটি কাটিয়ে উঠতে বেশি বেগ পেতে হবে না। তবে অনেকেই মূল্যস্ফীতির ভয় পেতেই পারেন। কিন্তু তেলের দাম কমছে। আমাদের আমদানিও কমছে। বোরো উত্পাদনের সম্ভাবনাও ভালো। ডলারের চাহিদা কমছে বলে বিনিময় হার কমছে। তাই এক্ষুনি মূল্যস্ফীতি নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় আসেনি।

তবে সব কিছুই নির্ভর করছে এই মহামারি কত দিন ধরে চলে তার ওপর। এর তাণ্ডব দীর্ঘতর হলে অন্যভাবে ভাবতে হবে। আমাদের এভিয়েশন, পর্যটন তথা হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহনসহ অনেক খাত নিয়েই আমাদের ভাবতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে পৃথিবীটাই বদলে যাবে। আমাদের হয়তো আরো বেশি করে প্রকৃতিবান্ধব শিল্পায়ন ও জীবনচলার অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে। সেটা অবশ্য আখেরে ভালোই হবে। তবে এখনকার জন্য সমাজকে মানুষ বাঁচাতে আরো তত্পর হতে হবে। সবাই মিলে আমরা কি এবারে নববর্ষের উৎসব বোনাস এই দুর্যোগপীড়িত স্বাস্থ্যকর্মী ও গরিব মানুষদের জন্য উৎসর্গ করতে পারি না? ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ যাঁরা তাঁদের বর্তমানকে আমাদের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিতে ফেলতে দ্বিধা করছেন না, সেই বীরদের জানাই সালাম।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা