kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৬  মে ২০২০। ২ শাওয়াল ১৪৪১

দিল্লির চিঠি

করোনার ডায়েরি

জয়ন্ত ঘোষাল

৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



করোনার ডায়েরি

২৮ মার্চ, শনিবার

আজ পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ। জীবনানন্দের কথাই বারবার মনে পড়ছে। করোনা নামক ভয়ংকর অজানা দৈত্য আচমকা আমাদের বিশ্বের আলয়ে ঢুকে পড়েছে। আইসোলেশনে আছি। টিভিতে খবর শুনেছি। এলাহাবাদের প্রায় ৩০-৪০ জন দিনমজুর, যারা দিল্লির এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করত তারা সব নিয়ম ভেঙে দলবদ্ধভাবে উত্তর প্রদেশের সীমান্ত বাস টার্মিনালে এসে জড়ো হয়েছে। উত্তেজিত পুলিশ যখন তাদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করছে, কেন আপনারা এখানে এসেছেন? তখন সেই গরিব মানুষগুলো বলছে যে তারা শুনেছে এখান থেকে এলাহাবাদ যাওয়ার বাস ছাড়বে আজ। এটা গুজব। ওদের কাছে পকেটে কানাকড়ি নেই। পুলিশ ওদের ধরে পেটাচ্ছে। এমনকি মেয়েদের গায়ে হাত দিচ্ছে। কেউ কেউ বিস্কুট খেয়ে দিন কাটিয়েছে। ভাবছে, কোনোভাবে রোজগারের জন্য ইমিগ্রেশনের মায়া ত্যাগ করে গ্রামে ফিরে যাই। তাতে হয়তো পেটে কিছু পড়বে। দিল্লিতে থাকলে অনাহারে মৃত্যু হবে। এ আমার দেশ ভারতবর্ষ?

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রেপো রেট কমিয়েছে। কারণ কেউ ব্যাংক থেকে টাকা ঋণ নিয়ে শিল্পতে বিনিয়োগ করছে না। ব্যাংকে আমাদের টাকাগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। অথচ ব্যাংককে সুদ দিতে হবে আমাদের। তাই ব্যাংকগুলো রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে টাকা গচ্ছিত রেখে দিচ্ছে। সুদ পাবে বলে। কিন্তু রিজার্ভ ব্যাংকই বা সুদ পাবে কোথা থেকে? তাই রেপো রেট কমাতে বাধ্য হয়েছে রিজার্ভ ব্যাংক, যাতে মানুষ টাকা বিনিয়োগ করে। আমরা যারা প্রবীণ ও সমাজের অঙ্গ আমরা ব্যাংকের সুদের ওপর ভরসা রাখি। কিন্তু ব্যাংকের সুদ কমতে বাধ্য। এদিকে স্বাস্থ্য পরিষেবায় এখন সরকারকে অনেক বেশি খরচ করতে হবে। কোথা থেকে আসবে এত টাকা? এ টাকা কার? নরেন্দ্র মোদির নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও নয়। এসব আমাদেরই রাজস্ব।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজামের লেখা পড়ে বুঝেছি, আমরা একা নই। আজ দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্কের বাড়ির দোতলায় একা একা থাকতে থাকতে বিষাদ গ্রাস করছে এ দেশের মুটে-মজুরদের অসহায় অবস্থা দেখে। এখানে বহু পুলিশ যা করছে, তা দেখছি বাংলাদেশেও হচ্ছে। আমরা আসলে একই ডিঙির ওপর বসে আছি। উই আর ইন এ সেম বোট। নঈম নিজাম লিখেছেন, নিরীহ একজন খেটে খাওয়া মানুষ কেন বাড়ি থেকে বের হয় এই সময়? তারও মন চায় আইন মানতে। তবু দুমুঠো চাল কিনতে ওরা বেরোয়। ওদের ধরে পেটাবেন না। বয়স্ক মানুষের কান ধরবেন না। বুঝিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠান। পারলে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে সহায়তা করুন। ফেসবুকে নঈম সাহেবের সমর্থনে ঝড়। জনৈক সঈফুল জামিল লিখেছেন, আল্লাহ সব কিছু দেখছেন এবং তিনি তা ফিরিয়ে দেবেন।

কখন দেবেন তা তিনি জানেন। আহমেদ সুলতান বলছেন, মানুষ তুমি মানুষ হও। আর এদের বলা উচিত, ‘সরকারি আমলা তোমরা মানুষ হও।’ জানেন, আমাদের ভারতবর্ষ আর বাংলাদেশ আয়তন, জনসংখ্যার তফাত যা-ই হোক আসলে আমরা একই পরিস্থিতির শিকার। পুলিশকে মিডিয়া-দরদি বলে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম যতই দেখাক না কেন, আমি তো দেখছি চিত্তরঞ্জন পার্কে এই পরিস্থিতিতে চা-ওয়ালাকে চা বিক্রির সুযোগ দেওয়ার জন্য পুলিশ ঘুষ নিচ্ছে। দুর্নীতি পিরামিডের শীর্ষ থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত। পুলিশের হাতে প্রচুর ক্ষমতা এখন আর ওরা পেটাচ্ছে। এমন দীর্ঘ কারফিউ তো ভারতীয়রা বহুদিন দেখেনি।

আর আমরা এ অবস্থায় এখনো মোদি ভালো না খারাপ, তা-ই নিয়ে ঝগড়া করে চলেছি। চীনকে দেখে কেন আগাম ব্যবস্থা সরকার নিল না? আমি বলছি, আপাতত ক্ষুদ্র রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করি। ৭০ বছর ধরে যাঁরা দেশ শাসন করছেন, তাঁদেরও ভাবতে হবে কেন আজও ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামোর হাল এত শোচনীয়। তর্ক অনেক। আপাতত আমরা করোনার মোকাবেলা করি ঐক্যবদ্ধভাবে।

তারপর ফিরে যাচ্ছি ফ্ল্যাশব্যাকে। ডায়েরির পেছন দিকের পাতায়।

২২ মার্চ, রবিবার

কোনো এক দার্শনিক বলেছিলেন, একটা লোককে যদি ঘেন্না করতে চাও, তবে খবরদার তাঁর কাছাকাছি ঘেঁষো না। লোকটাকে একদম না জানলে তাঁকে ঘেন্না করা সহজ। নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে এমনটা বলা যায়। আমাদের দেশে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা মোদি সম্পর্কে জানেন খুব কম। কিন্তু তাঁরা তাঁকে ঘেন্না করেন। তিনি যা-ই করুন না কেন, খুঁত ধরবেনই। নিন্দা করতেই হবে। করোনাভাইরাসের আক্রমণের এমন এক দুঃসময়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছি বাড়িতে। বিশ্বজুড়ে হাহাকার। দেখছি দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কী অভূতপূর্ব আন্তরিকতার সঙ্গে এই পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছেন। কাজটা কিন্তু সোজা নয়। আমাদের দেশটা চীন, এমনকি সিঙ্গাপুরও নয়। বিপুল জনসংখ্যা। বড় জটিল গণতন্ত্রের দেশ আমাদের ভারত। একনায়কতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়। তবু মোদি যেভাবে আজ গোটা দেশে জনতা কারফিউকে সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়িত করলেন, তা দেখে তাঁর নেতৃত্বের তারিফ না করে পারছি না। চীনে লকডাউন করা হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে, আর করা হয়েছিল দমননীতির সাহায্যে। আমাদের বৃহত্তম গণতন্ত্রে যখন পান থেকে চুন খসলে আমরা গেল গেল রব তুলি তখন কোটি কোটি মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘরের মধ্যে থাকতে বাধ্য করা সহজ কাজ নয়। তিনি দেশের প্রকৃত অভিভাবকের মতো কাজ করেছেন।

গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী যখন জনতা কারফিউ ঘোষণা করলেন তখন ভাবতে পারিনি। শত শত মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কথায় এভাবে সাড়া দেবে। আজ তো রবিবার। এমনিতেই আজ ছুটির দিন। সারা দিন বাড়িতে। সকাল থেকেই আমাদের দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের পাড়াটা ঝুপ করে নিঝুম হয়ে গেছে। আমার পাঁচতলার ব্যালকনির সামনেই আছে একটা পার্ক। সেখানে প্রতিনিয়ত মানুষ হাঁটে। বাচ্চারা খেলে। আজ কেউ কোথাও ছিল না। সকালে পরিচারক আসেনি। আমার স্ত্রী কলকাতায় অসুস্থ মা-বাবার কাছে। বাড়িতে আমার সঙ্গী এক বিড়াল। তার নাম পুঁচকি সুন্দরী। আপাতত সে আমার ছায়াসঙ্গী। এ ঘর থেকে অন্য ঘরে যাচ্ছি, সে আমার পেছন পেছন এ ঘর থেকে অন্য ঘর করছে।

বিকেলে কাঁসর ঘণ্টার শব্দ শুনে ব্যালকনিতে গেলাম। আমি টিভিতে তখন নেটফ্লিক্সে জুলিয়া রবার্টসের ‘মিরর-মিরর’ দেখছিলাম, এক অসাধারণ প্রাচীন  গ্রেমি রূপকথার অত্যাচারী রানির হাত থেকে কিভাবে অরণ্যবাসী প্রকৃত রাজকুমারী স্নো হোয়াইট মুক্ত করবে দেশকে, গ্রামের গরিব করদাতা অত্যাচারিত মানুষকে আর তখনই করতালি আর শঙ্খধ্বনি। বিকেলের ঝকঝকে হলুদ রোদ্দুর। মনে হচ্ছে কত দিন পর এমন হলুদ রোদ দেখলাম। শৈশবে হাওড়ার মন্দিরতলায় ছাদে উঠতাম। রবিবার বিকেলে তখন এমন হলুদ রোদ আছড়ে পড়ত। কত দিন দেখিনি। বারান্দা থেকে দেখছি পাশের প্রতিটি বাড়ির বারান্দায়, ছাদে মানুষ মোবাইল ফোনে ভিডিও করছে। কেউ তালি দিচ্ছে। আমি হাততালি দিতে লাগলাম। পুঁচকি হঠাৎ প্রচণ্ড দ্রুততার সঙ্গে এঘর-ওঘর ছুটে নিল, তারপর গম্ভীর হয়ে কার্নিশে উঠে পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল, মাঝেমধ্যে আমাকেও দেখছে। মনে হলো পুরো ঘটনায় পুঁচকির সমর্থন আছে।

২৩ মার্চ, সোমবার

গতকাল রাতে ভেবেছিলাম আবার লিখব; কিন্তু আর লেখা হয়নি। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন সারাক্ষণ টিভিতে খবর শুনব না ঠিক করেছি। বাড়িতে কেউ নেই, তাই টিভিটা চালিয়ে রেখেছি। কথাবার্তা শুনলে একা লাগে না। বহির্জগতের সঙ্গে সংযোগকারী যন্ত্র এটা। যেমন হাতের মোবাইল ফোন। তবে সারাক্ষণ মোবাইল ফোন আর টিভির খবর দেখলে মনে হবে একই কথা বারবার শুনছি। সবাই হোয়াটসঅ্যাপে করোনা নিয়ে জ্ঞান দিয়ে চলেছে। আমি অন্যকে জানাতে ব্যস্ত, কিছু না কিছু। অবশ্য সব সময় যে তা অন্যায়, তা তো নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, প্রকাশেই আনন্দ। খেয়েদেয়ে আমরা হাঁটি, তাতে খাবার হজম হয়ে যায়। তেমন কোনো বই পড়লে তা অন্যকেও জানাতে-পড়াতে ইচ্ছা হয়, এটা তো নার্সিসিজম নয়।

নরেন্দ্র মোদিকে দেখুন। মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কী প্রচণ্ড ক্ষমতা। তাঁর প্রশংসা করলেই অনেকেই বলবেন আমি বিজেপির দালাল। কী মুশকিল। আমি উনি যা যা করেছেন ছয় বছরে সব যে সমর্থন করেছি এমন নয়। সমালোচনার পরিসরটাও অনেকটা। আর সবচেয়ে বড় কথা, কেউ রাহুল গান্ধী তথা গান্ধী পরিবারের স্তাবকতা করলে তা কংগ্রেসের দালালি বলি আমরা? বলতাম, কমিউনিস্টদের দালাল কথাটাও কলকাতায় খুব জনপ্রিয় ছিল। রাজপথের দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও। সে যা হোক, আমাকে বিজেপির দালাল যদি বলেন কী আর করব, শুধু এটুকু বলতে পারি, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার লাইন—বরং আস্থা রাখো দ্বিতীয় সত্তায়। আমার সঙ্গে যদি আপনার মতের অমিল হয় তা হোক, তবু শ্রদ্ধার সঙ্গে ভিন্নমতকে মানার অভ্যাস প্রয়োজন।

২৪ মার্চ, মঙ্গলবার

নরেন্দ্র মোদির মতো কর্মকুশলী সুপ্রশাসক আমি কম দেখিছি। উনি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী তখন কিভাবে তিনি ভুজের যত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করেছিলেন, তা দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে। গুজরাটে সে ভূমিকম্প কাভার করতে সেখানে গিয়েছিলাম। এখন দেখছি তিনি কিভাবে করোনার মতো ভাইরাস যুদ্ধ সামলেছেন। প্রতিপক্ষকে একটা কথা মানতেই হবে, কোটি কোটি মানুষের আস্থা মোদির ওপর আছে বলেই তিনি এভাবে জনতা কারফিউকে সফল করিয়ে দেন। তাঁর কথা মানুষ শুনেছে। একইভাবে আজ রাতে তিনি যখন লকডাউন ঘোষণা করলেন তখন সঙ্গে সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষ তা সমর্থন করেছে। অবাক লাগছিল, সিপিএম এবং রাজ্য কংগ্রেসের কিছু নেতা এখনো করোনা নিয়ে ছিদ্রান্বেষী। তাঁরা এখনো চোখে আঙুল দাদা। তাঁরা বুঝতেই চাইছেন না এ মুহূর্তে বিষয়টা বিজেপি বা সিপিএম বা কংগ্রেসের নয়। এটা আজ গোটা বিশ্বের। সামনে এসে আচমকা দণ্ডায়মান এক ভয়াবহ অসুর। পৃথিবীর গভীর গভীরতম অসুর এখন। এখনো কেন যে মোদিবিরোধিতা করছে জানি না। কয়েক দিনের জন্য ভাবতে পারছি না আমরা তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক। এ দেশের মানুষের বিপুল সমর্থন নিয়ে তিনি ক্ষমতাসীন। সারাক্ষণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসনের নিন্দা না করে ভাবুন তো আজ এক নড়বড়ে জোট সরকার ক্ষমতাসীন হতো, তবে আজ যেভাবে করোনার প্রকোপ কমছে, চিকিৎসকরা বলছেন তা-ও হতো না। নরেন্দ্র মোদি ভারতের এক দীর্ঘ সমাজজীবনে ঢুকে পড়েছেন, এ তো অস্বীকার করা যায় না।

২৫ মার্চ, বুধবার

এই মাত্র খবর পেলাম মধ্য প্রদেশের এক সাংবাদিক করোনায় আক্রান্ত। মানুষকে বুঝতে হবে চাকরির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবন। কে কে সাক্সেনা নামের প্রবীণ সেই রিপোর্টার কেন যে কমলনাথের সাংবাদিক বৈঠকে গিয়েছিলেন কে জানে!

আজ ছাদে গিয়ে গাছে জল দিলাম। গুনলাম, মোট ৬৮টা টব আছে। কত ফুল হয়েছে। জবা, গোলাপ। তুলসীগাছ দুটিতে বেশি জল ঢাললাম। মনে হচ্ছিল ওরা বেশি তৃষ্ণার্ত। কত পাখি এসেছে আজ ছাদে। নাম না জানা। ওদের সাহস মনে হচ্ছে বেড়েছে, একেবারে কাছাকাছি এসে ঝগড়া করছে, ভালোবাসছে দুজনে মিলে। পালাচ্ছে না। হঠাৎ চোখে পড়ল ছাদের কোণে পড়ে আছে পুত্রের শৈশবে কেনা বড় শখের পাখিদের জল আর খাবার দেওয়ার একটা খাঁচা। কত দিন বাদে ছাদে আসছি। আজ রান্না করলাম। খিচুড়ি আর ডিম ভাজা। রান্না করতে গিয়ে বেশি বাসন বের করলাম না। কেননা সব তো এখন নিজেকে ধুতে হবে। নরেন্দ্রপুরে আমরা রোজ নিজেদের বাসন নিজেরাই মাজতাম। কাপড় কাচতাম। রান্নাটা করিনি কখনো। ডাইনিং হলে গিয়ে সবাই একসঙ্গে খেতাম।

টিভিটা চালালাম নিচে এসে। দেখছি মমতা কী প্রচণ্ড সিরিয়াস। কোনো সন্দেহ নেই, করোনাভাইরাস সামলাতে তিনিও পশ্চিমবঙ্গে অনবদ্য। মনে হচ্ছে, এ মুহূর্তে তাঁর মাথায় অন্য আর কিছু আছে। খুবই মমতাময়ী। ঠিক যেভাবে মোদি দিল্লিতে করছেন। রাজ্যে মমতা করছেন। এই কয়েক দিনে দেখলাম দুজনের মধ্যে অনেক মিল আছে। দুজনেই ২৪–৭ রাজনীতি করেন।

দুজনেই মাটি থেকে উঠে এসেছেন। দুজনেই জনপ্রিয় নেতা, দুজনেই টিপিক্যাল শহুরে অভিজাত নেতা নন। দুজনেই গ্রেট কমিউনিকেটর। ভিডিও কনফারেন্সে দেখে মনে হয় সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। লকডাউনে যাওয়ার আগে মোদি ভেবে নেন ২১ দিনের মধ্যে কয়টা শনি, কয়টা রবিবার আছে। উৎপাদন ও অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হবে। রাম নবমী থেকে গুড ফ্রাইডে অনেকগুলো ছুটির দিন আছে। মমতা ভাবছেন কিভাবে অসংগঠিত মুটে-মজুর বাড়িতে থাকলে রোজগার করবে? আর একটা ব্যাপার দেখছি, মমতা আর মোদি দুজনেই জানেন কেন্দ্র আর রাজ্য আপাতত হাতে হাত দিয়ে পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে। এনফোর্সমেন্ট হিন্দু-মুসলমান, মধ্য প্রদেশ সরকার ভাঙা, এসব আপাতত মুক্ত।

২৬ মার্চ, বৃহস্পতিবার

সন্ধ্যায় ইউটিউবে ঠাকুরের আরতি চালালাম। বেলোড়ের সন্ধ্যারতি। খণ্ডন ভব বন্ধন জগ বন্ধন বন্দি তোমায়। এই গানের সুর আমার শির-ধমনিতে প্রবাহিত হচ্ছে। চ্যানেলে একটা অনুষ্ঠান চলছে শাহিনবাগের আন্দোলন কিভাবে নীরবে উঠে গেল করোনাতঙ্কে। দেখছি তবু চার-পাঁচজন বসে ছিল। উঠতে চাইছিল না। পুলিশ বাধ্য করল। কোনো সংবাদমাধ্যমে দেখলাম না করোনার পরও শাহিনবাগ আন্দোলন প্রত্যাহার না করার নিন্দা করতে। সংখ্যালঘু বলে সাতখুন মাফ? কিছু মানুষ এমন ইডিয়ট কেন? এখনো সকালে বাজারে গিয়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে জিনিসপত্র কিনছে। যোগী আদিত্যনাথেরও উচিত হয়নি নবরাত্রির প্রথম দিনে রামলালার মন্দির নির্মাণ করতে গিয়ে এত ভিড়ের মধ্যে যাওয়া। কী দরকার বাবা এখন এসব করার?

২৭ মার্চ, শুক্রবার

দিন পরে যায় দিন। ওহধিত্ফ ঔড়ঁত্হবু-র সুযোগ এসেছে। আমি ভালো আছি। মেইল বক্স ভর্তি হয়ে গেছে, অফিসের সিস্টেম থেকে ফোন আপনার মেইল বাউন্স করছে, প্লিজ খালি করুন! রবীন্দ্রনাথের আগমনী পড়ছি। লিপিকার ছোট প্রবন্ধ। মন জিজ্ঞেস করছে আমাকে, কিছু বুঝতে পারলে? আমি বললাম, সে জন্যই ছুটি নিয়েছি। এত দিন সময় ছিল না। তাই দেখতে পাইনি। শিউলি বনের শিউলি ফুল। ভোরবেলাকার একটি দোয়েল পাখি।

এক অপূর্ব ঝকঝকে সকাল। মনে হচ্ছে চারদিকে দূষণ কমেছে। অর্থনীতির শোচনীয় হাল, ভবিষ্যৎ কী হবে জানি না। গরিব নিম্নবর্ণের মানুষ আরো গরিব হলে মধ্যবিত্তও সর্বহারা হবে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে আর কয়টা দিন। ন্যানো পন্থা। হয়তো ঘন অন্ধকার কালো মেঘের রং, চারধারে থাকে রুপালি রেখার বৃত্ত। রাত্রির তপস্যা দিনকে এনেছে চিরকাল।

প্রকৃতির এ এক অত্যাশ্চর্য প্রতিশোধ। ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে আবার। বদলাতে হবে জীবনধারার অন্ধ কিছু অভ্যাস। দৌড়াতে গিয়ে ক্লোজআপে একে অন্যকে দেখিনি। চড়ংঃ ঃত্ঁঃয নামক এক ভার্চুয়াল বাস্তবতার জীবন-জগৎ তৈরি করে সবাই একেকটা ব্র্যান্ডের ভূত হয়ে নাচছিলাম ডান্স বারের ফ্লোরে। আধা অন্ধকার।

এখন একা একা ভাবছি। ভাবা প্র্যাকটিস করছি। নতুন পৃথিবীর ভাবনা।

লেখক: নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা