kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

সময়ের প্রতিধ্বনি

করোনাভাইরাস, হুজুগে বাঙালি এবং আমাদের নিয়তি

মোস্তফা কামাল

২৪ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনাভাইরাস, হুজুগে বাঙালি এবং আমাদের নিয়তি

অজানা শত্রু করোনাভাইরাসের ভয়ে সারা বিশ্বের মানুষ আতঙ্কিত, শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। তার পরও মানুষ লড়ছে। ছায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো অবস্থা আর কী! কিভাবে শত্রুর মোকাবেলা করবে তা নিয়ে সবাই ব্যতিব্যস্ত। একেক দেশের শাসকরা একেকভাবে তাঁর জনগণকে সুরক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আবার কারো কারো অবহেলায় বিপদে পড়ছে মানুষ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় ধকল আর কখনো সইতে হয়নি পৃথিবীকে। যদিও সেই যুদ্ধ ছিল মানবসৃষ্ট। শত্রু কে তা মানুষ জানত। কোথায় আঘাত হানতে পারে সে সম্পর্কেও সবার এক রকম ধারণা ছিল। আর এবারের আঘাত হচ্ছে প্রকৃতির। কেউ জানে না, এই শত্রু কোথায় কখন আঘাত হানবে। বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝার পূর্বাভাস পাওয়া যায়। মানুষ সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারে; কিন্তু করোনাভাইরাস পূর্বাভাস ছাড়াই মানবজাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

রবিবার রাত ১টা পর্যন্ত যে হিসাব আমরা পেয়েছি তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৮৯টি দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিশ্বে তিন লাখ ৪০ হাজার ৪০৮ জন আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ১৪ হাজার ৫৭৩ জন। মৃতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। যদিও আক্রান্তের তুলনায় সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফেরার সংখ্যা অনেক বেশি। তার পরও মানুষের উদ্বেগ কাটছে না। উদ্বিগ্ন বিশ্বের প্রায় এক শ কোটি মানুষ ঘরে বন্দি। সারা দুনিয়ার খেলাধুলার উন্মাদনা থেমে গেছে। সম্মেলন, সেমিনারসহ সব ধরনের কর্মসূচি বন্ধ হয়ে গেছে। সামনে কী হবে তা নিয়ে সারা বিশ্বই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

করোনাভাইরাসের সূত্রপাত হয় গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি; চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে। তারপর ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ করোনাভাইরাসের মুখোমুখি হয় ২১ জানুয়ারি থেকে। উহান থেকে ৩১২ জন যাত্রী ওই দিন বাংলাদেশে আসে। ২০ মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ বাংলাদেশি বিদেশ থেকে দেশে ঢুকেছে। ৭ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়।

প্রথমে চীনও বুঝতে পারেনি উহান শহর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। শুরুতে তাদের অবহেলা ছিল। পরে যখন বুঝতে পারল তখন অনেকেই আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আক্রান্তরাই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেয় সারা বিশ্বে। থরথর করে বিশ্ব কাঁপছে করোনা-জ্বরে। থমকে গেছে জীবনযাত্রা। ওলটপালট হয়ে গেছে দৈনন্দিন রুটিন। কোনো কোনো দেশ এরই মধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। কোনো কোনো শহর লকডাউন করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রবিবার সারা দেশে জনতা-কারফিউয়ের ডাক দিয়েছেন। মানুষকে সচেতন করার জন্যই এই ব্যবস্থা। যদিও ভারতে এখন পর্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। এখন পর্যন্ত ছয়জন মারা গেছে। জনবহুল দেশ হওয়ার কারণে ভারত শুরু থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

আসলে আমাদের উহান থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। চীন কিভাবে শহরটিকে করোনামুক্ত করেছে; কিভাবে ওই দেশের আক্রান্ত মানুষগুলোকে বাঁচিয়েছে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। চীন সরকারের ফর্মুলা ব্যবহার করলে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণকেও দ্রুততম সময়ে সুরক্ষা করা যাবে; কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে সময়মতো ব্যবস্থা নিই না। শুধু গালভরা বুলি আওড়াতে আমরা পছন্দ করি। কাজে বিশ্বাস করি না।

আমাদের অতি কথক কয়েকজন মন্ত্রীর মুখে শুনে আসছি, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আমরা নাকি প্রস্তুত আছি। আমাদের কী ধরনের প্রস্তুতি আছে তা আমরা জানি না। উল্টো দেখছি, বিমানবন্দর দিয়ে হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি ঢুকে পড়ছে। দেখার যেন কেউ নেই। গত শুক্র ও শনিবার দেদার লোক ঢুকেছে বিমানবন্দর দিয়ে। কেউ তাদের আটকায়নি। জিজ্ঞেসও করেনি। অনেকেই বিমানবন্দর থেকে সোজা কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে হাজারো মানুষের ভিড় ঠেলে ট্রেনে চেপে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। অনেকে গেছে বাসে চড়ে। এই তো আমাদের প্রস্তুতি!

২.

হুজুগে বাঙালির বদনাম আছে বহির্বিশ্বে। চিলে কান নিয়ে গেছে বললেই তারা ছোটে চিলের পেছনে। একবারও কানে হাত দিয়ে দেখে না, কানটা যথাস্থানে আছে কি না। হায় রে বাঙালি! শিক্ষাদীক্ষায়, বিত্তবৈভবে বড় হলে কী হবে; অভ্যাস বদলাতে পারছে না। ইংরেজরা দুই শ বছরেও বাঙালিকে শৃঙ্খলায় আনতে পারল না। নিজেরাও কিছু শিখল না।

কেউ একজন স্বপ্নে দেখেছেন, থানকুনি পাতা খেলে করোনাভাইরাসের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ব্যস, শুরু হয়ে গেল থানকুনি পাতা কেনা! পাঁচ টাকার থানকুনির আঁটি হয়ে গেল পঞ্চাশ টাকা। তার পরও মানুষ কিনছে। থানকুনিই নাকি মুক্তির পথ!

কেউ একজন বলেছেন, করোনাভাইরাস ছয় মাস, এক বছরেও বিদায় হবে না। বাজারে কোনো খাবার পাওয়া যাবে না। কাজেই খাবার কিনে রাখতে হবে। হুজুগে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ল বাজারে। কেউ তিন মাস, কেউ ছয় মাস, কেউ এক বছরের খাবার মজুদ রাখতে চাল, ডাল, লবণ, তেল কিনতে শুরু করল। সরকার যতই বলছে এক বছরের খাবার মজুদ আছে, সে কথা কে শোনে?

শুধুই কি নিত্যপণ্যের বাজার! ডেটল, স্যাভলনসহ কীটনাশক জাতীয় যাবতীয় ওষুধ কিনে ওষুধের দোকান সাফ করে ফেলেছে। বোঝা যাচ্ছে, বাঙালির ঘরে পয়সা হয়েছে। অন্য কারো জন্য না রেখে পয়সাওয়ালা বাঙালি সব কিনে ঘরে তুলেছে। তাদেরই বাঁচতে হবে। গরিব মানুষদের বাঁচার দরকার নেই; কিন্তু এই সমাজে তাদেরও যে প্রয়োজন আছে, তা কেউ ভাবে না। সবাই যেন নিজের ভাবনা ভাবছে।

আমাদের নাগরিকদের সচেতনতা কিংবা মাত্রাজ্ঞানের যে কত অভাব তা দু-একটি উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারছেন। যদিও এরই মধ্যে অনেকে গণমাধ্যমের বদৌলতে জেনে গেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছুদিন আগে একজন এলেন করোনাভাইরাস নিয়ে। তাঁর ‘হোম কোয়ারেন্টিনে’ থাকার কথা। কিন্তু তিনি বিধি-নিষেধ অমান্য করে নিজের বাড়িতে গেলেন। তিনি আবেগে গদগদ হয়ে তাঁর বাবার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তাঁর বাবা করোনায় আক্রান্ত হলেন এবং মারা গেলেন। এখন এই মৃত্যুর জন্য কে দায়ী?

আরেকজন দুই সন্তানের জনক ইতালি থেকে দেশে এলেন। তাঁরও ‘হোম কোয়ারেন্টিনে’ থাকার কথা। তিনিও সরকারি বিধি-নিষেধ অমান্য করে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। আবেগপ্রবণ বাঙালির আবেগ আছে তা দেখাতে হবে না! তিনি সন্তানদের বুকে টেনে নিলেন। তাঁর দুই সন্তানও ভাইরাসে আক্রান্ত হলো।

এভাবেই আমাদের দেশে করোনা ছড়িয়েছে। করোনাভাইরাস বহন করে কী পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে ঢুকেছে তার সঠিক হিসাব নেই। শিবচর অবরুদ্ধ হওয়ার পর আমরা জানতে পেরেছি, সেখানে বিপুলসংখ্যক ইতালিপ্রবাসী ফিরে এসেছে। অনেকেই আক্রান্ত হয়েছে। সারা দেশে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা কম। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। তবে সামনের দিনগুলো নিয়ে সবাই শঙ্কিত।

অনেকে সাধারণ মানুষের শঙ্কা বাড়ানোর জন্য ফেসবুকে নানা রকম অপপ্রচারও চালাচ্ছে। তারা বলছে, মৃত ও আক্রান্তের যে তথ্য সরকার থেকে দেওয়া হচ্ছে তা সঠিক নয়। মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা নাকি আরো অনেক বেশি। তারা আসলে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির মওকা খুঁজছে।

এমন কোনো মিথ্যা কিংবা ভুল তথ্য ছড়ানো ঠিক নয়, যাতে উদ্বিগ্ন মানুষের দুশ্চিন্তা আরো বাড়ে। এমনিতেই মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ার ভয়ে শঙ্কিত। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো অমানবিক কাজ করতে শুরু করেছে। বিপদের সময় পরস্পরের পাশে থাকাই মানবতা। আমরা আশা করব, সবাই মানবিক হবেন। বিপদে পাশে থাকবেন।

৩.

দৈব-দুর্বিপাক এলে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ নিয়তির ওপর ছেড়ে দেন। তাঁরা বলেন, বালা-মুসিবত আল্লাহ দিয়েছেন। পাপের পরিমাণ বেশি হলে আল্লাহ তাআলা এ রকম বালা-মুসিবত দিয়ে থাকেন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখেন। তিনিই মানুষকে রক্ষা করবেন। তিনি যে মানুষকে সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন সে কথা তাঁরা একবারও মনে করেন না।

দৈব-দুর্বিপাক আল্লাহ তাআলা দেন। আবার প্রকৃতির বিচার বলেও একটা কথা আছে। সেই বিচারও বড় কঠিন। সবাইকেই তার মুখোমুখি হতে হয়। তার পরও বলি, সব কিছু নিয়তির ওপর ছেড়ে দিলে চলে না।

এ মুহূর্তে আমরা সবাই বিপদের মধ্যে। এ এক কঠিন বিপদ। কারণ আমাদের সবার সামনেই অজানা শত্রু। যে কাউকে এই শত্রু আক্রান্ত করতে পারে। এ সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা। আমরা নিজেরা সচেতন থাকি এবং অন্যকে সচেতন করি। নিজেরা বাঁচি, অন্যকেও বাঁচাই।

 

লেখক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক

কালের কণ্ঠ ও সাহিত্যিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা