kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার এখনই সময়

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার এখনই সময়

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের মাটিতে নিষ্ঠুরতম ভয়ংকর গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারপর আট মাস ২২ দিন, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা বাংলাদেশের ৩০ লাখ নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বড় গণহত্যা আর কোথাও সংঘটিত হয়নি। বিশ্বের রেকর্ডকৃত ইতিহাসের তথ্য মতে, সংখ্যার দিক থেকে বড় গণহত্যা চালায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী। পাঁচ বছরে তারা প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করে। এতে বছরে গড়ে প্রায় ১২ লাখ মানুষ গেস্টাপো বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। আর বাংলাদেশে মাত্র আট মাস ২২ দিনে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী হত্যা করে ৩০ লাখ মানুষ। সুতরাং সব বিচারে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের গণহত্যা বিশ্বের ইতিহাসে সর্ববৃহত্ গণহত্যা। ইহুদি হত্যার বিচার হয়েছে। শুধু বিচার নয়, বিনিময়ে ইহুদিরা স্বতন্ত্র একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে। ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে তার স্বীকৃতি পেয়েছে। ইহুদিদের একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হাজার বছরের প্রতিষ্ঠিত একটি জাতিকে তাদের মাতৃভূমি থেকে উত্খাত করেছে। আর আমরা বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণহত্যার শিকার হয়েও ৫০ বছরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত পেলাম না। এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের লজ্জিত হওয়া উচিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান শাসক, বর্তমানের তুরস্ক কর্তৃক আর্মেনিয়ায় গণহত্যা চালিয়ে আট লাখ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়। তার বিচার হয়নি বটে, তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায় কমিউনিস্ট নেতা পলপটের হুকুমে ক্ষমতা দখলকারী কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাডার বাহিনী চার বছরে প্রায় ১৮ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সেই গণহত্যারও বিচার হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে। আবার আমাদের গণহত্যার অনেক পরে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে সংঘটিত রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পাওয়া গেছে। তখন রুয়ান্ডায় জাতিগত দাঙ্গায় আট লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়। সুতরাং দুঃখ ও বেদনাক্লিষ্ট মনে বলতে হচ্ছে, আজ প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণহত্যার স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত আমরা পেলাম না। কেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলাম না, কেন বিচার পেলাম না, তার প্রেক্ষাপট ও কারণ এখন প্রায় সবাই কিছু জানেন।

একাত্তরের গণহত্যার বিচার পেতে হলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই গণহত্যা প্রমাণ করার জন্য খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। ওই গণহত্যায় অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব লিখিত স্বীকারোক্তি এবং রেকর্ডকৃত দলিলপত্রই যথেষ্ট হবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিক লিখিত মিলিটারি অপারেশন আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা চালায়। এই লিখিত আদেশটি পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের রচনা ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থের অংশ হিসেবে সংযুক্ত আছে। সিদ্দিক সালিক একাত্তরের পুরো ৯ মাসই বাংলাদেশে ছিলেন। ওই লিখিত আদেশনামাই গণহত্যার অকাট্য দলিল। অপারেশন সার্চলাইট ১, অর্থাত্ ২৫ মার্চ রাতে পরিচালিত সামরিক অভিযানের জন্য ঢাকা শহর ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশের দায়িত্বে ছিলেন ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। ঢাকা শহরে অপারেশন পরিচালনায় সরাসরি দায়িত্বে ছিলেন ঢাকায় অবস্থিত ৫৭ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব এবং সার্বিক তদারকির দায়িত্বে ছিলেন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হামিদ খান ১৭ মার্চ খাদিম হোসেন রাজাকে অপারেশন সার্চলাইটের আদেশনামা চূড়ান্ত করার হুকুম দেন। খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলী ১৮ মার্চ একত্রে ঢাকা সেনানিবাসে বসে অপারেশনের আদেশনামা চূড়ান্ত করেন। এখানে উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে পরামর্শের পর পূর্ব পাকিস্তানে সেনা অভিযানের জন্য সেনাপ্রধান হামিদ খানকে প্রস্তুত হতে বলেন। জেনারেল হামিদ ও পূর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর ও সামরিক প্রধান টিক্কা খান একত্রে অপারেশন সার্চলাইটের অনুমোদন প্রদান করেন ২০ মার্চ। এর মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) গুল হাসান কয়েকবার রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্ররোচনায় গুল হাসান ও টিক্কা খান দুজন মিলে ইয়াহিয়া খানকে পরামর্শ দেন, সাড়ে সাত কোটির মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ লাখ বাঙালি হত্যা করলে কিছু যাবে-আসবে না। বরং তাতে সব ঠিক হয়ে যাবে এবং পাকিস্তান রক্ষা পাবে। আগামী ৩০ বছর নিশ্চিন্তে বাঙালিদের শাসন করা যাবে। এই যে কথাগুলো ওপরে উল্লেখ করলাম এগুলো আমার নিজের কথা নয়, অনুমানও নয়। গণহত্যার দুই প্রধান কালপ্রিট নিয়াজি ও খাদিম হোসেন রাজা কর্তৃক লিখিত গ্রন্থেই এগুলোর সবিস্তার বর্ণনা আছে। স্বীকারোক্তিমূলক এভিডেন্স।

নিয়াজির লেখা বইয়ের নাম ‘The Betrayal of East Pakistan’ আর খাদিম হোসেনের বইয়ের নাম ‘A Stranger in my own country’. সার্চলাইটের আদেশনামায় সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট উল্লেখপূর্বক আদেশ প্রদান করা হয়। টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষভাবে ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, ঢাকা হল এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা। ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ১৮ পাঞ্জাব বাহিনীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইভাবে ৫৭ পদাতিক ব্রিগেডের ২২ বালুচ, ৩২ পাঞ্জাব, ৩১ গোলন্দাজ ও ১৩ ফ্রন্টিয়ার বাহিনীকে পুরান ঢাকা, শাঁখারীবাজার, পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় বিষয় হলো, লিখিতভাবে সামরিক অপারেশন আদেশনামায় বেসামরিক এলাকা ও বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেবসহ এক ডজনের ওপর শিক্ষক এবং কয়েক শ ছাত্রকে হত্যা করা হয়। এক রাতেই শুধু শাঁখারীবাজারে নিহত হয় প্রায় আট হাজার মানুষ। চকবাজারসহ ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকায়ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। পুরান ঢাকায় প্রধানত টার্গেট করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে। ঘুমন্ত নারী, শিশুসহ ঘরবাড়িতে গানপাউডারের মাধ্যমে আগুন দেওয়া হয়।

২৫ মার্চের ভয়াবহ নৃশংস গণহত্যার বর্ণনা বিশ্ব মিডিয়ায় ছাপা হয়। একমাত্র বিদেশি সাংবাদিক সাইমন ড্রিং ওই রাতে ঢাকায় ছিলেন। পরে লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে ৩১ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় তিনি তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ‘নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সব ধরনের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে। ইকবাল হল ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। শুধু ইকবাল হলেই প্রথম ধাক্কায় ২০০ ছাত্র নিহত হয়। দুই দিন পর্যন্ত পোড়া ঘরগুলোর জানালায় মৃতদেহ ঝুলে থাকতে দেখা যায়।’ বেসামরিক মানুষের ওপর এমন সমন্বিত অস্ত্রের ব্যবহার বিশ্বে আর কোথাও হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকায় প্রতিবেদন বের হয়, ২৫ মার্চ রাতে সারা বাংলাদেশে এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধ সম্পর্কে জেনেভা কনভেনশনের প্রারম্ভে বলা হয়েছে, Even Wars have limit, civilian should never be targetted. এরপর জেনেভা কনভেনশনে যুদ্ধরত বাহিনীকে ১০টি রুলস বা বিধি মান্য করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সেখানে তিনটি বিধির মাধ্যমে বিশেষভাবে বেসামরিক মানুষের জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ নম্বর—Prohibit targeting civilians, doing so is a war crime. পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে টার্গেট করেছে। তার প্রমাণ তাদের লিখিত দলিলেই উল্লেখ আছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে পাকিস্তান কিছুতেই রক্ষা পাবে না। সিদ্দিক সালিক ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থের ৭৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোরবেলায় শেরেবাংলানগরে অবস্থিত নিজের কমান্ড পোস্ট থেকে বাইরে এসে শহরের দিকে তাকিয়ে টিক্কা খান বিদ্রুপের হাসিতে বলেছিলেন, ঢাকা শহরে কয়েকটি নেড়িকুত্তা ছাড়া মানুষজন কিছু অবশিষ্ট আছে বলে তো মনে হয় না। জেনারেল নিয়াজি তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।’ নিয়াজি তাঁর বইয়ে আরো উল্লেখ করেছেন, টিক্কা খান পোড়ামাটির নীতি গ্রহণ করেন এবং সে অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবকে হুকুম দেন। রাও ফরমান আলী তাঁর টেবিল ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে। যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক চেষ্টা করেও গণহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিতে পারেনি।

জেনারেল নিয়াজি, রাও ফরমান আলী এবং ব্রিগেড ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডাররা যেসব বিবৃতি ওই তদন্ত কমিটির কাছে দাখিল করেছেন, সেটিই গণহত্যা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পরেই শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্পষ্টতই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান আগ্রাসী পক্ষ এবং প্রথম আক্রমণকারী। তাই জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী এই যুদ্ধের সব দায়দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তানের ওপর। সুতরাং শুধু গণহত্যার বিচার নয়, পাকিস্তানকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণও বাংলাদেশকে দিতে হবে। ৫০ বছর পার হয়ে গেলেও আমরা কিছুই ভুলিনি। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ আজ অর্থনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। তাই আন্তর্জাতিক আইনের কাছে তাদের মাথা নত করতে হবে, যেমনটি তারা করেছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর। সুতরাং আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা দায়ের করার এখনই উপযুক্ত সময়।

 

লেখক : রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সামরিক বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা