kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

মানুষের জয় হবে

ব্রুস এলওয়ার্ড

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষের জয় হবে

যেসব স্থানে সম্প্রতি সংক্রমণ দেখা দিয়েছে বা যেসব স্থানে দেখা দেয়নি বা যেসব স্থানে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে মাত্র, সেসব স্থানের নিরিখে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব সামান্যই ধারণা করা সম্ভব। চীনের দিকে তাকান, জানুয়ারির শুরুর দিকে তারা ভাইরাসটি শনাক্ত করে। তারা জীবাণুটির বিষয়ে পূর্ণ মনোযোগ দেয়, সম্ভাব্য সব কিছু দিয়েই একে মোকাবেলার চেষ্টা করে। মার্চের মাঝামাঝি তারা হিসাব-নিকাশ করে বলেছে, মার্চের শেষ নাগাদ তারা এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবে অর্থাৎ পুরো তিন মাস সময় তাদের লাগছে।

ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে জ্যামিতিক বৃদ্ধির দশা চলছে। দেখা যাচ্ছে, ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে, প্রাদুর্ভূত এলাকায়ও—যেমন ইতালিতে। এসব দেশের বেশ কয়েক মাস লেগে যাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য। বিশ্বের অন্য অংশের দিকে তাকালে, যেমন—আফ্রিকা এবং ভারতীয় উপমহাদেশের অংশবিশেষে, দেখা যাবে, সেখানে সংক্রমণ শুরু হয়েছে মাত্র। যদিও সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা কম, তবু রেখাচিত্র দেখলে বোঝা যাবে, সেখানে সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধির পর্যায়ে রয়েছে।

আমি আশা করি, আমরা সংকট কাটিয়ে উঠব, জয়ী হব। পৃথিবীর নানা অংশ রোগটির অস্তিত্বশীল থাকার মধ্যেই, এই গ্রহের বিশাল অংশে ভাইরাসটির বদ সংক্রমণপ্রবাহের মধ্যেই আমাদের জয়ী হতে হবে। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমাদের ফ্লুর সিজনের মধ্যে ফিরে যেতে হচ্ছে। কথা হচ্ছে, ওই সময়ে আমাদের কি এর বিস্তার-উল্লম্ফন দেখতে হবে?

আসন্ন সময়ে অনেক কিছুই ঘটতে পারে বা ঘটতে যাচ্ছে। যা ঘটতে পারে বা ঘটতে যাচ্ছে, তা নির্ভর করছে দেশ হিসেবে, সমাজ হিসেবে আমরা কী করি, কী ব্যবস্থা নিই তার ওপর। আমরা যদি প্রতিটি সংক্রমণের ঘটনা পরীক্ষা করে দেখি, সংক্রমিত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচ্ছিন্নকরণের (আইসোলেশনের) কথা ভাবি, তাহলে সংক্রমণের ঘটনা অর্থাৎ ভাইরাসটির বিস্তৃতির মাত্রা কমিয়ে রাখতে সক্ষম হব। যদি প্রতিটি ঘটনা না জেনে, আমলে না নিয়ে শাটডাউনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা হয়, তাহলে প্রতিবারই সংক্রমণের প্রবাহ স্থগিত করা যাবে বটে, তবে ভাইরাসটি আরেক প্রবাহে ফিরে আসতে পারে—এ শঙ্কা রয়েছে। কাজেই ভবিষ্যৎ কী রূপ নেবে, তা ভাইরাসটির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্মকাণ্ডের ওপরও নির্ভর করে।

শাটডাউন করে আবারও আমরা সময় পেয়েছি বটে। শাটডাউন বা লকডাউন করে যা করা হচ্ছে, তাতে আসলে সময় কেনা হচ্ছে। এটি করে দেশগুলো বা সরকারগুলো আসলে ভাইরাসকে থামাচ্ছে না। বলা যায়, তারা এটিকে চাপে রেখেছে, এর সংক্রমণপ্রবাহকে ধীর করেছে। এখন এ সময়কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কাজে লাগানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে। ব্যবস্থাকে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যথাস্থাপন করতে হবে, যাতে আলাদা প্রতিটি ঘটনাকে সামাল দেওয়া যায়, ভাইরাসটিকে থামানোর জন্য সেটিই মৌলিক কাজ হবে।

ভাইরাসটি কত দিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিম ইউরোপের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে জানতে হলে চীন, (দক্ষিণ) কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের দিকে তাকানো দরকার। তারা সংক্রমণ রোধের জন্য সম্ভাব্য সব কিছুই করছে। বেশির ভাগ পশ্চিমা দেশ সত্যিকার অর্থেই লড়াই করছে। কিন্তু আমরা কি সত্যি সব সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরীক্ষা করতে সক্ষম? আমরা কি সব নিশ্চিত বাহক ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি? পশ্চিমা দেশগুলো চীন থেকে একটু আলাদাভাবে চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই আলাদা চেষ্টা কাজে দেবে তো এবং প্রাদুর্ভাবকে কয়েক মাসের মধ্যে সীমিত করতে পারবে? যেমন মারাত্মক আক্রান্ত চীন পেরেছে।

চীনে দ্বিতীয় ধাক্কা আসতে পারে ধরে নেওয়া যায় এবং তারা বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়েছে। চীনে সফরকালে আমরা বিশেষ একটি বিষয় দেখতে পেয়েছি; তারা পশ্চিমের তুলনায় বিশেষভাবে বিষয়টিকে দেখছে। কোথাও সংক্রমণ এক ডিজিটে নেমে যাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট গভর্নর ও মেয়ররা গা এলিয়ে দেননি। কারণ তাঁরা মনে করেন, ভাইরাসটি উবে যাবে না। তবে তাঁরা তাঁদের সমাজ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখার আশা করেন; তাঁরা আবার এমন অবস্থায় পড়তে চান না। তাই তাঁরা সতর্ক, প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হয়তো অনেকে আমার সঙ্গে একমত হবেন না, তবু বলছি, কিছু দেশে রোগটির ভয়াবহতা ও ভাইরাসটির সংক্রমণযোগ্যতা নিয়ে ঐকমত্য নেই। ভয়াবহ, বিপজ্জনক কিছু নিয়ে যে কাজ করতে হচ্ছে, সে ব্যাপারে ঐকমত্য থাকা দরকার। না হলে প্রতিকারের ব্যাপারে জন-আস্থা অর্জন করা যাবে না। জন-আস্থা না থাকলে গৃহীত ব্যবস্থা কার্যকর করাও কঠিন হবে।

সবাই, সব দেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সংক্রমণ ঘটলে মৃত্যুহার ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা কতক দেশে সহায়ক হতে পারে আশা করি; তবে আশাব্যঞ্জক হবেই—এটি নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ধনী হলেই রক্ষা মিলবে না। ইতালিতে ধনীরা রেহাই পায়নি। তরুণদের জন্যও এটি ভয়ানক। আসলে নতুন কোনো রোগকেই অবজ্ঞা করা ঠিক না। শাটডাউন বা লকডাউনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করাই বাঞ্ছনীয়। সন্দেহভাজনদের পরীক্ষা করতে হবে। যাদের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের আলাদা করতে হবে, অতঃপর কোয়ারেন্টিনে নিতে হবে।

মানবজাতির জয় হবে। এর জন্য কী পরিমাণে, কত দ্রুত ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা আমাদের নিতে হবে, সেটিই কথা। এর জন্য ধৈর্য দরকার, সহযোগিতা দরকার। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হয়, হবে।

লেখক : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা

সূত্র : দ্য টাইম অনলাইন

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : সাইফুর রহমান তারিক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা