kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

কারাবন্দিদের দিকেও নজর দিতে হবে

বিনয় কাম্পমার্ক

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কারাবন্দিদের দিকেও নজর দিতে হবে

চারপাশের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়, করোনা মহামারির অভিঘাত প্রবল হচ্ছে। আচরণ পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হচ্ছে, দ্রুত ভাষার পরিবর্তন হচ্ছে (যেমন ‘কভিডিয়ট’ শব্দ চালু হয়েছে), স্বাস্থ্য নজরদারির নীতির কথা বলা হচ্ছে। আরেকটি ক্ষেত্রে ভাইরাসটি আগ্রহ জাগিয়েছে—সেটি হচ্ছে অবরুদ্ধ থাকার বা রাখার ধারণা।

সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, এর প্রকৃত অর্থ কী সেদিকে তেমন নজর না দিয়েই। আটক লোকদের ক্ষেত্রে এ কথা বিভ্রান্তির জন্ম দেয়; বরং আটক লোকদের নিগড়ে না রেখে মুক্তি দেওয়া হোক, বিশ্বজুড়ে সে কথাই উঠেছে।

ইরানে করোনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে হাজার হাজার কারাবন্দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ৮৫ হাজার বন্দিকে অস্থায়ীভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, ১০ হাজারের বেশি লোক ক্ষমা পেতে যাচ্ছে। ব্রিটেনের অন্যতম খ্যাতিমান কারা কর্মকর্তা এবং প্রিজন গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আন্ড্রিয়া অলবাট করোনাসৃষ্ট হুমকি সম্পর্কে বলে যাচ্ছেন। তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মোটেও আশাবাদী নন। তাঁর অভিমত, জনমিতিক বিচারে সমাজের আর কারাগারের অবস্থা এক নয়। ফলে বিপুলসংখ্যক লোক ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপে রয়েছে, তারা অসুস্থ হবে। তাদের মধ্যে সংক্রমণ সহজ।

কারাবন্দিদের মুক্তি না দেওয়ার পক্ষে আওয়াজ এখনো উচ্চ (যুক্তরাজ্য সরকারের পরামর্শ বেশ দুর্বল; তারা বলেছে, যাদের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিয়েছে তাদের প্রটেক্টিভ আইসোলেশনে রাখো)। ম্যানচেস্টারের স্ট্রেঞ্জওয়েতে এবং সারে-র এইচএমপি হাই ডাউনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর আওয়াজটা যেন বেড়েছে। সাবেক বিচারমন্ত্রী ডেভিড গয়ক স্বল্পমেয়াদি সাজা স্থগিত করা এবং আগাম মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে বলছেন। স্বল্পমেয়াদি সাজা দিয়ে লোকজনকে কারাগারে না পাঠানোর সুবিধা হচ্ছে, এতে বিপত্তির আশঙ্কা কমবে; কারাগারের ভেতরে-বাইরে লোক চলাচল কমলে সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকিও কমবে।

করোনাভাইরাস মানে আরেকটি অপেক্ষমাণ কিলিং এজেন্ট। ব্রিটেনের স্থানীয় কারাগারগুলো ভাগাড়ে পরিণত হতে পারে যদি যারা খুবই বাজে দশায় আছে বা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দশায় আছে, তাদের মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা না হয়। তখন সমাজের জন্য আরো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ায়ও কারাবন্দিদের আগাম মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়েছে। লিগ্যাল অ্যাডভোকেট গ্রেগ বার্নসের টুইটের ভাষায় বললে, ‘কারাবন্দিদের মুক্তি দাও অথবা লাশের সারি দেখো।’ নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজ্য সরকার মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। দ্রুত আইন পাস করা হয়েছে, তাতে কারেক্টিভ সার্ভিসেস কমিশনারকে কারাবন্দিদের প্যারোলে আগাম মুক্তি দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। কমিশনারকে বুঝতে হবে, করোনা জনস্বাস্থ্যের জন্য বা কারাগারের নিয়ম-শৃঙ্খলার জন্য যথেষ্ট হুমকির কারণ।

যুক্তরাষ্ট্র সব সময় তার ‘বিশেষত্ব’ নিয়ে গর্ব করে, প্রশ্নবোধক কারাব্যবস্থা নিয়েও। যুক্তরাষ্ট্রে কারাবন্দি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। রাজ্যগুলো নিজস্ব উদ্যোগে কারাবন্দিদের মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল গুরবীর সিং গ্রেওয়ালের বক্তব্য : জেলগুলো রোগের ইনকিউবেটর হয়ে উঠতে পারে; অতএব, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে—কারাব্যবস্থায় করোনা সংকট এড়াতে হলে রীতিবিরুদ্ধ হলেও তা করা দরকার। এরই মধ্যে রাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারক বিধিভঙ্গের মতো লঘু অপরাধের দায়ে বা মিউনিসিপ্যাল কোর্টে দণ্ডিতদের সাজা স্থগিত বা কমানোর একটি আদেশে সই করেছেন। এর আওতায় এক হাজার বন্দি ছাড়া পাবে, তবে তাদের ‘স্টে অ্যাট হোম’ আদেশ মানতে হবে। সারা যুক্তরাষ্ট্রেই মুক্তি বা সাজা হ্রাসের ঘটনা ঘটছে। নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল ডি ব্লাসিও রাইকার্স আইল্যান্ড জেল থেকে ৪০ বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন; আরো ২৩ জন মুক্তি পাবে। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ যাদের মেয়াদ ৩০ দিনের কম বাকি রয়েছে তাদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অহিংস বন্দিদের মুক্তির জন্য নির্বাহী আদেশের কথা ভাবছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারের স্যানিটেশন পরিস্থিতি করোনার ঝুঁকিমুক্ত থাকতে কোনো সহায়তা করবে না। খুবই নোংরা, সাবান ও শুচিদ্রব্যহীন পরিস্থিতিতে ছোঁয়াছে রোগ দ্রুত ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র মহামারি মোকাবেলায় দিশাহীন, এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে। এসব ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে পেনাল কন্ডিশনগুলোর সংস্কার জরুরি। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও তাই। করোনার বিস্তার রোধে এখনই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, সাজা বা দণ্ড বিষয়ক সনাতনি ভাবনা ভয়ংকর ঝুঁকি তৈরি করবে।

 

লেখক : মেলবোর্নের আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা