kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনার আগামী দিনগুলো কেমন হবে?

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনার আগামী দিনগুলো কেমন হবে?

করোনা স্থবির করে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ। কভিড-১৯ আতঙ্কে কাঁপছে বাংলাদেশও। যদিও বাংলাদেশে সংক্রমণ এখনো কম, তবু বিপুল ঘনবসতির এ দেশে পরিস্থিতি যেকোনো সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, এমনই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাঁচজন এরই মধ্যে মারা গেছে। এর শেষ কোথায় এটি এখন বোধ হয় কেউই বলতে পারবে না। তবে শেষ অবশ্যই হবে। এটি এমন কোনো জিনিস নয় যে তা দিয়ে মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। কতগুলো বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এ কথা বলা যায়। ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। তিন মাসে না হোক, ছয় মাসে ভ্যাকসিন চলে আসবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, এই ভাইরাসে এত মানুষ কেন অসুস্থ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে? কারণ এটি আমাদের জন্য নতুন একটি ভাইরাস। এর বিরুদ্ধে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। যখন আস্তে আস্তে অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়ে যাবে তখন আশপাশের আরো অনেক মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে। এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সারা জীবন স্থায়ী হবে, নাকি কয়েক মাস বা কয়েক সপ্তাহ—সেটি আমরা জানি না। কারণ ভাইরাসটিই নতুন। কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অবশ্যই তৈরি হবে। যেমন সংক্রমিত হওয়ার কারণে যখন ১০ জন মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে তখন আশপাশের আরো পাঁচ-সাতজন বা ১০ জনের মধ্যেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ডেভেলপ করবে। এটিকে হার্ড ইমিউনিটি বলে। একসময় আসবে যখন এই ভাইরাস আমাদের আশপাশেই থাকবে; কিন্তু হার্ড ইমিউনিটির কারণে বা ভ্যাকসিনের কারণে এটি নতুন করে আর আমাদের সংক্রমিত করতে পারবে না। ফলে একপর্যায়ে এটি থামতে বাধ্য হবে। সেটি কবে হবে, তা অবশ্য আমরা হলফ করে বলতে পারি না। তবে যত তাড়াতাড়ি থামবে ততই মঙ্গল।

তবে মানুষকে আশ্বস্ত করার জায়গাটা হলো এই যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সবাই কিন্তু মৃত্যুবরণ করবে না। ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ মানুষের কোনো উপসর্গই থাকবে না। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষের উপসর্গ দেখা দেবে আর তাদের মধ্যে অল্প কিছুসংখ্যক মৃত্যুবরণ করবে। এটিই বাস্তবতা। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি চীনা দলিল মারফত জানা যাচ্ছে চীনে প্রতি তিনজনে একজন, অর্থাৎ প্রায় ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। অর্থাৎ রোগটি খুব বেশি ছোঁয়াচে হলেও একটু সচেতনতা আর সতর্কতা এর মৃত্যুহার অনেক কমিয়ে আনতে পারে।

অনেকের মনে প্রশ্ন, করোনা নিয়ে আমাদের সরকারের প্রস্তুতি কেমন? এটি আসলেই যে কেমন, তা কিন্তু শুধু তখনই জানা যাবে, যখন (স্রষ্টা না করুন) করোনার ধাক্কাটা জোরেশোরে আমাদের ওপর এসে পড়বে। প্রতিটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারই তার নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকারও এর বাইরে নয়। তবে এটি কত দূর এবং কতখানি কার্যকর, তা এখনই বলা মুশকিল। মনে রাখতে হবে, এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় বরাদ্দ দেওয়ার পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র হতে যাচ্ছে করোনার-পরবর্তী এপিসেন্টার আর সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি নেওয়ার পরও ইতালি আর স্পেনে মৃতের সংখ্যা পেছনে ফেলেছে চীনকে। অন্যদিকে ভুটানে আক্রান্ত একজন আর নেপালে মারা যায়নি কেউই। অনেক শক্তিশালী আর উন্নত দেশ যা করতে পারেনি, তা-ই করে দেখিয়েছে অনেক ছোট দেশও। কাজেই শুধু সরকারের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে বসে থাকলে হবে না, নিজেদের কাজটিও ঠিকমতো করতে হবে। আর গত কয়েক দিনে এই জায়গাতেই বোধ হয় আমরা খুব বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারিনি।

চীন থেকে যেসব দেশি-বিদেশি নাগরিককে দেশত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের সবাইকে চীনে কোয়ারেন্টিন করে তারা করোনামুক্ত নিশ্চিত হওয়ার পরই বিমানে উঠতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তেমনটি করেনি ইতালি। পাশাপাশি উহান থেকে প্লেন বোঝাই করে যে বাংলাদেশিদের উড়িয়ে আনা হয়েছিল, তাঁদের আমরা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখতে পেরেছিলাম। এমনকি যেসব বাংলাদেশি ছাত্র ভারত হয়ে উহান থেকে দেশে এসেছিল, তাদেরও ভারত সরকার ভারতে কোয়ারেন্টিন শেষেই দেশে পাঠিয়েছিল। পাশাপাশি উহানে যে বাংলাদেশিদের বসবাস তাঁরা মূলত ছাত্র ও শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে আন্ত যোগাযোগ খুব বেশি নয়। অন্যদিকে ইতালির ব্যাপারটি সম্পূর্ণই ভিন্ন। সেখানে বসবাস ছয় লক্ষাধিক বাংলাদেশির। কী নেই সেখানে? রেস্টুরেন্ট আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তো বটেই, আছে এই জেলা আর ওই উপজেলা সমিতি আর সংঘও। তা ছাড়া এসব বাংলাদেশির ওখানকার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মেলামেশাটাও উহানের বাংলাদেশিদের তুলনায় অনেক বেশি। সংগত কারণেই করোনার এপিসেন্টারটি চীন থেকে ইউরোপে স্থানান্তরিত হওয়ার পর যখন দলে দলে প্রবাসীরা ইতালি থেকে দেশে আসতে শুরু করলেন তখন আমরা হয়তো এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করতে না পেরে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়েছিলাম। আমরা হয়তো বুঝে উঠতে পারিনি চীন আর ইতালি ফেরত প্রবাসীদের মধ্যকার এসব পার্থক্য। তা ছাড়া হোম কোয়ারেন্টিন তো এ ধরনের প্যান্ডেমিক ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সমিশন ঠেকানোর একটি প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিও বটে। কিন্তু আমাদের প্রবাসী ভাই-বন্ধুদের নাগরিক দায়দায়িত্বটি কোথায় হারিয়ে গেল? একটি উন্নত দেশ থেকে আসার পর হোম কোয়ারেন্টিনের সংজ্ঞা না মেনে তাঁরা ঘুরছেন-ফিরছেন, সামাজিকতা করছেন, এমনকি বিয়েশাদিও করেছেন কেউ কেউ! দেশে ফিরে কেন দেশটিকে এমন অনিরাপদ বানালেন তাঁরা? আর শুধু প্রবাসীদেরই বা দুষবেন কেন। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকারের ঘোষিত ১০ দিনের ছুটিকে ঈদের ছুটি বানিয়ে যাঁরা হাজারে হাজারে, কাতারে কাতারে দেশের বাড়িতে ছুটলেন, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে তৈরি করলেন ১৫ কিলোমিটার ট্রাফিক জ্যাম তাঁরা কি একবারও ভেবে দেখেছেন আর সব কিছু বাদ দেন, যে পরম নিকটজনদের সঙ্গে ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে আপনাদের এই ঢাকা ত্যাগ, আপনাদের কারণে কত বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ল তারা।

আজকে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যদি আমাকে প্রশ্ন করেন আমাদের এখন করণীয়টা তাহলে কী, আমার উত্তরটা হবে ছোট—আমাদের এই সংকটকে অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে; কিন্তু কোনোভাবেই আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। কারণ আতঙ্কিত ব্যক্তি কখনোই ঠাণ্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আমরা যদি সরকারের ওপর আস্থা রেখে সরকারের বাতলে দেওয়া নিয়ম-কানুনগুলো ঠিকমতো মেনে চলি, তাহলে করোনা আমাদের কাবু করতে পারবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে তাঁর ভাষণে এ কথাগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। আমার উত্তরটাও আমি তাঁর কাছ থেকে ধার করেই দিলাম।

লেখক : অধ্যাপক, চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং

সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা