kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

রাজনীতিতে কি সুবাতাস বইবে

এ কে এম শাহনাওয়াজ

২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রাজনীতিতে কি সুবাতাস বইবে

আমাদের দেশের সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে গত্বাঁধা ঝগড়াটে রাজনীতি দেখে দেখে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও কোনো পর্বেই সরকারি আর বিরোধী দলের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ধরনে সামান্য পরিবর্তন এলো না। রাজনীতি স্মার্ট হলো না। একে অন্যের ছিদ্রান্বেষণেই ব্যস্ত রইল। জাতীয় দুর্যোগেও ঐকমত্যে কোনো কথা বলতে পারল না বিবদমান দুই দল। সরকারপক্ষ কখনো বিরোধীপক্ষের কোনো গুণ খুঁজে পেল না আবার বিরোধীপক্ষও সরকারপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে পারল না। আমি জানি না সারা দুনিয়ায়ই দুই পক্ষের আচরণ এমনই হয় কি না। এবার সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, বিশ্বজুড়ে মহামারিরূপে আবির্ভূত করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আঘাত হানার পর দুই পক্ষ এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ঐকমত্যে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তা হলো না। যথারীতি বিএনপি সরকারের খুঁত ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, নিজ দলের কর্মী-সমর্থকরাও এমন আচরণ ভালোভাবে দেখছে কি না তার বিচার করারও প্রয়োজন মনে করল না।

রাজনীতিতে বিএনপির ছন্নছাড়া দশা চলছে অনেক দিন। এই অমানিশা কাটছে না। এর কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে বলে মানুষ বিশ্বাস করে। একটি হচ্ছে, সেই ২০১৪ থেকে বিএনপি উগ্রবাদের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা পাওয়ার ভুল চেষ্টায় নিজ তৈরি জালেই যেন আটকে গেছে। এর পর থেকে বিএনপি সরকারের কাছে যেন ‘বাগে পাওয়া বাঘ’। সুতরাং দলটিকে প্রবল প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও সরকারের কোণঠাসা করে ফেলতে অসুবিধা হয়নি। এই বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিজেদের যেহেতু ভুল ও অন্যায়ের কমতি নেই, তাই বিএনপি নেতৃত্বের উচিত ছিল গতানুগতিক রাজনৈতিক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা। কৌশলী আচরণের মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ ধারা তৈরি করা। দলীয় সংহতি বৃদ্ধি করা। দেশজুড়ে দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করা। কিন্তু নেতৃত্বের দুর্বলতায় এর কিছুই হলো না। শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় করা দুর্নীতির মামলায় আইনি প্রক্রিয়ায়ই ফেঁসে গেলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কারাগারে অন্তরিন হলেন তিনি। আদালতের রায়ে সাজা হয়ে গেল। সুতরাং আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া খালেদা জিয়া যে জামিন পাবেন না, তা নিশ্চিত ছিল। এ ক্ষেত্রে বিএনপি নেতা ও আইনজীবীদের অভিযোগ ছিল—আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে সরকার। আমাদের দেশের বাস্তবতায় তা উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। আর বিষয়টি বিএনপি নেতাদেরই ভালো বোঝার কথা। কারণ ক্ষমতায় থাকতে তাঁরাও এজাতীয় চর্চা করেছেন। বিএনপির জন্য আরেকটি পথ খোলা ছিল, তা হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলা। দুই বছর ধরে সে কথা বলেও বেড়াচ্ছিলেন বিএনপি নেতারা। কিন্তু অসংঘবদ্ধ দলে এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। শর্ত সাপেক্ষে সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তির একটি পথ খোলা ছিল। সরকারপক্ষ সেই ইঙ্গিত অনেকবারই দিয়েছে; কিন্তু বিএনপি নেতৃত্ব সে পথে হাঁটতে চায়নি। সম্ভবত খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধ অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার ইচ্ছা ছিল। তাই খালেদা জিয়ার পরিবার অনেকবার এগিয়ে এলেও নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের কারণে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। আমাদের ধারণা, পরিবার শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে আর থাকতে চায়নি। দলের দিকে না তাকিয়ে বা দলীয় নেতাদের বাধ্য করে শর্ত মেনে খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তির আবেদন করেছে। ধরে নেওয়া যায়, এতে খালেদা জিয়ার সায় ছিল।

সরকার বা সরকারপ্রধান আইনি সমর্থন থাকায় নির্বাহী আদেশে মুক্তি না দেওয়ার জন্য একগুঁয়ে মনোভাব প্রকাশ করতে পারতেন। আমাদের মরচে ধরা রাজনীতির জন্য এটি শুভ যে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তা করেননি। সম্ভবত করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার বার্ধক্য অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে সাজা স্থগিত করে নির্বাহী আদেশে ছয় মাসের জন্য তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন।

সব দিক বিচার করলে এই মুক্তির পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানবিক বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে বলে আমাদের ধারণা। কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিতে প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবেশ থাকবে না—এমন হতে পারে না! বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে অনেকবার শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব আর লুকোছাপা নেই। তাই অনেকেরই ধারণা ছিল, যেহেতু আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়া কারাগারে সাজা ভোগ করছেন, তাই শেখ হাসিনা কোনো অনুকম্পা দেখাবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব অতিক্রম করতে পারলেন। তিনি নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দিলেন খালেদা জিয়াকে।

ঘটনার পারম্পর্যে এখন অনেকটা স্পষ্ট, পরিবারের আবেদনে শর্ত সাপেক্ষে আরো আগেই এই মুক্তি হয়তো মিলত। পরিবার ও স্বয়ং খালেদা জিয়ারও হয়তো এতে সায় ছিল। কিন্তু বিএনপির রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা হয়তো রাজনীতির স্বার্থে এভাবে মুক্তি চাননি। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হতে হয়েছে পরিবারকে। সত্তরোর্ধ্ব একজন মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এভাবে কারান্তরিন থাকবেন—রাজনৈতিক সুবিধাবাদীদের তা ছুঁয়ে না গেলেও পরিবারের মর্মে তা আঘাত করবে। তাই হয়তো পরিবার শর্ত মেনে মুক্তির আবেদন করে সরকারপ্রধানের কাছে। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকেই মর্যাদা দিলেন।

আমাদের দেশের বাস্তবতায় নিঃসন্দেহে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অনুসরণযোগ্যও বটে। এ দেশের মানুষ চলমান রাজনীতির আদর্শ আর ধরন দেখে খুব স্বস্তিতে নেই। অনেকটা পানিবিহীন মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো। খটখটে মরুময় রাজনীতিতে একটু জলসিঞ্চনের জন্য উদ্বাহু তারা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার মুক্তি যেন সেই জলধারা। এ দেশের মানুষ দুর্লভ এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। আমাদের রাজনীতির জন্যও খুব ইতিবাচক হয় যদি রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা পক্ষ এ থেকে শিক্ষা নেয়। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে সব পক্ষ সততার চর্চা করে আদর্শ আর নীতিবোধ সামনে রেখে যদি রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাতে পারে।

বিএনপি এখন ব্যাকফুটে আছে। এত দিন ভুল সিদ্ধান্তে পুরনো ধারায় রাজনীতি করে কোনো ফল লাভ করতে পারেনি। পেছনে নানা ধরনের অন্ধকার ইতিহাস নিয়ে শুধু সরকারবিরোধী বিবৃতি পাঠ করে যে জনমত গঠন করা যায় না, সে প্রমাণ তো বিএনপি নেতারা পেয়েছেন। আমরা বহুবার লিখেছি, বিএনপি তাদের রাজনৈতিক দুঃসময়ে গত্বাঁধা রাজনীতিচর্চা থেকে যদি বেরিয়ে আসতে পারত, যদি সরকার সমালোচনায় সারাক্ষণ ব্যস্ত না থেকে দলকে সংঘবদ্ধ করে ইতিবাচক রাজনীতির একটি পথ নির্মাণ করত, তাহলে ধীরে ধীরে একটি জনসমর্থন বিএনপির দিকে চলে আসত। কিন্তু অতটা ধৈর্য নিয়ে বিএনপি নেতৃত্ব রাজনীতির মাঠে থাকতে পারেনি। আমরা আশা করব, খালেদা জিয়ার মুক্তির মধ্য দিয়ে রাজনীতির মানবিক ধারার যেটুকু পরিচয় আমরা পেয়েছি, তা দেখে বিএনপি নেতৃত্বের বোধোদয় হবে। খালেদা জিয়ার পরিবার এই মুক্তির কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যেভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে—স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি নেতৃত্ব, এখান থেকেই যাত্রা শুরু করুন না কেন!

এ সত্যটিও মানতে হবে, আওয়ামী লীগের সব নেতানেত্রী তাঁদের সভানেত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মনন ধারণ করেন তেমন নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক আচরণের দীক্ষা তাঁদেরও নিতে হবে ইতিবাচক রাজনীতির ধারা প্রসারিত করার মাধ্যমে। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে হাঁটার যে ধারা তৈরি করেছে, তাতে অন্তত আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে বাঙালির অসাধারণ ক্ষমতা-শক্তির সত্যতা। এই জাতিকে ইতিবাচক ক্ষেত্রে চালিত করতে পারলে আমাদের পক্ষে অনেকটা উচ্চতায় উঠা সম্ভব। আর এর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে রাজনীতির অঙ্গন। আমাদের সব পক্ষের রাজনীতি যদি সৎ, আদর্শিক ও দেশপ্রেমের শক্তি নিয়ে অগ্রসর হতে পারে, তবে সব ক্ষেত্রে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। আমরা প্রত্যাশা করতে চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তির সূত্র সেই আলোর পথনির্দেশনা দেবে।

 

 লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য