kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

সুস্থ হয়ে উঠুক আমার দেশ

আবদুল মান্নান

১ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সুস্থ হয়ে উঠুক আমার দেশ

যখন কোনো সমাজে বিপদ বা দুর্যোগ আসে তখন মানুষের প্রকৃত চরিত্রটি ফুটে ওঠে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে হয়তো অজানা, ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর এ দেশে একটি ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নথিতে তাকে গর্কি বলা হয়। তখন আমরা স্কুলের ছাত্র। সে সময় আজকের মতো এত সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বা ওয়ার্নিং ছিল না, থাকলেও তার অর্থ মানুষের কাছে ছিল দুর্ভেদ্য। দক্ষিণবঙ্গের আকাশটা সকাল থেকেই সেদিন মেঘলা ছিল। মাঝেমধ্যে এক-আধটু ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। দুপুর ২টা নাগাদ স্কুলে খবর পেলাম, ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত নাকি উড়ানো হয়েছে। এর অর্থ কী বোঝার সক্ষমতা কোনো সাধারণ মানুষের তখন ছিল না। মানুষের বাড়িতে কোনো রেডিও ছিল না। তখন বেশির ভাগ বাড়িতে ছিল না কোনো বিদ্যুৎ। ট্রানজিস্টার রেডিও এসেছে আরো অনেক পরে।

বিকেল ৩টা নাগাদ বাড়ল বাতাসের তীব্রতা। বাতাস বেশ গরম। চারদিক হঠাৎ অন্ধকারে ছেয়ে গেল। বিকেল ৩টাকে সন্ধ্যা ৭টা মনে হচ্ছিল। ৭টা। দাদি-নানিদের মুখে পরে শুনেছি, এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তাঁরা কেউ কখনো দেখেননি। স্কুল ছুটি হওয়ার পরও বাড়ি না গিয়ে গিয়েছিলাম আট আনা দিয়ে গেটম্যানের টুল ভাড়া করে সিনেমা দেখতে। সিনেমা শুরু হওয়ার আধঘণ্টা পরই উড়ে গেল সিনেমা হলের টিনের চালা। ওপরের অন্ধকার আকাশটা দেখা যাচ্ছে। বের হয়ে দেখি, রাস্তার পাশের বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ পড়ে রাস্তাঘাট সব বন্ধ। একটি বন্ধ দোকানের পাশে দাঁড়াতেই মাঝবয়সী দোকানি তাঁর দরজাটি খুলে আমাকে ভেতরে টেনে নিলেন। সেদিন প্রকৃতির তাণ্ডব দেখে আমি নিশ্চিতভাবে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

রাত ৯টা নাগাদ ধীরে ধীরে প্রকৃতি শান্ত হয়ে এলে দোকানির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হই। আধঘণ্টার পথ দেড় ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছি তখন দেখি, আমার মা জায়নামাজের ওপর বসে আমার জন্য কান্নাকাটি করছেন। কাছে পেয়েই জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। প্রায় সব বাড়ির বাঁশের বেড়া দিয়ে বানানো রান্নাঘর শুরুতেই উড়ে গেছে। বাতি নেই বেশির ভাগ বাড়িতে। কেরোসিনের মজুদ শেষ বা বোতল ভেঙে গেছে। সেই রাতে পাড়ার অনেক বাড়িতে রান্না হয়নি। যাদের হয়েছে তারা অন্যদের সঙ্গে তা ভাগাভাগি করে খেয়েছে।

সরকার করোনাভাইরাসজনিত মহামারি ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে অনেকটা লকডাউন ঘোষণা করেছে। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ কাজের মানুষ এক দিন আগেই বাড়ি চলে গেছে বাস ভাড়া করে। এখন তাদের গুরুত্ব হয়তো অনেকেই বুঝতে পারছে।

১৯৬০ সালের সেই ভয়াবহ রাত শেষ হলো। পরদিন আমাদের শহর চট্টগ্রাম একটি বিধ্বস্ত নগরী। কোনো কাঁচা বা আধাপাকা বাড়ি দাঁড়ানো নেই। শহরের সব রাস্তা বিদ্যুতের খুঁটি আর গাছ পড়ে বন্ধ। সব গাছের পাতা গরম বাতাসে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। পরে এই ঝড়ের নাম হয়েছিল অগ্নিতুফান। এলাকার মানুষ পৌরসভার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই হাতে দা-কুড়াল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল এসব পরিষ্কার করতে। তখন পূর্ব বাংলার গভর্নর ছিলেন লে. জেনারেল আজম খান। এখনো আমার প্রজন্মের মানুষ এই পাঠান পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাটিকে ভোলেনি তার একটিই কারণ, তিনি কখনো দেশে কোনো দুর্যোগ নেমে এলে নিজেই রাস্তায় নেমে পড়তেন, মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতেন। রাতে প্রকৃতির তাণ্ডব শেষ হয়ে গেলে জেনারেল আজম খান সেনাবাহিনীর একটি হাফট্রাক নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে ভোরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পৌঁছলেন। সেখানে তিনি এক ভয়াবহ চিত্র দেখে অভিভূত হয়ে যান। সমুদ্রের তীরে সীতাকুণ্ডের অবস্থান হওয়ায় তিনি দেখেন, পুরো এলাকায় কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই। দেখেন, সমুদ্রের পারে একটি বিশাল জাহাজ দাঁড়ানো। কোথা থেকে এলো এই জাহাজ? পরে জানা গিয়েছিল, এই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে মোটা শিকল দিয়ে বাঁধা ছিল। সেখান থেকে ঝড়ের কবলে পড়ে শিকল ছিঁড়ে বাতাসে অনেকটা উড়ে এসে সীতাকুণ্ডের বালুকাবেলায় আছড়ে পড়েছে। অনেকটা সিনেমার মতো। সেখান থেকেই এ অঞ্চলে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শুরু। পরে জেনেছি, জেনারেল আজম খান রাস্তার পাশে বসে শিশুর মতো কেঁদেছেন। সে সময় এই পাঠান গভর্নর দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন উপদ্রুত এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে স্থানীয় মানুষকে নিয়ে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করেন। মৃতদের কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি মহল্লায় স্থানীয় মুরব্বিদের নিয়ে গঠিত হয় রিলিফ কমিটি। আমাদের পাড়ার কমিটিতে আমার বাবা একজন সদস্য। পাড়ার ছেলেরা স্বেচ্ছাসেবক। বড় বড় ডেগে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। আমাদের কাজ হচ্ছে চুলায় ব্যবহারের জন্য লাকড়ি বয়ে আনা। পাড়ার লাকড়ির দোকানদার প্রায় বিনা মূল্যে তা সরবরাহ করেন। রান্না শেষ হলে তা ট্রাকে তুলে পতেঙ্গা, হালিশহর, কাঠগড়সহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তা বিতরণ করা হয়। সেসব এলাকায় এই রিলিফ কমিটি শুধু খাদ্য বিতরণ করেনি, ড্রাম ভর্তি পানিও নিয়ে গেছে। আমাদের কাজ ছিল এসব জিনিস কেনার জন্য পাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা। কেউ এক টাকা দিচ্ছে তো কেউ চার আনাও দিচ্ছে। সে সময় কেউ কোনো বিপদে পড়লে মানুষ যেমনভাবে তাকে বা তাদের সাহায্য করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ত, বর্তমান প্রজন্মের কাছে তা রূপকথার গল্প মনে হবে।

বাঙালি তাদের এই অসামান্য উদারতা দেখিয়েছিল ১৯৭১ সালে, যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনের ব্রত নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ২৫ মার্চ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। হাজারে হাজারে মানুষ শহর ছেড়ে প্রথমে গ্রামে যাচ্ছে, এরপর সীমান্ত পার হয়ে ভারতে। পথে পথে তাদের জন্য মানুষ সাধ্যমতো ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছে। সীমান্তের ওপারে ত্রিপুরা, আসাম আর পশ্চিমবঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে প্রবেশ করল প্রায় এক কোটি মানুষ। সীমান্তের ওপারের মানুষগুলো যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে আমাদের বরণ করে নিল। কোনো বাড়িতে হয়তো দুখানা ঘর। একখানা ছেড়ে দিল এপারের শরণার্থীদের জন্য। কেউ জানতে চাইল না জাতপাত আর ধর্মের পরিচয়। আগরতলার রাজপ্রাসাদের দরজাও উন্মুক্ত হয়ে গেল সবার জন্য। মানবতা কাকে বলে তা বিশ্ব আরেকবার দেখল। গায়ক গাইলেন ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’। সেই খোলা মনের বাঙালিরা সব কোথায় গেল?

খিলগাঁওয়ের তালতলা সিটি করপোরেশন কবরস্থানের সদর দরজায় ব্যানার টানানো হয়েছে, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের লাশ যেন এই কবরস্থানে দাফন করা না হয়। এলাকার বাসিন্দারা প্রধানমন্ত্রী ও দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে তাদের আবেদন জানিয়েছে। প্রয়োজনে তারা ঢাকার বাইরে অন্য কোনো স্থানে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছে। আমার এই সাত দশকের জীবনে এমন অমানবিক কোনো ব্যানার দেখেছি বলে মনে হয় না। এতটুকু যখন তারা বলতে পেরেছে, আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলতে পারত—কোনো মানুষ মারা গেলে তাকে যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। অন্যান্য দেশে তা-ই হচ্ছে। একটি শিল্পগোষ্ঠী তেজগাঁও এলাকায় করোনা রোগীদের জন্য একটি ৩০০ বেডের হাসপাতাল বানাতে গেলে এলাকার কাউন্সিলরের নেতৃত্বে শখানেক মানুষ সেই হাসপাতাল নির্মাণে শুধু বাধাই দেয়নি, ভাঙচুরও চালিয়েছে। এই কাউন্সিলর আবার ওই এলাকার সরকারি দলের নেতা। উত্তরায় একটি হাসপাতাল এলাকার মানুষ একজন রোগীকে করোনা রোগী সন্দেহে ভর্তি করাতে বাধা দেয়। সিলেটে একজন বিদেশিকে রাস্তায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কিভাবে ওই ব্যক্তি মারা গেল, তা অজানা। অ্যাম্বুল্যান্স ডাকা হলো। অ্যাম্বুল্যান্সচালকের একার পক্ষে ওই ব্যক্তিকে গাড়িতে তোলা সম্ভব নয়। আশপাশে শখানেক মানুষ ‘তামাশা’ দেখছে। কেউ এগিয়ে আসছে না সেই মৃতদেহকে গাড়িতে তোলার জন্য সাহায্য করতে।  

বাঙালি তো কখনো এত নির্দয় ছিল না। এ দেশে মহামারি নতুন কোনো বিষয় নয়। এর আগে কলেরা, গুটিবসন্ত, ম্যালেরিয়ায় মানুষ মারা গেছে কাতারে কাতারে। এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা মানুষ তখন চিন্তাও করেনি। তখন সবাই এগিয়ে এসেছে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে। ষাট, বাষট্টি, সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের পর রিলিফের কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, মানুষ আর পশু মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় সব কটিতেই পচন ধরেছে। যাঁরা এই মৃত মানুষগুলোর দাফনের ব্যবস্থা করছিলেন তাঁদের সঙ্গে আমার বয়সের বালক বা তরুণরা হাত মিলিয়েছে। মানুষের মধ্যে সেই সহমর্মিতা হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কারণ বাঙালির মধ্যে এখন একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়েছে। তারা মনে করে, তাদের হারানোর আছে অনেক কিছু। যেহেতু আমার প্রজন্মের অনেকেই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিরও নিচে অবস্থান করত, সে কারণে সেই প্রজন্মের মানুষ প্রয়োজনে নিজের জীবন বাজি রেখে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পিছপা হতো না। সে কারণেই আমার প্রজন্ম দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিল।

আমাদের ডাক্তার, নার্স আর স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনায় আক্রান্তদের সেবা করতে যখন ব্যস্ত তখন এক দল মাঠে নেমেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার কয়টি শাড়ি আছে তার হিসাব করতে। এই অমানুষরা কি তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড জানে? তিনি কী শাড়ি পরলেন, তাঁর কয়টি শাড়ি আছে, তা তো কোনো অবস্থায়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিনি তাঁর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন কি না, তা দেখা। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, স্বাধীন বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে যেমন ‘শিক্ষিত’ আর বিত্তবানের সংখ্যা বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হৃদয়হীন অমানুষের সংখ্যাও। শুক্রবার যশোরের মণিরামপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসান নামের একজন আমলা বাবার বয়সী তিনজন মানুষকে মাস্ক না পরার অজুহাতে কান ধরিয়ে ছবি তুলেছেন। বর্তমান সময়ে সরকারের অনেক আমলা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ওভারটাইম কাজ করছেন। তাঁদের নিয়ে লিখব ভবিষ্যতে। সুস্থ হয়ে উঠুক আমার দেশ।

 

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা