kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২ জুন ২০২০। ৯ শাওয়াল ১৪৪১

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দশক বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দশক বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন

২০২০, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। আর এই বছরের ২৫ মার্চ পূর্ণ হলো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার এক দশক, যা কিনা বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের সফল বাস্তবায়ন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ দেশীয় কুখ্যাত সহযোগীরা হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনে অংশ নিয়েছিল এবং প্ররোচনা দিয়েছিল। তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দ্য বাংলাদেশ কলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার ১৯৭২’ প্রণয়ন করা হয়।  আইনটি দালাল আইন ১৯৭২ হিসেবে পরিচিত ছিল। ওই আইন বলবৎ থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই তত্কালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর ‘দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) বিল ১৯৭৩’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। বিলটি উত্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাননীয় মন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন, ‘গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সংঘটিত অন্যান্য অপরাধে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আটক, বিচারে সোপর্দ করা এবং দণ্ডদানের উদ্দেশ্যে বিধি-বিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’ ওই দিনই বিলটি জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তারা (যুদ্ধাপরাধী) মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে তাদের বিচার হবে।’ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সদা উচ্চকিত ও দৃঢ়। স্বজন হারানোদের ক্ষত তিনি অনুভব করতেন। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। সামরিক শাসনের নামে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পদদলিত হতে থাকে সংবিধান, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। দালাল আইন বিলুপ্ত করা হয় এবং এই আইনে সাজাপ্রাপ্ত কয়েক হাজার অপরাধীকে রাতারাতি ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের আইনটিও থেকে যায় নীরব। শুরু হয় স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে ও একাত্তরের গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও প্রতিষ্ঠা করা।

তবে ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এই অঙ্গীকারের সূত্র ধরেই ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী (সিলেট-৩) ‘সংসদের অভিমত এই যে, দেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হউক’—এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সংসদ নেতা  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপরোক্ত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘আজকে সারা দেশের দাবি, জাতির দাবি—যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা ঘোষণা দিয়েছি যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। এটা আমাদের অঙ্গীকার।’ প্রধানমন্ত্রী সেদিন আরো বলেন, ‘অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে এবং এই প্রস্তাবটি আমি সমর্থন করছি।’ এরপর জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে ওই প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর পরই শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা ও ট্রাইব্যুনাল গঠন প্রক্রিয়া।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সংঘটিত অন্যান্য অপরাধে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে করা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর ধারা ৩-এ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং বিচার্য অপরাধগুলো বিবৃত আছে। ১৯৭৩ সালে আইনটি প্রণয়নের সময়ে ‘ব্যক্তি’ কিংবা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে (গ্রুপ অব ইন্ডিভিজ্যুয়ালস) বিচারের আওতায় আনার সুযোগ ছিল না। এ কারণে এ আইনের ৩ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’র (গ্রুপ অব ইন্ডিভিজ্যুয়াল) বিচারের এখতিয়ার দেওয়া হয় ট্রাইব্যুনালকে।

এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১০ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পূর্বক্ষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারকাজ শুরু হয়। তবে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তদন্তকাজ দ্রুত সমাপ্ত হয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হতে থাকলে ২২ মার্চ ২০১২ তারিখে আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যদিও দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালটি ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। উভয় ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রাক-বিচার ও বিচার পর্যায়ে রয়েছে ৩৪টি। রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে একটি মামলা। এই পরিসংখ্যান গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অন্যান্য আদালত/অ্যাডহক/হাইব্রিড ট্রাইব্যুনালগুলোর তুলনায় আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হলেও এটিই চরম সত্য ও বাস্তবতা। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানামুখী ও বহুরূপী চাপ, ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। পরিস্থিতি সামলে নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনবিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সব কার্যক্রম এগিয়ে গেছে দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে। এই বিচারে আসামিপক্ষে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা করেছেন ট্রাইব্যুনালগুলো এবং আপিল বিভাগ, যা দেশীয় আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধগুলো বিচারের ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে উদাহরণ ও নজির সৃষ্টি করেছে। সমৃদ্ধ করেছে আন্তর্জাতিক আইনবিজ্ঞানকে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক সর্বপ্রথম রায় প্রদান করা হয় আবুল কালাম আজাদের মামলায়। কিন্তু অভিযুক্ত এই আসামি পলাতক থাকায় এ রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল হয়নি। ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক দ্বিতীয় রায়টি ছিল আবদুল কাদের মোল্লার মামলায়। এই মামলায় কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এই সাজা সরকার ও ছাত্র-জনতা, ভুক্তভোগী কেউ গ্রহণ করতে পারেনি। কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সৃষ্টি হয়েছিল ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় আন্দোলন—‘গণজাগরণ মঞ্চ’।

১৯৭৩ সালের আইনে শুধু সাজা ও খালাসের বিরুদ্ধে আপিলের বিধান ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত কোনো সাজা বা দণ্ডাদেশ ‘অপর্যাপ্ত’ বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা লক্ষ করব যে জাতিসংঘ সমর্থিত অ্যাডহক ট্রাইব্যুনালগুলোতে অপ্রতুল সাজার বিরুদ্ধে আপিল চেম্বারে আপিলের বিধান রয়েছে। এটিকে সামনে রেখে ১৯৭৩ সালের আইন সংশোধন করে ‘অপর্যাপ্ত সাজার’ বিরুদ্ধে সরকার বা অভিযোগকারী বা এজাহারকারী কর্তৃক আপিল দায়েরের বিধান সন্নিবেশ করা হয়। অতঃপর কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আপিল করে। কাদের মোল্লা নিজেও আপিল করেন। দুটি আপিল একত্রে শুনানির পর ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রায় প্রদান করেন আপিল বিভাগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে [৪ঃ১] রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাড়িয়ে কাদের মোল্লাকে ‘মৃত্যুদণ্ডাদেশ’ প্রদান করা হয়।

এই মামলায় আসামিপক্ষের বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা নেই এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয় সুনির্দিষ্ট নয়। তাই ট্রাইব্যুনালকে ‘প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন’ (Customary international law) অনুসরণ করতে হবে। আর বিদ্যমান ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩’ অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধগুলো বিচারের এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের নেই।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবং আদালতকে সহায়তাকারী সাতজন বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীর বক্তব্য শোনার পর আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে—(ক) প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন যেহেতু দেশীয় আইনের অধীনে কোনো ট্রাইব্যুনাল গঠনকে বারিত করেনি। তাই আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের সম্পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে। (খ) আইন ১৯৭৩-এর সঙ্গে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনগুলো কোনোভাবেই বেমানান (repugnant) নয়। (গ) প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে আইন ১৯৭৩-এর কোনো বিষয় সাংঘর্ষিক হলে আইন ১৯৭৩ প্রাধান্য পাবে। (ঘ) আইন ১৯৭৩ যেহেতু সংবিধিবদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ আইন, তাই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের (যেমন—ন্যুরেমবার্গ অথবা বলকান বিচার) সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

আসামিপক্ষে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করে ১৯৭৪ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) মাধ্যমে তাদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে দেওয়ার পর আইন ১৯৭৩ অনুসারে অন্য কোনো ব্যক্তির বিচার করার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হয়ে আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ১৯৭৪ সালে যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি কোনোভাবেই আইন ১৯৭৩-এর সমকক্ষ হতে পারে না বা আইনের কোনো বিধানকে অকার্যকর, অক্ষম বা বাতিল করতে পারে না। ওই চুক্তি একটি ‘এক্সিকিউটিভ অ্যাক্ট’, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো অপরাধের বিচারে বাধা সৃষ্টি করে না।

আসামিপক্ষে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, শুধু সশস্ত্র বাহিনী (আর্মড ফোর্স) ও তাদের সহযোগী বাহিনীর (অক্সিলারি ফোর্স) যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে বা করবে, তাদের বিচারের লক্ষ্য নিয়েই ১৯৭৩ সালে আইন প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আইনটি সংশোধন করে ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের আওতাভুক্ত করা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মূল আইনের উদ্দেশ্য ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে আপিল বিভাগ ও ট্রাইব্যুনালে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আইন ১৯৭৩-এর ধারা ৩(১) সংশোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারকে বৃদ্ধি করে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অথবা তাদের ‘সহযোগী বাহিনী’র পাশাপাশি অপরাধে যুক্ত ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের ক্ষমতা দেওয়ায় আইন বা সংবিধানের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ওই সংশোধনী মূল আইনের অংশ হিসেবে বিবেচ্য। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৭(৩) অনুযায়ী আইন ১৯৭৩ সুরক্ষিত। ওই আইনকে কখনো চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, যদি তা বেআইনি কিংবা বাতিলযোগ্য হয়ে থাকে।

আসামিপক্ষের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ১৯৭২ সালের দালাল আইন এবং আইন ১৯৭৩ দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন আইন। দালাল আইন প্রণীত হয়েছিল ওই আইনের তফসিলে উল্লিখিত অপরাধগুলো বিচারের জন্য, যা ছিল মূলত দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) অধীনে অপরাধ। কিন্তু আইন ১৯৭৩ প্রণীত হয়েছিল মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং অন্য অপরাধগুলো, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে সংঘটিত হয়েছে বা হবে, তা বিচারের জন্য। সুতরাং উপরোক্ত ওই দুটি আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধগুলোকে এক ও অভিন্নভাবে চিত্রায়িত করার কোনো সুযোগ নেই।

এখানে উল্লেখ করা সংগত হবে যে দালাল আইনে আটক ব্যক্তি যারা খুন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না, শুধু তাদেরই সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ওই ঘোষণায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে ‘দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ৩০৪ (অপরাধজনক নরহত্যা), ৩৭৬ (ধর্ষণ), ৪৩৫ (অগ্নিসংযোগ কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্ম সাধন), ৪৩৬ (ঘরবাড়ি ধ্বংসের অভিপ্রায়ে অগ্নিসংযোগ কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্ম সাধন), ৪৩৮ (জাহাজে অগ্নিসংযোগ কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্ম সাধন) মোতাবেক অভিযুক্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১ নম্বর অনুচ্ছেদ মোতাবেক ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হবে না।’

‘ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার’ (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) সম্পর্কে আসামিপক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে ‘ঊর্ধ্বতনের দায়দায়িত্ব’ (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) সম্পর্কিত আইনি নীতিটি বেসামরিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তা হবে শুধু সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও কামারুজ্জামান মামলায় ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে বেসামরিক কোনো ব্যক্তি কোনো সশস্ত্র বাহিনীর ‘সহযোগী বাহিনীর’ (আলবদর বাহিনী) উচ্চতর/ঊর্ধ্বতন পদে বা দায়িত্ব পালন করলে ওই বাহিনীর অধস্তন ব্যক্তি/সদস্যদের অপরাধের দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উচ্চতর পদে বা নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপরেও বর্তাবে। কোনো গোষ্ঠী বা বেসামারিক সহযোগী সংগঠনের অধস্তনদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্বভাবতই সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির ওপর বর্তায়।

এ ছাড়া মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, ‘বেসামরিক ব্যক্তি’ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার) আইনি নীতি অনুযায়ী কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগী কোনো বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে বা নেতৃত্বে থাকলে ওই বাহিনীর অধস্তন ব্যক্তি/সদস্যদের অপরাধের দায়দায়িত্ব তাকে বহন করতে হবে এবং ‘ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার’-এর কারণে অধস্তনদের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে। আপিল বিভাগও ট্রাইব্যুনালের ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করে আলবদর বাহিনীর শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত নিজামীর দণ্ড ও সাজা উপরোক্ত আইনি নীতির আলোকে বহাল রেখেছেন। [১৩ এডিসি (এডি), পৃষ্ঠা ৬০৭, অনুচ্ছেদ ৪৯, ৫১, ৫৩, ৫৬]

আসামিপক্ষে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে দুটি উপাদান থাকতে হবে। একটি হলো—অপরাধটি যেন ‘ব্যাপক’ এবং ‘পরিকল্পিত/সুসংগঠিত’ (রিফবংঢ়ত্বধফ ধহফ ংুংঃবসধঃরপ) আক্রমণে সংঘটিত হয়েছে। অপরটি হলো ‘ব্যাপক ও পরিকল্পিত/সুসংগঠিত’ আক্রমণের বিষয়ে অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ ‘জ্ঞান’ ও ‘সমর্থন’ রয়েছে। কিন্তু আইন ১৯৭৩-এ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত। তাই এই আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের’ বিচার করার কোনো এখতিয়ার নেই। কিন্তু  ট্রাইব্যুনালগুলো এ আইনি প্রশ্ন নিষ্পত্তি করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে ১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী যাদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে, তারা সবাই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীকে (সিভিলিয়ন পপুলেশন) লক্ষ্য করে করে ‘ব্যাপক’ এবং ‘সুসংগঠিত’ আক্রমণ চালিয়ে অপরাধ সংঘটন করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। সুতরাং বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধকালে নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত আক্রমণগুলো যে ‘ব্যাপক এবং সুসংগঠিত আক্রমণ’ ছিল, তা আর আলাদা করে প্রমাণ করার প্রয়োজন পড়ে না।

এ বিষয়ে আপিল বিভাগ আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় অভিমত দিয়েছেন যে আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের জন্য অপরাধটি ‘ব্যাপক এবং সুসংগঠিত’ ছিল, তা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। অপরাধ সংঘটনের জন্য এটি প্রমাণ করাই যথেষ্ট হবে যে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলকে নস্যাৎ এবং নির্বাচনে বিজয়ীদের ফল ভোগ করতে না দেওয়া এবং বাঙালি জাতির স্বাধিকারকে অবদমিত করার উদ্দেশ্য থেকে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চলাকালে কোনো ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণ’ সাধারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ, আক্রমণের উদ্যোগ বা ষড়যন্ত্র করেছে। আপিল বিভাগের এ ব্যাখ্যা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ সংঘটনের প্রেক্ষাপটের পরিধি আরো বিস্তৃত করেছে।

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের (ইউডিএইচআর) অনুচ্ছেদ ৮ এবং আইসিসিপিআরের ২(৩) অনুচ্ছেদে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘কার্যকর’ প্রতিকারের বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই বিবেচনায় বাংলাদেশে নিজস্ব আইনে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান বিচার কার্যক্রমের এখতিয়ার ও বৈধতা এবং স্বচ্ছতা ও মান প্রশ্নাতীত এবং যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তিমুক্ত। 

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ মি. স্টিফেন জে র‌্যাপ বেশ কয়েকবার ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শন ও এর বিচারিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। অনেক বৈশ্বিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতো তিনিও বাংলাদেশের নিজস্ব বিচারিক ফোরামে মানবাধিকার লঙ্ঘনপ্রসূত অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে—[„..] these trials [„.] are of great importance to the victims of the 1971 war of independence from Pakistan. What happens in Bangladesh today will send a strong message that it is possible for a national system to bring those responsible for grave human rights abuses to justice. [‘Old Evidence and Core International crimes : FICHL Publication series No.16 (2012)-page 169]

মহান মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত অপরাধগুলো তদন্ত করা এবং অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিকে বিচারে সোপর্দ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই এসব অপরাধের বিচারের জন্য ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক অপরাধগুলো অর্থাৎ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলোও গণহত্যার বিচারে অনন্য নজির স্থাপন করেছে, যা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অপ্রতিরোধ্য অঙ্গীকারের প্রতিফলন। প্রকাশ্য, স্বচ্ছ এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করে এ বিচারব্যবস্থা আগ্রহ ও নজর কেড়েছে বিশ্বসম্প্রদায়ের। বৈশ্বিক আইন অঙ্গনেও বাংলাদেশের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ আজ ইতিবাচক আলোচনার বিষয়। ১৯৭৩ সালে প্রণীত দেশীয় আইনে গঠিত বিচারিক ফোরামে বর্বর অপরাধের বিচার ভবিষ্যতে বিশ্বের যেকোনো ভূখণ্ডে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

লেখক : বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা